কিন্তু জয়ন্তের ধারণা অন্যরকম। সে আজ এক মাস ধরে সুরেন রায় রোডে তার এক ধনী বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, সঙ্গে আছে মানিক। আজ এক মাসের মধ্যে তারা এই বাড়ির বাইরে পা বাড়ায়নি।
ও-ফুটপাথের একখানা মাঝারি আকারের লাল রঙের দোতলা বাড়ির উপরে সর্বদাই নিবদ্ধ থাকে তাদের দৃষ্টি। এক মাস কেটে গেছে, তবু একটুও কমেনি তাদের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা।
অথচ তারা সন্দেহজনক কিছুই দেখতে পায়নি। ও-বাড়ির ভিতরে কেউ বাস করে বলেও মনে হয় না, কারণ বাড়ির সমস্ত দরজা-জানলা সর্বদাই বন্ধ থাকে। রাত্রেও সেখানে দেখা যায় না কোনও আলোক চিহ্ন, পাওয়া যায় না কোনও মানুষের সাড়া।
কেবল মাঝে-মাঝে কোনও-কোনও দিন সন্ধ্যার পর একখানা কালো রঙের ফোর্ড গাড়ি বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। একটি লোক গাড়ি থেকে নেমে নিজের চাবি দিয়ে দরজার তালা খুলে বাড়ির ভিতরে গিয়ে ঢোকে। খানিকক্ষণ পরে আবার সে বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে চলে যায়।
সার্চ-ওয়ারেন্ট এনে বাড়িখানার ভিতরে প্রবেশ করবার জন্যে একাধিক বার উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন সুন্দরবাবু।
তাঁকে নিরস্ত করে জয়ন্ত বলছে, অলৌকিক দস্যু ওখানে আছে কিনা তাও জোর করে বলতে পারি না। আমরা খালি দেখেছি মোহনেন্দুকে আসা-যাওয়া করতে। সে যে অলৌকিক দস্যু নয়, এও আমরা সকলেই জানি। সে একবার আমাদের বোকা বানিয়েছে, আমি দ্বিতীয় বার আর ঠকতে রাজি নই। কারণ এখনও আমরা পিছু ছাড়িনি জানলে পাখি ভয় পেয়ে একেবারেই উড়ে পালাবে। তার চেয়ে ওকে নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্যে কিছুদিন সময় দিন, তাহলেই আমরা কেল্লা ফতে করতে পারব।
কিন্তু আমি যে আর কৌতূহল দমন করতে পারছি না।
সবুর করুন, সবুর করুন–সবুরে মেওয়া ফলে জানেন তো? এ-বাড়িতে ফোন আছে, যথাসময়েই আপনি খবর পাবেন।
সুন্দরবাবু অপ্রসন্ন মুখে বললেন, আজ এক মাস তোমরা বাড়ি ছাড়া। আজ এক মাস তোমাদের লোভনীয় চায়ের আসর আর বসেনি। তোমরা যেন এখানেও চা-টা উড়িয়ে মজা করছ, কিন্তু আমি আসতে চাইলেই তোমরা হাঁ-হাঁ করে ওঠো!
অবুঝ হবেন না দাদা! আপনার মতো সুপরিচিত পুলিশ কর্মচারী এ-পাড়ায় ঘন ঘন আনাগোনা করলে আমাদের অজ্ঞাতবাস করা একেবারেই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
.
ঢং ঢং করে বাজল রাত বারোটা।
সুন্দরবাবু ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে বললেন, এতদিনে কি সময় হল জয়ন্ত?
বোধ হয় হল। আজ কালো গাড়িখানা একবার দুপুরে, আর একবার বৈকালে এসেছিল। তারপর আধ ঘণ্টা আগে আবার এসে দাঁড়িয়ে আছে। আসবার সময়ে লাল বাড়ির সামনে আপনিও গাড়িখানা দেখেছেন তো?
তা আবার দেখিনি! আরও একটা জিনিস লক্ষ করেছি।
কী?
গাড়িতে মোহনেন্দুর গাড়ির নম্বর নেই! তার মানে ভুয়ো নম্বর।
এত রাত্রে মোহনেন্দুর এখানে আগমন, গাড়িতে ভুয়ো নম্বর, আজ একটা কোনও ঘটনা ঘটবেই। চলুন, আমরা নীচে নেমে সদর দরজার পাশে গিয়ে লুকিয়ে থাকি। আপনার লোকজন?
সব যথাস্থানে ঘাপটি মেরে আছে।
চলুন।
কিন্তু আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না।
লাল বাড়ির ভিতর থেকে প্রথমে বেরিয়ে এল একটা ছায়ামূর্তি। সে গাড়ির চালকের সামনে উঠে বসতেই দেখা গেল আর একটা বৃহত্তর ছায়ামূর্তি। রাতের অন্ধকারে কোনও মূর্তিকেই স্পষ্ট করে বোঝা গেল না। দ্বিতীয় মূর্তি গাড়ির ভিতরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই জাগ্রত হয়ে উঠল ইঞ্জিনের শব্দ–
এবং সঙ্গে-সঙ্গে বাজল পুলিশের বাঁশি, চারিদিকে, দপদপিয়ে উঠল অনেকগুলো টর্চ, ধেয়ে এল দলে দলে সশস্ত্র লোক!
সুন্দরবাবু গাড়ির দিকে ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে বললেন, থামাও গাড়ি!
কিন্তু গাড়িখানা থামল না, সাঁৎ করে উল্কাগতিতে সকলের চোখের সামনে দিয়েই ছুটে বেরিয়ে গেল।
বন্দুক ছোড়, বন্দুক ছোড়ো!
সেপাইরা গুলিবৃষ্টি করলে, কোনও গুলি গাড়ির গায়ে লাগল কিনা বোঝা গেল না, কিন্তু তার গতি বন্ধ হল না। তারপর ডানদিকে মোড় ফিরে অদৃশ্য হয়ে গেল গাড়িখানা।
সুন্দরবাবু প্রাণপণে গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, আমাদের গাড়ি আছে ওরাস্তায়। শিগগির এখানে নিয়ে এসো!
কিন্তু পুলিশের গাড়ি নিয়ে এসে আবার সেই পলাতক গাড়ির সন্ধানে যাত্রা করতে মিনিট চার সময় কেটে গেল।
মানিক হতাশ ভাবে বললে, মিছেই এই ছুটোছুটি। আর মোহনের পাত্তা পাওয়া অসম্ভব। চোখের সামনে পেয়েও যাকে ধরা গেল না, চোখের আড়াল থেকে তাকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়?
জয়ন্ত বললে, তবু হাল ছাড়া উচিত নয়।
পুলিশের গাড়িও মোড় ফিরে ধরলে ডানদিকের রাস্তা। শূন্য পথ সিধে চলে গিয়েছে, দুইপাশে তার দাঁড়িয়ে রয়েছে আলোকস্তম্ভগুলো বোবা সাক্ষীর মতো! একান্ত স্তব্ধ রাত্রেও দূর থেকে অন্য কোনও গাড়িচলার শব্দ পর্যন্ত ভেসে আসছে না!
সুন্দরবাবু আপশোশ করতে লাগলেন, হা রে আমার পোড়া কপাল! এ কী আসামি রে বাবা! হাতে পেয়েও হাতে পাওয়া যায় না, পারার মতো পিছলে পালায়।
তবু পুলিশের গাড়ি ছোটে। ঘুমন্ত গৃহস্থদের সুখস্বপ্ন ভেঙে দিয়ে ছোটে আর ছোটে যেন কোনও অদৃশ্য আলেয়ার উদ্দেশে।
প্রায় মাইলখানেক পরে গাড়িখানা এসে পড়ল একটা তেমাথায়। এবং বাঁ-দিকের রাস্তার উপরে তাকিয়েই দেখা গেল দাঁড়িয়ে রয়েছে একখানা কালো রঙের ফোর্ড গাড়ি।
সুন্দরবাবু চেঁচিয়ে বললেন, হুম!
