মানিক শুধোলে, আন্দাজটা কি, শুনতে পাই না?
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বললে, না, আমার আন্দাজ নিয়ে তোমাকে চমকে দিতে চাই না।
কিন্তু এরকম উদ্ভট মূর্তি সম্ভবপর কিনা, সে বিষয়ে তুমি কিছু চিন্তা করেছ?
করেছি বই কী! কেবল আমি নই, পাশ্চাত্য দেশেও এবিষয় নিয়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ যথেষ্ট মস্তিষ্ক চালনা করেছেন।
মানিক সোৎসাহে বলে উঠল, কীরকম?
সম্প্রতি একখানা ইংরেজি কাগজে দেখলুম, কানাডার Defence Research Board এর চেয়ারম্যান ডক্টর এইচ. এম. সোল্যান্ড মতো প্রকাশ করেছেন–
তার কথায় বাধা দিয়ে বেজে উঠল টেলিফোনের ঘন্টিটা।
জয়ন্ত মুখের কথা শেষ না করেই উঠে গিয়ে রিসিভার ধরে বললে, হ্যালো! সুন্দরবাবু নাকি? কী খবর? আঁঃ, আবার অলৌকিক দস্যুর আবির্ভাব? কোথায় বললেন? রাসবিহারী অ্যাভিনিউর উপরে? কোথা থেকে ফোন করছেন? মহারাজা বাহাদুর দুর্গাপ্রসাদ সিংহের প্রাসাদ থেকে? হ্যাঁ, সে প্রাসাদ আমি চিনি। আমাকে এখনি যেতে হবে? তথাস্তু!
রিসিভার রেখে দিয়ে জয়ন্ত ফিরে বললে, সব শুনলে তো মানিক? যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হও। আমিও জামাকাপড় বদলেনি।
মানিক উঠে দাঁড়িয়ে বললে, এ কী নির্ভীক দস্যু? এখনও রাত গম্ভীর হয়নি, রাসবিহারী অ্যাভিনিউর মতো জনবহুল বড় রাস্তার উপরে
জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত বললে, না মানিক, তোমাদের ওই অলৌকিক দস্যু নির্ভীক হলেও নির্বোধ নয়। আকাশের ঘোর ঘটা, মেঘের জটা, বিদ্যুতের ছটা আর ধারাপাতের পটাপট শব্দ শুনেও কি আন্দাজ করতে পারছ না যে, কবিদের ভাষায় এখন পন্থ বিজন, তিমির সঘন? গিয়ে দেখবে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ এখন রীতিমতো ফাঁকা জায়গা।
মোটরে বেরিয়ে তারা দেখলে, শহরের যেসব রাস্তা জনতার জন্যে বিখ্যাত, আজ হয়ে পড়েছে প্রায় জনহীন। আকাশ কালিমাখা, থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে, এঁকেবেঁকে সঙ্গে সঙ্গে ডেকে ডেকে উঠছে বজ্র, হেঁকে হেঁকে ছুটছে ঝোড়ো হাওয়া এবং ঝমঝম করে ঝরছে অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারা। কোনও কোনও পথ আবার হয়ে উঠছে তরঙ্গময় নদীর মতো। নিতান্ত দায়ে না পড়লে মানুষ তো দুরের কথা কুকুর-শেয়ালও আজ বাইরে বেরুতে রাজি হবে না।
রাসবিহারী অ্যাভিনিউ হয়ে পড়েছে নির্জন। খরিদ্দারের অভাব দেখে দোকানদাররাও আলো নিবিয়ে দোকান বন্ধ করে সরে পড়েছে। কেবল সরকারি আলোগুলোই কলকাতার রাস্তাকে উজ্জ্বল করে তুলতে পারে না, তাকে যথার্থরূপে সমুজ্জ্বল করে তোলে দোকানিদেরই দেওয়া সন্ধ্যাদীপ; তার অভাবে বহু স্থানেই দেখা যাচ্ছে আলো-আঁধারির লীলা! মাঝে মাঝে দেখা যায়। এক-একজন বৃষ্টিস্নাত শীতকাতর জড়সড় পথিককে, হাতে তার ছাতা আছে, কিন্তু খোলবার উপায় নেই, কারণ বোঁ বোঁ করে বইছে এমনই জোর হাওয়া যে খুললেই ছত্র উলটে গিয়ে পরিণত হবে আকাশের জলপাত্রে।
জয়ন্ত বললে, দেখছ তো মানিক, চারিদিকের অবস্থা। যে অপরাধী এমন সুযোগ ত্যাগ করে তাকে কেউ বুদ্ধিমান বলবে না।
মোটর মহারাজা দুর্গাপ্রসাদের ফটক ও বাগান পার হয়ে গাড়িবারান্দার তলায় গিয়ে দাঁড়াল! মোটরের শব্দ শুনেই বাইরে এসে সুন্দরবাবু শুধোলেন, জয়ন্ত-ভায়া নাকি?
গাড়ির গতি থামিয়ে জয়ন্ত বললে, হুঁ।
বাড়ির ভিতরে ভারি লোকের ভিড়। আমি আগে তোমার সঙ্গে গোপনে কথা কইতে চাই।
বেশ তো, গাড়ির ভিতরে আসুন না!
সুন্দরবাবু ভিতরে ঢুকে জয়ন্তের পাশে এসে বসলেন।
জয়ন্ত বললে, সমাচার?
অলৌকিক দস্যু আবার দেখা দিয়েছে, আক্রমণ করেছে–এবং পালিয়ে গিয়েছে।
পালিয়ে গিয়েছে!
হ্যাঁ, যাকে বলে দস্তুরমতো পিঠটান!
কার ভয়ে সে পালিয়ে গিয়েছে?
বন্দুকের বুলেটের ভয়ে।
কেউ বন্দুক ছুঁড়েছিল?
হ্যাঁ। তাই লুট করতে এসেও সে জুৎ করতে পারেনি।
তারপর?
বলতে গেলে গোড়ার দু-চারটে কথা খুলে বলতে হয়। মহারাজা দুর্গাপ্রসাদের প্রথম পুত্রের বিবাহ হবে মধ্যপ্রদেশের এক সামন্ত রাজার কন্যার সঙ্গে। দুর্গাপ্রসাদ তাঁর পুত্রবধূকে লক্ষ টাকা মূল্যের জড়োয়া গহনা যৌতুক দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। গহনাগুলি নির্মাণ করবার ভার পড়েছিল কলকাতায় এক বিখ্যাত রত্নজীবীর উপরে। এই পর্যন্ত হল গোড়ার কথা।
তারপর?
আজ সন্ধ্যার পর রত্নজীবী স্বয়ং সমস্ত গহনা দিয়ে প্রাসাদে আসবেন শুনে মহারাজ নিজের গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। গাড়ির ভিতরে মহারাজার প্রাইভেট সেক্রেটারির সঙ্গে ছিল চালক আর একজন সশস্ত্র শিখ সেপাই। অলৌকিক দস্যুর কীর্তি মহারাজেরও কানে উঠেছিল, তাই এই সাবধানতা। রত্নজীবীকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে গাড়ি ফিরে আসছিল প্রাসাদের দিকে। আজকের দুর্যোগটা দেখছ তো? এরই ভিতর দিয়ে গাড়ি যখন রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে এসে পৌঁছোয়, পথে তখন লোকজন ছিল না বললেই চলে। হঠাৎ পাশের একটা রাস্তা থেকে একখানা কালো রঙের মোটর মহারাজার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে গতি বন্ধ করে দেয়। পরমুহূর্তেই নতুন মোটরখানার ভিতর থেকে বাইরে লাফিয়ে পড়ে সেই অলৌকিক দস্যু, তার চেহারার নতুন বর্ণনা দেওয়ার আর দরকার নেই। বীভৎস মূর্তিটা বেগে ছুটে এল মহারাজার গাড়ির দিকে। তার অভাবিত আকৃতি দেখে শিখ সেপাইটা আমারই মতো আতঙ্কে আর বিস্ময়ে একেবারে আড়ষ্ট হয়ে রইল, তার কাছে যে বন্দুক আছে একথা পর্যন্ত ভুলে গেল। চালকের অবস্থাও তথৈবচ, রত্নজীবী সভয়ে চিৎকার করে উঠলেন।
