কারণ কী? কারণ কী? শোনো তবে বলি। কাল তোমরা দুজনে তো চলে গেলে! আমি মোহনেন্দুকে লকআপে রাখবার ব্যবস্থা করে থানা থেকে যখন বেরিয়ে এলুম রাত তখন চারটে বাজে। হঠাৎ দেখি একখানা মোটরগাড়ি থানার সামনে এসে থেমে পড়ল এবং একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোক ব্যস্তসমস্তভাবে গাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন। তেমন অসময়ে তার আবির্ভাব দেখে আমার মন কৌতূহলী হয়ে উঠল। ফিরে দাঁড়িয়ে তার আগমনের কারণ। জিজ্ঞাসা করলুম।
প্রথমেই তিনি বলে উঠলেন, অলৌকিক দস্যু, অলৌকিক দস্যু!
শুনেই আবার চাঙ্গা হয়ে উঠল আমার শ্রমক্লান্ত দেহ। তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করলুম, অলৌকিক দস্যু কি মশাই?
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই অলৌকিক দস্যু। আমি খবরের কাগজে তার চেহারার আর কার্যকলাপের বর্ণনা পড়েছি। এ অলৌকিক দস্যু না হয়ে যায় না! তারপর ভদ্রলোক যেসব কথা বলতে লাগলেন তা অত্যন্ত অসংলগ্ন। বুঝলুম দারুণ আতঙ্কে তিনি বিহ্বল হয়ে পড়েছেন, ভালো করে গুছিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। খানিকক্ষণ পরে কিঞ্চিৎ প্রকৃতিস্থ হয়ে তিনি যা বললেন, সংক্ষেপে তার সারমর্ম এই :
ভদ্রলোকের নাম বসন্ত চৌধুরী, চব্বিশ পরগনায় তার জমিদারি আছে, বাস করেন টালিগঞ্জে। গত লগ্নে তিনি পুত্রের বিবাহ দিয়েছেন, কাল ছিল বউভাতের রাত। সেই উপলক্ষ্যে তার বাড়ির সামনেকার খোলা জমিতে মেরাপ বেঁধে নাট্যাভিনয়ের আয়োজন হয়েছিল।
রাত্রি আড়াইটার পর আসর ভাঙে। অতিথিদের বিদায় দিয়ে আলো-টালো নিবিয়ে অন্যান্য কাজ চুকোতে-চুকোতে সাড়ে তিনটে বেজে যায়। চারিদিক যখন নিরালা হয়ে পড়ল, বসন্তবাবু মণ্ডপ ছেড়ে বাড়ির ভিতর ঢুকব-ঢুকব করছেন, এমন সময়ে হঠাৎ শুনতে পেলেন ঘটাং-ঘটাং করে কেমন একটা ধাতব শব্দ! তার বাড়ির পাশেই খানিকটা জঙ্গলভরা বেওয়ারিশ জমি ছিল, শব্দ আসছে সেইদিক থেকেই।
অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বসন্তবাবু একটা লণ্ঠন হাতে করে সেইদিকে গিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে যা দেখলেন, তাতে তার বুকের রক্ত যেন জল হয়ে গেল। একটা প্রায় সাত ফুট লম্বা দানবের মতো মূর্তি–দুই চক্ষে তার স্থির বিদ্যুতের মতো তীব্র অগ্নিশিখা–সেখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
বীভৎস মূর্তিটা তখনও তাঁকে দেখতে পায়নি। তিনি তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে এলেন। তাকে অলৌকিক দস্যু বলে চিনতে তাঁর একটুও বিলম্ব হল না, তিনি ধরে নিলেন। সে এখানে এসেছে তারই বাড়ি আক্রমণ করবার জন্যে। তাই তিনিও কালবিলম্ব না করে থানায় খবর দিতে এসেছেন।
জয়ন্ত, আসল ব্যাপারটা আমি অনায়াসেই আন্দাজ করতে পারলুম। মোহনেন্দুর গাড়ি থেকে পুলিশের ভয়ে নেমে পড়ে অলৌকিক দস্যু ওই জঙ্গলের ভিতরে গিয়ে লুকিয়েছিল। আমি তৎক্ষণাৎ দলবল নিয়ে ছুটে গেলুম ঘটনাস্থলে। কিন্তু আবার হল সেই লাভে ব্যাং, অপচয়ে ঠ্যাং–পেলুম অশ্বডিম্ব, নষ্ট হল গোটা রাতের ঘুম, অলৌকিক দস্যু ফাঁকি দিলে আবার আমাকে। তারপর এই খবরটা দেওয়ার জন্যেই আমার এখানে আগমন। এখন কী করা যায় বলো তো ভায়া। শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়–কিন্তু তারও সহ্যশক্তির একটা সীমা আছে তা? পুলিশে চাকরি নিয়েছি বলে আহার-নিদ্রা তো একেবারে ত্যাগ করতে পারি না। একটা কিছু বিহিত করতেই হবে–কিন্তু কী করতে হবে বলো দেখি?
জয়ন্ত বললে, আপাতত চা-চৰ্চা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না কি?
তা যেন করলুম, কিন্তু তারপর?
তারপর হাত-পা গুটিয়ে অপেক্ষা করুন।
কীসের অপেক্ষা?
অলৌকিক দস্যুর জন্যে।
সাত ঘাটের জল খেয়ে, আহার নিদ্রা ভুলে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, এত সাধ্যসাধনা করেও যার নাগাল পাচ্ছি না, তার জন্যে অপেক্ষা করব?
হাঁ। অলৌকিক দস্যুর দেখা পাবেন খুব শীঘ্রই। হয় আজ, নয় কাল, নয় পরশু।
তাই কি তুমি মনে করো?
নিশ্চয়ই! তার পক্ষে আশ্রয়হীনের মতো পথে-পথে ঘুরে বেড়ানো অসম্ভব। তার কথা সারা শহরে রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছে। যারা তাকে দেখেনি তারাও তার মূর্তির বর্ণনা পড়ে তাকে চিনে ফেলবে–যেমন চিনে ফেলেছেন বসন্তবাবু। তাকে যেখানে তোক আশ্রয় নিতে হবেই। তার দুটো ঠিকানাই আমরা জানি। এক আটাশ নম্বর নিউ স্ট্রিট। সেখানে গুপ্তচর মোতায়েন করা আছে তো?
নিশ্চয়!
তার আর এক বাসা আছে সুরেন রায় রোডে কাল যেখান থেকে সে হানা দিতে বেরিয়েছিল।
সেখানেও পাহারা মোতায়েন করা আছে।
তবে আর কি, মাভৈঃ! এখন আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি। ও মধু, ওহে শ্রীমধুসূদন! তুমি এখন আমাদের যে কার্যে নিযুক্ত করবে, আমরা খুশি মনে তাই-ই করব। দাও মধু, চা দাও, খাবার দাও।
সঙ্গে সঙ্গে চা ও খাবার নিয়ে মধুর প্রবেশ। এমন সদাপ্রস্তুত ভৃত্য দুর্লভ।
গতকল্য নিদ্রা ত্যাগ করে আজ সুন্দরবাবুর পানাহার গ্রহণ করবার প্রবৃত্তিটা বেড়ে উঠেছে অত্যন্ত। পরমাগ্রহে গ্রহণ ও গলাধঃকরণ করলেন পাঁচটা সিদ্ধ ডিম, আটখানা গোল্ডেন পা বিস্কুট, ছয়খানা টোস্ট, দুটো ল্যাংড়া আম, চারটে মর্তমান কলা ও তিন পেয়ালা চা। জয়ন্ত ও মানিক প্রত্যেকেই খেলে কেবল একটা করে সিদ্ধ ডিম, দুখানা করে টোস্ট ও এক এক পেয়ালা চা।
তারপর সুন্দরবাবু পরিতৃপ্ত বদনে পা ছড়িয়ে বসে একটা সিগার ধরাবার উপক্রম করছেন, সহসা টেলিফোন যন্ত্রের ঘন্টি বেজে উঠল ক্রিং, ক্রিং, ক্রিং।
