বাসরে, এই কি তোমার মন্দের ভালো? এ যে ভালোর চেয়েও ভালো।
জয়ন্ত বললে, এইবারে আশ্বস্ত হলেন তো? তবে উপবেশন এবং সন্দেশ পরিবেশন করুন।
তিন ঠিকানার সন্দেশই সংগ্রহ করেছি।
যথা–
নিউ স্ট্রিটের চার নম্বর বাড়িতে থাকেন উত্তরবঙ্গের এক বিধবা জমিদার-গৃহিণী, নাম অপর্ণা দেবী। তাঁর সন্তান নেই, বিধবা ভ্রাতৃবধূর ছেলেমেয়েদের নিয়েই সংসার। ছেলেমেয়েরা সবাই নাবালক। বাড়িতে আছে চাকর, পাঁচক, দ্বারবান আর দুজন আধবুড়ো কর্মচারী। তাঁর দুখানা মোটর–একখানা অস্টিন, আর একখানা স্টুডিবেকার। নিজের বাড়ি।
তারপর, সতেরো নম্বর বাড়িতে?
ডাক্তার তপেন্দ্রনাথ দত্ত নামে এক ভদ্রলোক থাকেন। ভাড়া বাড়ি। ভালো পসার। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। স্ত্রী আছেন। একটি ছেলে, দুটি মেয়ে। বড় মেয়ের বয়স পনেরো। ছেলের বয়স এগারো। ছোট মেয়েটি আট বছরের। ডাক্তারবাবু একখানা মরিস গাড়ির অধিকারী।
এখন বাকি রইল খালি আটাশ নম্বরের বাড়ি।
ও বাড়ির মালিক মোহনেন্দু মিত্র! একেবারে নতুন বাড়ি। আট বৎসর আমেরিকায় বাস করে তিনি দেশে ফিরে এসেছেন যন্ত্রবিৎ রূপে। নিজেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বলে পরিচয় দেন। এখনও বিবাহ করেননি। বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ। বাড়িতে ঠিকে পাঁচক আর ঝি নিয়ে থাকেন। তার বাড়ির পিছনের জমিতে কারখানার মতো কি একটা আছে। তাঁর সম্বন্ধে পাড়ার লোক বিশেষ কিছু জানে না, কারণ তিনি মিশুক মানুষ নন। একখানা ফোর্ড গাড়ির অধিকারী, নিজেই গাড়ি চালান–গাড়িখানা কালো রঙের। কি হে জয়ন্ত, আর কিছু জানতে চাও?
জয়ন্ত অন্যমনস্কর মতো বললে, না, যেটুকু জেনেছি আপাতত তাইতেই কাজ চলবে। মানিক, নস্যের ডিবেটা এগিয়ে দাও তো ভাই।
মানিক জানত অতিরিক্ত খুশি হলেই জয়ন্তের দরকার হয় নস্য। ডিবেটা এগিয়ে দিলে।
ভৃত্য মধু এসে সুন্দরবাবুর সামনে একে-একে সাজিয়ে দিলে পানভোজনের পাত্র। সুন্দরবাবুর হাত ও মুখ অতিশয় ব্যস্ত হয়ে উঠল।
জয়ন্ত চুপ করে ভাবতে-ভাবতে নস্য নেয় মাঝে-মাঝে। এইভাবে যায় কিছুক্ষণ। ইতিমধ্যে শেষ হয় সুন্দরবাবুর পানাহার।
জয়ন্ত হঠাৎ উৎসাহিত কণ্ঠে বলে ওঠে, ঠিক, ঠিক, ঠিক!
কি ঠিক জয়ন্ত?
এরপর যেদিন অলৌকিক দস্যু দেখা দেবে, সেই দিনই আমরা তাকে গ্রেপ্তার করব।
.
পঞ্চম পরিচ্ছেদ । অমাবস্যার রাত
কেটে যায় দিন পনেরো।
সবাই ভাবে মহারাজা দুর্গাপ্রসাদের সেক্রেটারির তৎপরতায় হাতে-হাতে ধরা পড়তে পড়তে কোনও গতিকে বেঁচে গিয়ে অলৌকিক দস্যুর দিব্যজ্ঞান লাভ হয়েছে। কারণ আজ পনেরো দিনের মধ্যে তার আর কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবু পুলিশের সচেতনতার সীমা নেই। রাস্তায় কালো রঙের ফোর্ড বেরুলেই পাহারাওয়ালাদের দৃষ্টি সজাগ হয়ে ওঠে। কালো রঙের ফোর্ড, কালো রঙের ফোর্ড–সারা শহরে কুখ্যাত হয়ে উঠেছে কালো রঙের ফোর্ড।
পুলিশ অনেক কালো রঙের ফোর্ডকে রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে গাড়ির ভিতরে চালনা করেছে সতর্ক তীক্ষ্ণদৃষ্টি। কিন্তু কোনও গাড়ির কোনও আরোহীরই চেহারায় খুঁজে পাওয়া যায়নি কিছুমাত্র অলৌকিকতা।
প্রত্যেক বারেই অলৌকিক দস্যু দেখা দিয়েছে রাত্রিকালে। তাই রাত্রে রাস্তায় রাস্তায় পুলিশের লোক দলে ভারী হয়ে উঠেছে রীতিমতো। কালো বা সাদা বা হলদে রঙের কোনও মোটরগাড়িই আর ফঁকি দিতে পারে না তাদের কড়া পাহারাকে।
মানিক বললে, জয়ন্ত, অলৌকিক দস্যু যে আর হানা দিতে বেরোয় না, হয়তো তার মূলে আছে দুটো কারণ।
কী, কী কারণ।
প্রথম কারণ হচ্ছে, ধনবানরা সাবধান হয়ে গিয়েছে। রাত্রে বাড়ির বাইরে মূল্যবান কিছু নিয়ে আনাগোনা করে না। বাড়ির ভিতরেও তারা হানাদারকে বাধা দেওয়ার জন্যে অধিকতর প্রস্তুত হয়ে আছে।
দ্বিতীয় কারণ?
পুলিশ বড় বেশি জাগ্রত। অলৌকিক দস্যু জানে, নাগরিকদের আর পুলিশের সাবধানতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কিছুদিন পরে স্বাভাবিক নিয়মেই আবার তারা অন্যমনস্ক হয়ে পড়বে, তখন আবার আসবে অলৌকিক দস্যুর মাহেন্দ্রক্ষণ।
তোমার অনুমান সত্য বলেই মনে হয়। নিরাপদ ব্যবধানে বসে অলৌকিক দস্যু দিনের পর দিন গুনছে। কিন্তু যে-কোনও দিন আবার সে আচম্বিতে দেখা না দিয়ে ছাড়বে না।
.
এক অমাবস্যার রাত। চন্দ্রহারা আকাশে সে রাতেও জমে উঠেছে মেঘের পর মেঘ। অত্যন্ত গুমোট ঝড়বৃষ্টির পূর্বলক্ষণ, পথিকরা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে দিলে বাসার দিকে। কোথাকার একটা বড় ঘড়িতে ঢং-ঢং করে বাজল রাত দশটা।
নিউ স্ট্রিট। অসম্পূর্ণ নতুন রাস্তা, বাড়ির সংখ্যা কম, লোক চলাচলও বেশি নয়। ও অঞ্চলটা রাত দশটার সময়েই প্রায় নিঃসাড় হয়ে আসে। তখন শব্দ সৃষ্টি করে কেবল ঝিঁঝি পোকাগুলো থেকে-থেকে ডেকে উঠছে একটা-দুটো প্যাচা।
আচম্বিতে শোনা গেল একখানা মোটরগাড়ির আওয়াজ। গ্যাসের আলোতে দেখা গেল একখানা কালো রঙের ফোর্ড। রাস্তার মাঝখান থেকে সরে গেল দুটো পথচারী কুকুর।
মোটরখানা দুটো রাস্তার সংযোগস্থলে এসে মোড় ফিরতে উদ্যত হল। সহসা খুব কাছেই বেজে উঠল তীব্র স্বরে একটা বাঁশি এবং সঙ্গে সঙ্গে যেন মাটি খুঁড়েই জেগে উঠল দলে দলে মানুষ–ফোর্ডে-র এপাশে-ওপাশে, সামনে পিছনে! প্রত্যেকেরই হাতে বন্দুক মিলিটারি পুলিশ!
কোথা থেকে হল সুন্দরবাবুর আবির্ভাব–তার পিছনে জয়ন্ত ও মানিক।
