সুন্দরবাবু রিভলভার তুলে গর্জন করে বলে উঠলেন, এই ফোর্ড গাড়ি! দাঁড়াও! নইলে–
গাড়িখানা দাঁড়িয়ে পড়ল তৎক্ষণাৎ।
চালক ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে বললে, কে আপনারা? কী চান?
সুন্দরবাবু মুখভঙ্গি করে বললেন, কে আমরা? তাও কি মুখ ফুটে বলতে হবে? কী চাই? তাও কি বুঝতে পারছেন না?
চালক অবিচলিত কণ্ঠে বললে, বুঝেছি আপনারা পুলিশের লোক। কিন্তু আপনারা যে কি চান, সেইটেই এখনও বুঝতে পারছি না।
বটে, বটে, বটে? আমরা চাই অলৌকিক দস্যুকে? এইবারে বুঝতে পারলেন?
উঁহু!
দূর থেকেই পরম সাবধানে গাড়ির ভিতরে উঁকিঝুঁকি মারবার চেষ্টা করে সুন্দরবাবু বললেন, ওহে, তোমরা সবাই গাড়ির দরজা খুলে দেখো তো, ভিতরে কোনও বেটা ধুমসো দুশমন হুমড়ি খেয়ে লুকিয়ে বসে আছে কিনা? কিন্তু খুব হুশিয়ার! সবাই বন্দুক তৈরি রেখো হুম, বড় বড় ধড়িবাজ আসামি!
অনেকগুলো তীক্ষ্ণদৃষ্টি গাড়ির ভিতরটা ভালো করে অন্বেষণ করলে, কিন্তু কোনও কিছুই হল না দৃষ্টিগোচর। চালক ছাড়া গাড়ির ভিতরে নেই দ্বিতীয় ব্যক্তি।
চালক সকৌতুকে বললে, কলকাতার পুলিশ কি আজকাল অলৌকিক স্বপ্ন দেখবার ব্যবসা ধরেছে?
তার ব্যঙ্গোক্তি গ্রাহ্যের মধ্যে না এনে সুন্দরবাবু একবার ফিরে জয়ন্তের মুখের পানে তাকালেন। কিন্তু তার সঙ্গে তাঁর দৃষ্টি বিনিময় হল না, কারণ জয়ন্ত তখন একান্ত নির্বিকারের মতো ঊধ্বমুখে অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকার ভেদ করে যেন বর্ষণোম্মুখ ও চলিষ্ণু মেঘগুলোকে দেখবার চেষ্টা করছিল। তিনি হতাশ ভাবে ফিরলেন মানিকের দিকে।
মানিক নিজের পকেটে হাত পুরে দিয়ে বললে, সুন্দরবাবু, আসবার সময়ে আপনার জন্যে চকোলেট এনেছি। দু-একটা খাবেন?
.
মনে মনে রেগে আগুন হয়ে সুন্দরবাবু আবার ফিরলেন মোটরচালকের দিকে। শুধোলেন, আপনার নাম কী?
শ্রীমোহনেন্দু মিত্র।
কী করেন?
আমি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।
ঠিকানা?
আটাশ নম্বর নিউ স্ট্রিট।
আপনার গাড়ির নম্বর কত?
মোহনেন্দু নম্বর বললে।
আপনার লাইসেন্স দেখি।
লাইসেন্সেও পাওয়া গেল মোহনের নাম ও গাড়ির নম্বর।
কোনও দিকেই কিছু জুৎ করতে না পেরে সুন্দরবাবু অবশেষে বললেন, গাড়ি নিয়ে আপনি এখন কোথায় যাচ্ছিলেন?
বেড়াতে।
এখুনি ঝড় উঠবে, বৃষ্টি পড়বে। এই কি বেড়াতে যাবার সময়?
আমার খুশি। নির্বোধের মতো প্রশ্ন করবেন না। দয়া করে পথ ছাড়বেন কি?
হুম, না!
না মানে?
আমি আপনার বাড়ির ভিতরে খানাতল্লাশ করব।
আপনার কাছে সার্চ-ওয়ারেন্ট আছে?
আছে।
আগে আমি দেখতে চাই।
সুন্দরবাবু পকেটে হাত দিতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ জয়ন্ত তার হাত চেপে ধরে বললে, সুন্দরবাবু, আজ আর বাড়ি খানাতল্লাশ করতে হবে না। মোহনেন্দুবাবু বেড়াতে যেতে চান, ওঁকে বেড়াতে যেতে দিন।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন সুন্দরবাবু।
মোহনেন্দু বললে, তাহলে আমি গাড়িতে স্টার্ট দিতে পারি?
জয়ন্ত পায়ে পায়ে গাড়ির ঠিক পিছন দিকে গিয়ে দাঁড়াল।
হতভম্বের মতো তার চালচলন লক্ষ করতে করতে সুন্দরবাবু বললেন, বেশ মোহনেন্দুবাবু, আজ আপনার যেখানে খুশি বেড়াতে যেতে পারেন।
মোহনে গাড়িতে স্টার্ট দিলে এবং পরমুহূর্তে জয়ন্ত সুকৌশলে নিজের দেহকে সংলগ্ন করে ফেললে মোটরের পশ্চাদভাগে। তাকে সেই অবস্থায় নিয়ে গাড়িখানা বেগে বেরিয়ে গেল। সুন্দরবাবু নিজের টাক চুলকোতে চুলকোতে বললেন, এ আবার কী কাণ্ড রে বাবা!
মানিক বললে, ভালো সেনাপতি শত্রুপক্ষের প্ল্যান দেখে নিজের প্ল্যান স্থির করে। জয়ন্ত বুঝে নিয়েছে মোহনেন্দু তার প্ল্যান বদলে ফেলেছে, তাই সেও নিজের প্ল্যান বদলাতে চায়।
জয়ন্ত কেমন করে বুঝলে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
এইজন্যেই তো আপনার নাম সুন্দরবাবু আর জয়ন্তের নাম জয়ন্ত। সুন্দরবাবু যা বুঝতে পারেন না, জয়ন্ত তা বুঝতে পারে।
জয়ন্ত কি বুঝেছে তুমি তা জানো?
ঠিক জানি না বটে, তবে আন্দাজ করতে পারি কিছু কিছু!
আন্দাজটা শুনি!
মোহনেন্দু ধূর্ত ব্যক্তি। যেমন করেই হোক সে বুঝতে পেরেছে, পুলিশের নজর তার উপরে। অলৌকিক দস্যুর সঙ্গে তার কি সম্পর্ক, সেটা আমরা জানি না বটে, তবে এই নিউ স্ট্রিটের বাড়ি থেকে তাকে যে সে সরিয়ে ফেলেছে, এতে আর কোনও সন্দেহ নেই। আজ তার বাড়ি খানাতল্লাশ করলে নিশ্চয়ই আমরা কিছুই আবিষ্কার করতে পারতুম না।
মোহনের গাড়ির ভিতরে অলৌকিক দস্যু নেই। তার গাড়ির নম্বর ভুয়ো নয়। মানিক, আমরা বোধহয় ভুল সূত্র ধরে বোকা বনে গেলুম। মোহনের সঙ্গে অলৌকিক দস্যুর সম্পর্ক নেই।
আমার কি বিশ্বাস জানেন? পুলিশের নজর তার উপরে আছে কিনা এটা নিশ্চিতরূপে জানবার জন্যেই মোহনেন্দু এমন অসময়ে নিজের গাড়ি বার করেছিল।
হতেও পারে, না হতেও পারে। কিন্তু ওর গাড়ির পিছনে অমন গোঁয়ারের মতো চড়ে জয়ন্ত আজ নিজের জীবন বিপন্ন করতে চায় কেন?
ঠিক বলতে পারি না। খুব সম্ভব জয়ন্তের সন্দেহ হয়েছে, মোহনেন্দু এই ফাঁকে অলৌকিক দস্যুর সঙ্গে দেখা করে আসতে পারে।
নতুন কোনও ঠিকানায় গিয়ে?
হ্যাঁ।
হুম!
.
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। কালো রঙের ফোর্ড
তারপর কেটে গেল এক মাস।
দেড় মাসের মধ্যে একবারও অলৌকিক দস্যুর সাড়া শব্দ না পেয়ে আস্কস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচল কলকাতা শহর। অনেকেই মত প্রকাশ করলে, মহারাজা দুর্গাপ্রসাদের প্রাইভেট সেক্রেটারির বন্দুকের দ্বিতীয় গুলিটা নিশ্চয়ই ব্যর্থ হয়নি, অলৌকিক দস্যু পটল তুলেছে।
