চালককে অনেকেই দেখেছে বটে, কিন্তু রাত্রের অন্ধকারে কেউ তাকে ভালো করে দেখতে পায়নি।
সেখানা কি গাড়ি?
ফোর্ড।
নম্বর পেয়েছেন?
প্রথম ঘটনায় চিনুভাই যেদিন আহত হয়, সেইদিনই নম্বর পাওয়া গেছে। কিন্তু ভুয়ো নম্বর। সে নম্বরের কোনও গাড়ি নেই।
মুর্তিটার প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে এই : চোখ দিয়ে অতি উজ্জ্বল আলো বেরোয়। বর্মধারী। একসঙ্গে অনেকগুলো কণ্ঠস্বরে কথা কয়। নীরবে হাসে। ভেঁ-ভোঁ শব্দ করে। গোলাকার মাথা ঘিরে চাকার মতো কি তিনখানা আছে। জুতোর তলায় চাকা বা স্কেট পরে। অদ্ভুত সব বিশেষত্ব–মানুষী ভাবের সঙ্গে অমানুষী ভাবের মিল। কিন্তু মূর্তিটার মস্তিষ্ক আছে। চোখ দিয়ে দেখে, মন দিয়ে ভাবে, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করে, অনায়াসেই পুলিশকে ফাঁকি দেয়, আবার মানুষদের মধ্যে শারীরিক শক্তিতেও অতুলনীয়–ছয়-ছয়জন বলবান পাহারাওয়ালাকেও এক এক আঘাতে ভূমিসাৎ করে। আমার সামনে এক আশ্চর্য সমস্যা এনে দিলেন সুন্দরবাবু! ফস করে এ সমস্যার সমাধান করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।
কিন্তু জয়ন্ত, যতদিন এ সমস্যার সমাধান না হয়, ততদিন কলকাতা হয়ে থাকবে একটা বিপদজনক জায়গা।
উপায় কি, অবলম্বন করবার মতো কোনও সূত্ৰই তো খুঁজে পাচ্ছি না। অপরাধী যদি বর্ম পরে, তবে তার আসল রূপ কেউ দেখতে পায় না, তার হাতের আঙুলের বা পায়ের ছাপেরও কোনও মূল্য থাকে না। এই বিংশ শতাব্দীতে বর্ম পরে রাহাজানি করা একটা নতুন ব্যাপার বটে। চোখ দিয়ে আগুন বার করা, হয়তো কোনও যান্ত্রিক কৌশল। কিন্তু কোনও মানুষ একসঙ্গে বহু কণ্ঠে কথা কয়, এটা কখনও শুনেছেন? আবার দেখুন, মূর্তিটা মানুষের মতো মাথা খাঁটিয়ে নিজের স্বাধীন বুদ্ধি ব্যবহার করতে পারে। আরও একটা ব্যাপার লক্ষ করবার আছে। তিনটি ঘটনাস্থলেই মুর্তিটা বেছে বেছে আক্রমণ করেছে কেবল অবাঙালিদেরই।
এ থেকে কি বুঝতে হবে?
এখনও ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে এটা একটা উল্লেখযোগ্য সূত্র বটে। এরও দুটো দিক আছে। অপরাধী নিজেও হয়তো মারোয়াড়ি, তাই মারোয়াড়িদের হাঁড়ির খবরই ভালো করে রাখতে পারে।
কিন্তু কেবল মারোয়াড়িদের সম্পত্তিই সে লুণ্ঠন করেনি।
হ্যাঁ তাও জানি। চিনুভাই চুনীলাল হচ্ছে গুজরাটি নাম। কিন্তু সে তো অবাঙালি।
তাহলে কি মারোয়াড়িদের উপরেই আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে?
তাই-ই বা বলি কেমন করে? অপরাধী নিজে বাঙালি হতেও পারে। তাই যে সব অবাঙালি এদেশে এসে বাংলার টাকা লুণ্ঠন করছে, তাদের উপরেই তার জাতক্রোধ। তবে একটা কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। অপরাধ যাদের পেশা, সেই পুরাতন পাপীর দলে আমাদের আসামিকে খুঁজে পাব না। পুরাতন পাপীরা যে পদ্ধতিতে অপরাধ করে, আমাদের কাছে তা অজানা নেই। বর্তমান ক্ষেত্রের পদ্ধতি হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন। এসব রাহাজানির পিছনে কাজ করেছে কোনও সুশিক্ষিত, আধুনিক আর বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্ক। মারোয়াড়ি মহলে এ শ্রেণির মস্তিষ্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই আমার সন্দেহ হয়, অপরাধী বাঙালি–সে বিশেষরূপে শিক্ষিত আর বিজ্ঞান নিয়ে কেবল নাড়াচাড়াই করে না, হয়তো সে সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ।
তাহলে আপাতত এই সূত্র ধরেই আমাকে কাজ আরম্ভ করতে বলো?
হ্যাঁ। তবে আরও একটা ছোট সূত্র আছে বটে কালো রঙের ফোর্ড। কিন্তু কলকাতায় ওরকম গাড়ির অধিকারীর সংখ্যা অল্প নয়, সুতরাং এখন ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই– যদিও সূত্রটা পরে কাজে লাগবে বলে মনে হচ্ছে।
সুন্দরবাবু বললেন, হুম্ এইবারে আমি চা পান করতে পারি। চায়ের সঙ্গে আর কি আছে?
আমেরিকান ব্রেকফাস্ট বিস্কুট আর এগ-টোস্ট।
চমৎকার, চমৎকার! অবিলম্বে আনয়ন করো।
পরিতৃপ্ত মুখে পানাহার করতে করতে সুন্দরবাবু বললেন, সেই দুঃস্বপ্ন হারিয়ে দেওয়া মূর্তিটাকে প্রথম যখন চোখের সামনে দেখেছিলুম, তখন আবার যে তোমার এখানে এসে চা আর এগ-টোস্ট প্রভৃতি এড়াতে পারব, সে আশায় একেবারেই দিয়েছিলুম জলাঞ্জলি।
মানিক বললে, আমি বলতে পারি, আপনি নিশ্চয়ই মূর্তিটাকে ভালো করে দেখতে পাননি।
হুম, কেমন করে জানলে?
চোখের সামনে আপনি খালি দেখেছিলেন রাশি রাশি সরষের ফুল। সে সময়ে আর কিছু দেখা চলে না।
তোমার এ অনুমান সত্য। চোখের সামনে আমি সরষের ফুল দেখেছিলুম বটে। কিন্তু সেটা কারণ নয়, কার্য। কেন না মুর্তিটাকে আরও ভালো করে দেখতে না পেলে সেদিন কখনওই স্বচক্ষে আমি সরষের ফুল দেখতে পেতুম না। বুঝলে হে নিরেট?
.
তৃতীয় পরিচ্ছেদ । রাজবাড়ির ভোজ
সাতদিন কেটে গেল পরে পরে।
জয়ন্ত যখনই অবসর পায়, চোখ মুদে কি ভাবে ইজিচেয়ারে অর্ধশয়ান অবস্থায়। এই কয় দিন সে প্রভাতে ও সন্ধ্যায় তার নিত্য-নৈমিত্তিক ভ্রমণ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছে। রোজ সে। একবার না একবার বাঁশি বাজাই। কিন্তু তার বাঁশি এখন বোবা। খুশি হলেই নস্য নেওয়া তার স্বভাব। কিন্তু তার মেজাজ আজকাল নিশ্চয়ই খুশি নয়, কারণ এ হপ্তায় একবারও সে নস্য নেয়নি। এমনকী আহারও করে নামমাত্র। বলে, পুর্ণোদরে মস্তিষ্ক উচিতমতো কাজ করে না।
সেদিনকার সন্ধ্যা ছিল বৃষ্টিকাতর। মানিককে ডেকে জয়ন্ত বললে, দেখো, জটিল আর আশ্চর্য মামলা আমি ভালোবাসি। কিন্তু এ মামলাটার ভিতর সূত্রগুলো এমন জট পাকিয়ে আছে যে, অসম্ভবকে সম্ভবপর মনে না করলে স্থানে স্থানে একেবারেই খেই খুঁজে পাওয়া যায় না। মূর্তিটার চোখে আগুন, পায়ে চাকা আর গায়ে বর্ম আছে শুনে আমি ততটা বিস্মিত হইনি, যতটা হয়েছি একসঙ্গে সে বহু কণ্ঠে কথা কইতে পারে শুনে। এটা হচ্ছে অপার্থিব ব্যাপার, পৃথিবীর কোনও মানুষই তা পারে না। অথচ ভেবে ভেবে আমি এমন কিছু আন্দাজ করে নিয়েছি, কেউ যা যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করবে না।
