ফোর্ডের ভিতর থেকে প্রশান্ত স্বরে কে বললে, আপনাদের শুভাগমনের জন্যেই আমি অপেক্ষা করছি!
কে আপনি?
আমি মোহনেন্দু।
সুন্দরবাবু উচ্চকণ্ঠে বললেন, সবাই গাড়িখানা ঘিরে ফ্যালো! বন্দুক উঁচিয়ে রাখো! আবার যেন কলা দেখিয়ে চম্পট না দেয়!
আজ্ঞে না, চম্পট আমি দেব না।
দেবে না মানে? এইমাত্র তো চম্পট দিয়েছিলে!
মোটেই নয়। আপনাদের সঙ্গে একটু মজা করেছি মাত্র।
পুলিশের সঙ্গে মজা?
আপনাদের দেখিয়ে দিলুম যে, ইচ্ছা করলেই আমি পালাতে পারতুম, কিন্তু আমি পালালুম না। কেন আমি পালাব? কোনও দোষ করিনি, আমি পালাব কেন বলতে পারেন?
বলতে পারি অনেক কিছুই, আর তোমাকেও বলতে হবে অনেক কথাই। এখন তুমি গাড়ির ভিতর থেকে সুড়সুড় করে নেমে এসো দেখি। তোমার সঙ্গে যে আছে, তাকেও নামতে বলো।
গাড়ি থেকে নেমে পড়ে মোহনেন্দু বললে, আমার সঙ্গে আর কেউ নেই।
আলবত আছে! আমরা স্বচক্ষে গাড়ির ভিতরে আর একটা লোককে উঠতে দেখেছি।
ভুল দেখেছেন। গাড়িতে আমি একা।
তৎক্ষণাৎ গাড়ির ভিতরে খোঁজাখুঁজি হল। কিন্তু আর কারুকেই পাওয়া গেল না।
সুন্দরবাবু ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, দেখো মোহনেন্দু, তোমার এই চালাকি একটা শিশুকেও ভোলাতে পারবে না। আমাদের চোখের আড়ালে তুমি পালিয়ে এসেছ আসল আসামিকে সরিয়ে ফেলবার জন্যেই।
মোহনেন্দু নির্বিকার ভাবে বললে, কে আসল আসামি, আর কে নকল আসামি তা নিয়ে আপনারা যত খুশি মাথা ঘামাতে পারেন। কিন্তু এইটুকু জেনে রাখুন, আমার গাড়িতে আর কেউ ছিল না।
নেই বললেই সাপের বিষ থাকে না নাকি! আমরা তাকে দেখেছি।
বলছি তো ভুল দেখেছেন।
না, ঠিক দেখেছি।
যাকে দেখেছেন আগে তাকে এনে হাজির করুন। নইলে পুলিশের মুখের কথা আদালতেও প্রমাণ বলে গ্রাহ্য হবে না।
বেশ, আর একটা কথার জবাব দাও। তোমার গাড়িতে ভুয়ো নম্বর কেন?
এ প্রশ্নের অর্থ বুঝলুম না।
উত্তম, বুঝিয়ে দিচ্ছি। সুন্দরবাবু গাড়ির পিছন দিকে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, বটে, বটে? মোহনেন্দু তুমি কাজের ছেলে বটে! ভুয়ো নম্বরের প্লেটখানাও এই ফাঁকে সরিয়ে ফেলেছ দেখছি যে! কিন্তু একটু আগেই সেটাও আমি স্বচক্ষে দেখেছি।
কলকাতার পুলিশ আজকাল যে এত ভুল দেখে, এ খবর আমার জানা ছিল না। মোহনের কণ্ঠে শ্লেষের আভাস।
সুন্দরবাবু বললেন, যাক ওসব কথা। এখন তোমাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।
কেন?
কেন, পরেই বুঝতে পারবে।
আপনি কি আমাকে গ্রেপ্তার করতে চান?
না। তবে পরে করলেও করতে পারি।
কী অপরাধে?
যদি গ্রেপ্তার করি, পরে শুনতেই পাবে।
দেখছি আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করে আমি ভালো কাজ করিনি।
অপেক্ষা করেছিলে কি সাধে? ভেবেছিলে সেদিনের মত আজকেও তোমার কথা শুনে আমরা বোকার মতো আবার তোমাকে ছেড়ে দেব। একই চালে বার বার বাজিমাত করা যায় না বাপু!
আমি নিরপরাধ।
বেশ তো, তাহলে তোমার ভয়টা কীসের? এসো এখন আমাদের সঙ্গে।
.
সপ্তম পরিচ্ছেদ। আবার ভোঁ-ভোঁ
পরদিন। প্রাতঃভ্রমণের নিত্যনৈমিত্তিক কর্তব্য পালন করে বাড়ির দিকে ফিরে এল জয়ন্ত এবং মানিক। তারা প্রত্যহই সূর্যোদয়ের আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে, তারপরে গঙ্গার ধারে বেশ খানিকক্ষণ পদচালনা করে ফিরে আসে আবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই। এ সময়টায় জয়ন্ত গুরুতর কোনওকিছু নিয়েই আলোচনা করতে রাজি হয় না, অন্ধকারের মধ্যে শিশু আলোকের ক্রমবিকাশ দেখতে-দেখতে এবং স্নিগ্ধ প্রভাত সমীরণকে নিশ্বাসের সঙ্গে-সঙ্গে পরমানন্দে গ্রহণ করতে করতে নিজের মস্তিষ্কে সম্পূর্ণভাবে বিশ্রাম দিতে চায়।
কিন্তু সেদিন বাড়ির কাছে এসেই তারা সবিস্ময়ে দেখলে, এত ভোরে সদরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একখানা সুপরিচিত মোটরগাড়ি।
জয়ন্ত বললে, কী আশ্চর্য! ওখানা সুন্দরবাবুর গাড়ি বলে মনে হচ্ছে না?
মানিক বললে, সে বিষয়ে সন্দেহ নাস্তি।
এত সকালে সুন্দরবাবু তো কোনও দিনই বিছানার মায়া ত্যাগ করেন না।
নিশ্চয় আবার কোনও অঘটন ঘটেছে!
কী অঘটন ঘটতে পারে? মোহনেন্দু কি পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে আবার অদৃশ্য হয়েছে?
কিংবা এ-ও হতে পারে, অলৌকিক দস্যু আবার দৃশ্যমান হয়েছে।
দেখা গেল কৌচের উপরে অর্ধশয়ান অবস্থায় সুন্দরবাবুকে। তার দুই নেত্র মুদিত এবং থেকে থেকে স্ফীত হয়ে উঠছে তাঁর নাসারন্ধ্র–বোধহয় গর্জন করে উঠবে অবিলম্বেই।
কিন্তু আজ সুন্দরবাবু শ্ৰবণ-বিবর নিশ্চয়ই অত্যন্ত জাগ্রত। কারণ তাঁর নাসিকাকে গর্জন করবার কোনও অবসরই তিনি দিলেন না, জয়ন্ত ও মানিকের পদশব্দ শুনেই দুই চোখ মেলে ধড়ফড় করে সোজা হয়ে উঠে বসলেন।
জয়ন্ত শুধোলে, ব্যাপার কী সুন্দরবাবু? সকাল হতে না হতে সর্বাগ্রে জাগে কাক আর শালিখ পাখিরা। আপনি কি আজ তাদেরও আগে নিদ্রাদেবীকে তাড়িয়ে দিয়ে এখানে এসে হাজির হয়েছেন?
সুন্দরবাবু মুখব্যাদান করে হাই তুলতে তুলতে বললেন, নিদ্রাদেবীকে তাড়াব কি, তাঁকে কাল আমাকে একেবারেই বয়কট করতে হয়েছে, বুঝেছ ভায়া? কাল তিনি আমার কাছে ঘেঁষতে পারেননি। এতক্ষণ পরে তোমার এখানে আমাকে একা পেয়ে তিনি আমার উপরে মন্ত্রশক্তি প্রয়োগ করবার চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু তার সে চেষ্টাও ব্যর্থ করে দিয়েছে তোমাদের পদশব্দ–হুম! বুঝলে?
মানিক বললে, কিছুই বুঝলুম না। নিদ্রাদেবীর বিরুদ্ধে আপনার এই অভাবিত বিদ্রোহের কারণ কী?
