আমাকে কোনও প্রশ্ন করবেন না, প্রশ্ন করুন নিজের সহজ বুদ্ধিকেই।
হায়রে কপাল, আমরা কেল্লা ফতে করবার আর একটা মস্ত সুযোগ হারালুম!
সুন্দরবাবু, এখন আমাদের কি কর্তব্য জানেন?
হতাশভাবে বাসায় ফিরে যাওয়া।
মোটেই নয়। আমাদের এখনি বিপুল উৎসাহে নিউ স্ট্রিট বেড়াতে যাওয়া উচিত।
এই রাত্রে, এই ঝড়-জলে?
হ্যাঁ।
তুমি কি মনে করো, আমাদের হাতে ধরা পড়বার জন্যে কালো রঙের গাড়িখানা এখনও সেখানে অপেক্ষা করছে?
আমি কি মনে করি না করি তা নিয়ে আপনি মাথা ঘামাচ্ছেন কেন? চলুন না, খানিকটা ঝোড়ো বায়ু সেবন করে আসি।
দুটো বাধা আছে ভায়া। প্রথমত, আমার সর্দির ধাত, ঝোড়ো ভিজে হাওয়া হয়তো সামলাতে পারব না। দ্বিতীয়ত, লাখ টাকার মাল পয়মাল হয়নি বলে মহারাজা খুশি হয়ে আজ আমাদের সকলের জন্যে ভোজের আয়োজন করেছেন। ভেবে দেখো জয়ন্ত, রাজবাড়ির ভোজ, খাদ্যতালিকা কতখানি দীর্ঘ হবার সম্ভাবনা!
তাহলে আপনি রাজবাড়িতে পুনঃপ্রবেশ করুন, আমরা দুজনেই চললুম নিউ স্ট্রিটে।
সে কী, মহারাজা বাহাদুর আমার মুখে তোমাদের কথা শুনে তোমাদেরও নিমন্ত্রণ করেছেন যে!
মানিক বললে, আমরা দীর্ঘকর্ণ নই, দীর্ঘ তালিকার লোভে রবাহুত অতিথির আসনও অধিকার করতে পারব না।
দীর্ঘকর্ণ? ঠারেঠোরে আমাকে গাধা বলে গালাগাল দেওয়া হচ্ছে? আমি গাধা?
সেটা তো একটু আগে আপনি নিজের মুখেই স্বীকার করলেন।
জয়ন্ত, মানিকের নষ্টামি অসহনীয়! চলো, আমি তোমাদের সঙ্গেই যাচ্ছি। হুম!
.
চতুর্থ পরিচ্ছেদ । ঠিক, ঠিক, ঠিক!
ঝর-ঝর-ঝর-ঝর ঝরছে তখনও আকাশ-ঝরনা, হু-হু-হুঁ-হুঁ পড়ছে ভিজে বাতাসের এলোমেলো দীর্ঘশ্বাস। পথের ধারে ধারে রুদ্ধদ্বার বাড়িগুলো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের একটা জানলাতেও দেখা যাচ্ছে না আলো-হাসির এতটুকু আভাস। পৃথিবীকে আজ গ্রাস করেছে পরিত্যক্ত সমাধির বিজনতা!
বর্ষাতির প্রান্তগুলো ভালো করে দেহের উপরে গুছিয়ে নিয়ে সুন্দরবাবু সেই যে গুম হয়ে গাড়ির কোণ ঘেঁষে বসেছেন, মুখ দিয়ে একটিমাত্র বাক্যও উচ্চারণ করছেন না। তিনি মনে মনে কি ভাবছেন? রাজবাড়ির সুদীর্ঘ খাদ্যতালিকা? সম্ভব।
নিউ স্ট্রিট। জয়ন্ত গতি মন্থর করে গাড়িকে মোড় ফিরিয়ে বললে, মানিক, এ-রাস্তায় বাড়ি আছে মোটে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ খানা। এইবারে আমি আরও ধীরে-ধীরে গাড়ি চালাব। আমি ডানদিকে চোখ রাখি, তুমি রাখো বামদিকে। হাতে টর্চ নাও। দেখো, এ-পাড়ায় মোটর রাখবার গ্যারাজ আছে কতগুলো।
সুন্দরবাবু কানে সব শুনলেন, তবু মুখ খুললেন না।
গাড়ি পায়ে-হাঁটা পথিকের মতো আস্তে-আস্তে চলতে লাগল এবং জয়ন্ত ও মানিক টর্চ ফেলে-ফেলে প্রত্যেক বাড়ি লক্ষ করতে লাগল। মিনিট সাত এইভাবে অগ্রসর হবার পর আর কোনও বাড়ি পাওয়া গেল না। তারপরই পথ বন্ধ। মোটরের হেডলাইট ফেলে দেখা গেল, জলমগ্ন খণ্ড খণ্ড জমি। কোনও কোনও জমির উপরে নতুন নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজ সবে শুরু হয়েছে, কোথাও খানিকটা অগ্রসর হয়েছে।
জয়ন্ত বললে, আমরা মোটে তিনটি গ্যারেজ পেলুম। চার নম্বর বাড়িতে একটা, সতেরো নম্বর বাড়িতে একটা, আটাশ নম্বর বাড়িতে একটা। মানিক, নম্বরগুলো একখানা কাগজে টুকে নিয়ে সুন্দরবাবুর হাতে দাও।
সুন্দরবাবু রাগত স্বরে বললেন, এ নিয়ে আমি কি স্বর্গে যাব?
জয়ন্ত হেসে বললে, বালাই, কেউ কী বন্ধুকে অসময়ে স্বর্গে পাঠাতে চায়? ওই তিনখানা বাড়িতে কে কে থাকে, তাদের মালিক কে, তারা কে কী কাজ করে, তাদের কী কী গাড়ি আছে, অনুগ্রহ করে এই খবরগুলো নিয়ে কাল আমার সঙ্গে দেখা করলে বাধিত হব। কেমন পারবেন কি?
অগত্যা পারতেই হবে।
চলুন, এইবারে আপনাকে রাজবাড়িতে পৌঁছে দিই। আমরা আপনার বেশি সময় নিইনি, রাজভোজ এখনও আপনার জন্যে অপেক্ষা করে আছে!
গাড়ি ফিরল। সুন্দরবাবুও জাগ্রত হয়ে উঠলেন ধীরে-ধীরে। বললেন, জয়ন্ত, তোমার কার্যপদ্ধতিটা ঠিক ধরতে পারছি না। তুমি কি বিশ্বাস করো অলৌকিক দস্যুর বাসা আছে এই রাস্তাতেই?
আমার বিশ্বাস খুব দৃঢ় নয় সুন্দরবাবু। আমি কিছু কিছু আন্দাজ করছি মাত্র। কালো গাড়ির চালক বা মালিক সার্জেন্টের চোখের সামনে নিউ স্ট্রিটের ভিতরে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়নি। এখান থেকে বাইরে বেরুবার আর কোনও পথ নেই। তবে সে। গেল কোথায়? খুব সম্ভব, সার্জেন্ট নিউ স্ট্রিটের মোড় পর্যন্ত পায়ে হেঁটে এসে উঁকি মারবার আগেই সে তাড়াতাড়ি গাড়ি ছুটিয়ে নিজের গ্যারাজের কাছে এসে গাড়ি তুলে ফেলেছে। এইটুকুই আমার আন্দাজ। আপাতত এর উপরেই নির্ভর করে একটু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি? এই তো রাজবাড়ি। সাবধান সুন্দরবাবু, কাল আপনার হাতে জরুরি কাজ আছে, রাজভোজের আতিশয্যে যেন আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়বেন না!
জানি হে, জানি। ডিউটি ইজ ডিউটি।
.
পরদিন সকালে সুন্দরবাবুর দেখা পাওয়া গেল না। কিন্তু বৈকালি চায়ের আসরকে তিনি বয়কট করলেন না, হাজির হলেন একেবারে ধড়াচুড়ো পরেই।
কী সংবাদ?
অশুভ নয়। কিন্তু সারাদিন যথেষ্ট দৌড়োদৌড়ি করতে হয়েছে–উদরে শূন্যতা, কণ্ঠে মরুতৃষা। আগে কিঞ্চিৎ পানভোজনের ব্যবস্থা করো।
মানিক বললে, আজকের ব্যবস্থা মন্দের ভালো। কী কী আছে শুনবেন? পোট্যাটো স্যালাড, টি কেক, চকোলেট স্যান্ডউইচ আর চা।
