কিন্তু বাহবা দিই মহারাজার প্রাইভেট সেক্রেটারিকে। বিপদে পড়ে তিনি উপস্থিত বুদ্ধি হারালেন না। খবরের কাগজে অলৌকিক দস্যুর কীর্তি কাহিনি পাঠ করে তিনি নাকি আগে থাকতেই সতর্ক হয়ে ছিলেন। অলৌকিক দস্যু যেই মারমুখো হয়ে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়াল, তিনি তৎক্ষণাৎ হেঁট হয়ে পড়ে শিখ সেপাইটার প্রায় অবশ হাত থেকে বন্দুকটা ছিনিয়ে নিয়ে আক্রমণকারীকে লক্ষ করে গুলি ছুড়লেন।
কিন্তু অলৌকিক দস্যু অত্যন্ত হুঁশিয়ার ব্যক্তি, অত্যন্ত চতুর। সেক্রেটারি বন্দুকের ঘোড়া টেপবার আগেই সে চট করে গাড়ির পাশে পথের উপরে বসে পড়ল, গুলি তার গায়ে লাগল না। পরমুহূর্তেই সে নিজের আসুরিক শক্তির আশ্চর্য পরিচয় দিলে। সেক্রেটারি দ্বিতীয়বার বন্দুক ছোড়বার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, আচম্বিতে মহারাজার গাড়িখানা হুড়মুড় করে উলটে গেল, আরোহীরা ছিটকে পড়ল এদিকে ওদিকে! মানুষ শিশুদের খেলনার গাড়ি যত সহজে উলটে দিতে পারে, অলৌকিক দস্যু তেমনি অনায়াসেই গাড়িখানাকে তুলে আছড়ে ফেলে দিলে।
মাটির উপরে অতর্কিতে বিষম আছাড় খেয়ে আর জখম হয়েও সেক্রেটারি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলেন না। চোখের নিমেষে আবার তিনি উঠে পড়ে পথের উপর থেকে হস্তচ্যুত বন্দুকটা তুলে নিলেন, কিন্তু চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে অলৌকিক দস্যু লাফ মেরে নিজের কালো রঙের মোটরের ভিতরে গিয়ে ঢুকল সঙ্গে সঙ্গে গাড়িখানাও দৌড় মারলে তড়িৎ বেগে! সেক্রেটারি তবু আর একবার বন্দুক ছুড়লেন ছুটন্ত গাড়িখানাকে লক্ষ করে, কিন্তু গাড়ির গতি বন্ধ হল না।
গাড়ি থেকে বাইরে নিক্ষিপ্ত হয়ে প্রত্যেক আরোহীই অল্পবিস্তর চোট খেয়েছে বটে, কিন্তু লক্ষ টাকার অলঙ্কার থেকে মহারাজাকে বঞ্চিত হতে হয়নি। তারপর রাজবাড়ি থেকে ফোন পেয়ে আমি এখানে এসেছি তদন্ত করতে।
জয়ন্ত নীরবে সব শুনে প্রথমেই বললে, দেখছেন তো সুন্দরবাবু, আপনাদের অলৌকিক দস্যু আগ্নেয়াস্ত্রকে কতখানি ভয় করে?
দেখছি তো। তা হলে ব্যাপারটা অপার্থিব নয়, পার্থিব?
পৃথিবীতে অসাধারণ ব্যাপার থাকতে পারে, অসামান্য বৈজ্ঞানিক ব্যাপার থাকতে পারে, কিন্তু অপার্থিব কোনও কিছু আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না।
তা হলে সেদিন আমি যদি রিভলভার ছুঁড়ে লক্ষ্য ভেদ করতে পারতুম, তাহলে এই অদ্ভুত ডাকাতটার হাতেনাতে ধরা পড়বার সম্ভাবনা ছিল?
তাইতো মনে হয়।
হায় হায় হায় হায়, বোকার মতো গাধার মতো খামোকা ভয় পেয়ে কত বড় গৌরব থেকে আমি বঞ্চিত হলুম!
মানিক বললে, সুন্দরবাবু, এখনও আপনি বোকার মতো গাধার মতো বকবক করছেন।
হুম্ করছি নাকি?
করছেন না তো কি? যে দুধ চলকে পড়ে গিয়েছে তা নিয়ে আবার হায় হায় করা কেন?
তা যা বলেছ। তবে কি জানো, পোড়া মন যে সহজে বোঝ মানে না।
জয়ন্ত বললে, যেতে দিন ও কথা। এখন কাজের কথা থোক। মহারাজার প্রাইভটে সেক্রেটারি দেখছি অত্যন্ত সাবধানী ব্যক্তি।
তা আবার একবার করে বলতে?
কালো রঙের ফোর্ড গাড়িখানার নম্বর দেখতে নিশ্চয়ই তিনি ভুল করেননি?
নম্বর তিনি দেখে নিয়েছেন বইকী! কিন্তু সেই ভুয়ো নম্বর।
যাক। আপনার কাছে আর কিছু নতুন তথ্য আছে?
ছোট একটি তথ্য আছে বটে, কিন্তু সেটা আমাদের কাজে লাগবে না।
তথ্যটা কী?
অনতিবিলম্বেই ঘটনাস্থলে এসে আমি একবার তদারক করে গিয়েছি। একজন সার্জেন্টের মুখে শুনলুম, ঘটনা যখন ঘটে সেই সময়ে সে রাসবিহারী অ্যাভিনিউর পাশের একটা রাস্তা দিয়ে আসছিল। হঠাৎ সে দেখতে পায় একখানা কালো রঙের ফোর্ড গাড়ি অতিরিক্ত বেগে পথের উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। সে চেঁচিয়ে গাড়িখানা থামাতে বলে। কিন্তু চালক তার কথা গ্রাহ্যের মধ্যেও আনেনি, বরং আরও জোরে গাড়ি চালিয়ে দেয়। সার্জেন্টের সন্দেহ হয়, সে দাঁড়িয়ে পড়ে। গাড়িখানা মোড় ফিরে নিউ স্ট্রিটের ভিতর গিয়ে ঢোকে। সার্জেন্টও নিউ স্ট্রিট পর্যন্ত অগ্রসর হয়, কিন্তু গাড়িখানাকে আর দেখতে পায় না। এইটুকু তথ্য নিয়ে আমাদের কি লাভ হবে জয়ন্ত? নিউ স্ট্রিটের ভিতর দিয়ে গাড়িখানা কত দূরে গিয়ে পড়েছে কে তা বলতে পারে?
জয়ন্ত স্তব্ধ হয়ে রইল প্রায় তিন মিনিট। তার দুই চক্ষু মুদ্রিত।
সুন্দরবাবু অধীর হয়ে বললেন, কি হে, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?
উঁহুঁ।
তবে?
ভাবছি।
কী ভাবছ?
আপনার এই তথ্যটি ছোট্টও নয়, সামান্যও নয়।
মানে?
সার্জেন্টের উচিত ছিল নিউ স্ট্রিটের মোড় পর্যন্ত না গিয়ে দৌড়ে তার ভিতর প্রবেশ করা।
কেন?
তাহলে খুব সম্ভব সে কোনও অত্যন্ত দরকারি সূত্র আবিষ্কার করতে পারত।
কেমন করে?
কেমন করে জানি না। তবে এটুকু জানি যে, নিউ স্ট্রিট সত্য সত্যই একটি নতুন রাস্তা। বালিগঞ্জের অনেক নতুন রাস্তার মতো এটিও এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। পূর্বদিকে খানিকটা এগুবার পর দেখা যায়, অসম্পূর্ণ রাস্তার দুই ধারে আর সামনে আছে এবড়োখেবড়ো খণ্ড খণ্ড খোলা জমি, তার উপর দিয়ে মোটর চলা অসম্ভব! নিউ স্ট্রিটের যে অংশটুকুর ভিতরে লোকের বসতি আছে, তার কোনও জায়গা দিয়েও মোটরের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার পথ নেই। এ থেকে কি বুঝতে হবে সুন্দরবাবু?
সুন্দরবাবু কিছুক্ষণ নীরব ও চমৎকৃত হয়ে রইলেন। তারপর অভিভূতের মতো বলে উঠলেন, তুমি কি বলতে চাও জয়ন্ত? সেই কালো রঙের গাড়িখানা ছিল নিউ স্ট্রিটের ভিতরেই?
