তার উচ্চতা সাত ফুটের কম হবে না। কেশলেশহীন গোলাকার মাথা বেড়ে রয়েছে তিনখানা চাকার মতো কি! প্রায় মানুষের মতো মুখ, কিন্তু মড়ার মতো ভাবহীন। মানুষেরই মতো দুইখানা হাত আর দুইখানা পা, কিন্তু তার আপাদমস্তক যেন অদ্ভুত এক লোহার বর্ম দিয়ে ঢাকা! আর তার সেই চোখ! সে দুটো সত্যই যেন চোখ নয়–যেন হেডলাইটের তীব্র আলো! তার সেই অতি আজব আলোক চক্ষুদুটো ঘুরে ঘুরে এদিকে-ওদিকে যে দিকে ফিরছে সেই দিকটাই হয়ে উঠছে আলোয় আলোয় আলোময়!
আমি তো অবাক! দস্তুরমতো কিংকর্তব্যবিমূঢ়! তা না হয়ে উপায়ও ছিল না। অতি ভীষণ দুঃস্বপ্নেও যা কোনওদিন কেউ কল্পনা করতে পারেনি, তাকেই দেখছি চোখের সামনে এই রাজধানী কলকাতার রাজপথে একেবারে সাকার অবস্থায়! তখনি যে মাথা ঘুরে জ্ঞান হারিয়ে চিৎপটাং হইনি, এজন্যে নিজেই আমি নিজেকে যথেষ্ট বাহাদুরি দিতে পারি।
মূর্তিটা কথা কইলে। বেয়াড়া গলায় বললে, ভোঁ-ভোঁ-ভোঁ-ভোঁ।
ভোঁ-ভো কি রে বাবা? ওর মানে কী? মূর্তির হাতে একটা বেশ বড়সড়ো মোড়ক রয়েছে, তার ভিতরেই কি আছে? ওটা গদি থেকে লুট করা কোনও চোরাই মাল নয় তো?
আমি তখনই সজাগ হয়ে চেঁচিয়ে উঠলুম, এই সেপাই! পাকড়া, পাকড়া!
ছয়-ছয়জন বলিষ্ঠ হৃষ্টপুষ্ট পশ্চিমা পাহারাওয়ালা চারিদিক থেকে ছুটে গিয়ে আক্রমণ করলে মূর্তিটাকে।
কিন্তু চোখের নিমেষে যে কাণ্ডটা হল, বললে তোমরা হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না। মুর্তিটা মাত্র একখানা হাত ও একখানা পা ব্যবহার করে কারুকে মারলে ঘুসি এবং কারুকে মারলে লাথি–একবারের বেশি দ্বিতীয় বার কারুকে মারতে হল না, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেই ছয়-ছয়জন জোয়ান পাহারাওয়ালা দারুণ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠে প্রপাত ধরণীতলে! তাদের কেউ অজ্ঞান হয়ে গেল, কেউ-বা ছটফট করতে লাগল। জয়ন্ত, তোমার গায়ে যে অসুরের মতো শক্তি আছে, তার বহু প্রমাণ আমি পেয়েছি। কিন্তু সেই মূর্তিটার পাল্লায় পড়লে তুমিও যে কিছুতেই আত্মরক্ষা করতে পারবে না, এ বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। তার যে অবিশ্বাস্য শারীরিক শক্তির প্রমাণ পেলুম, আমার তো বিশ্বাস সে একলা অনায়াসেই মত্ত মাতঙ্গের সঙ্গে লড়াই করতে পারে।
হঠাৎ মূর্তিটা ফিরে দাঁড়িয়ে আগুন-চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ওষ্ঠাধর ফাঁক করে হাসলে যেন একটা মৌন হাসি! তার পরেই তার অপার্থিব কণ্ঠের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একসঙ্গেই অনেকগুলো গলায় আশ্চর্য সব আর্ত চিৎকার–একসঙ্গেই সেই ছয়-ছয়জন পাহারাওয়ালার কণ্ঠনিঃসৃত আর্তনাদের অবিকল পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ যেন আবার তার গলার ভিতর দিয়ে ছয়জন পাহারাওয়ালা চেঁচিয়ে কেঁদে ককিয়ে উঠল ছয়রকম স্বরে! বিশ্বাস করো ভাই জয়ন্ত একটা কথাও আমি একটুও ভুল শুনিনি, স্বকর্ণে আর সজ্ঞানে শ্রবণ করলুম, মূর্তিটার মুখ থেকে আবার বেরিয়ে এল প্রত্যেক পাহারাওয়ালার বিভিন্ন স্বরের ক্রন্দনধ্বনি।
তিনজন পাহারাওয়ালা নিদারুণ আঘাতেও অজ্ঞান না হয়ে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছিল, এই আজব ব্যাপারে যন্ত্রণা ভুলে তারা সভয়ে চোখগুলো বিস্ফারিত করে একেবারে আড়ষ্ট হয়ে রইল।
এই সব দেখেশুনে আমার নাড়ি যখন প্রায় ছাড়ি ছাড়ি করছে, মুর্তিটা হঠাৎ তিরের মতো দৌড়োতে শুরু করলে। তাও সাধারণ মানুষের দৌড় নয়, কারণ দৌড়োবার সময়ে আমরা যেমন দ্রুতবেগে পদচালনা করি, সে মোটেই তা করলে না। মনে হল তার দুই পায়ের তলায় আছে একজোড়া স্কেট বা তুষারপাদুকা, আর তারই সাহায্যে পা না বাড়িয়েই চো করে সে চলে গেল ফুটপাথের ওপর দিয়ে সোজা! মোড় ফিরে সে অদৃশ্য হল, তার পরই শোনা গেল একখানা চলন্ত মোটরের শব্দ। বোধহয় ওখানে মোড়ের মাথায় এতক্ষণ তারই জন্যে অপেক্ষা করছিল কোনও মোটরগাড়ি।
পরে জানা গেল, সেদিন কানহাইয়ালালের গদিতে বাহির থেকে এসেছিল মোট ষাট হাজার টাকার একশো টাকার নোট। সেগুলো একটা মোড়কের মধ্যে বাঁধা ছিল। আগে থেকে কোনও রকম জানান না দিয়ে মূর্তিটা হঠাৎ গদির ভিতরে ঢুকে পড়ে এবং অনায়াসেই লোহার আলমারির চাবির কল ভেঙে হস্তগত করে নোটগুলো। তার অতিকায় কিম্ভুতকিমাকার মূর্তি দেখেও ভয় না পেয়ে কিংবা কর্তব্যের খাতিরে বোকার মতো যারা তাকে বাধা দিতে গিয়েছে, তাদের প্রত্যেককেই পাঠাতে হয়েছে হাসপাতালে।
জয়ন্ত, মানিক, মোটামুটি এই হল আমার কাহিনি। এখন তোমাদের মতামত কি?
জয়ন্ত চুপ করে বসে বসে খানিকক্ষণ ধরে কি ভাবলে। তারপর শুধোলে, আমার প্রথম জিজ্ঞাস্য হচ্ছে, ঘটনার দিন আপনার কাছে রিভলভার ছিল?
ছিল বই কী!
সেটা আপনি ব্যবহার করেননি কেন?
আরাম কেদারায় বসে এরকম প্রশ্ন করা খুবই সহজ বটে কিন্তু ঘটনাস্থলে হাজির থাকলে তুমিও আমার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারতে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। ঘটনাগুলো বলতে এতক্ষণ লাগল কিন্তু ঘটেছিল বোধহয় মিনিট খানেকের মধ্যেই। আর সেই এক মিনিট সময় মূর্তিটাকে আর তার কাণ্ডকারখানা দেখে আমি এমন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলুম যে, রিভলভারের কথা আমার মনেই পড়েনি। সেটা ভূত না মানুষ না অন্য কোনও কিছু, এখনও পর্যন্ত আমি তা আন্দাজ করতে পারছি না।
আমার বিশ্বাস, আপনি রিভালভার ছুঁড়লেই সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে যেত। যাক সে কথা–গতস্য শোচনা নাস্তি। আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, সেই কালো রঙের মোটরখানার চালককে কেউ দেখেছে কি?
