চোখের পলক ফেলিতে না ফেলিতে সেই বীভৎস মূর্তিটা রত্ন-ব্যবসায়ীদের উপরে ঝাপাইয়া পড়িয়া মূল্যবান ব্যাগ দুইটি ছিনাইয়া লয়, –চিনুভাই বাধা দিবার চেষ্টা করিতেই সে তাহাকে এমন সজোরে ঘুসি মারে যে, চোয়ালের হাড় ভাঙিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ অচেতন হইয়া পড়েন। পরমুহূর্তে মূর্তিটা আবার মোটরে গিয়া ওঠে এবং ড্রাইভারও তিরবেগে গাড়ি চালাইয়া অদৃশ্য হইয়া যায়।
এমন অমানুষিক দস্যু কেহ কখনও দেখে নাই এবং এমন অসম-সাহসিক রাহাজানির কথাও কেহ কখনও শ্রবণ করে নাই। বড়বাজারে ভীষণ উত্তেজনার সৃষ্টি হইয়াছে। অনেকেই ব্যাপারটাকে অলৌকিক ঘটনা বলিয়া ধরিয়া লইয়াছে। কিন্তু ইহার মধ্যে লৌকিক রহস্য হইতেছে যে, হতভাগ্য রত্ন বণিকদের প্রায় লক্ষাধিক টাকার জিনিস খোয়া গিয়াছে। পুলিশ জোর তদন্তে নিযুক্ত হইয়াছে। খোঁজখবর লইয়া আমরা পরে এ সম্বন্ধে আমাদের মতামত প্রকাশ করিব।
জয়ন্তের পাঠ শেষ হলে পর সুন্দরবাবু আর এক টুকরো কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন, ওই কাগজেই দ্বিতীয় একটি ঘটনার বিবরণ বেরিয়েছে। এগারোই মে তারিখের ঘটনা।
জয়ন্ত আবার পড়লেঃ
আবার সেই অমানুষিক দস্যু
অতিকায় অমানুষিক দস্যু দ্বিতীয়বার দেখা দিয়াছে।
গুলজারিমল আগরওয়ালা একজন বিখ্যাত মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী। গতকল্য সন্ধ্যার পর তিনি নিজের মোটরে মফস্সল হইতে কলিকাতায় ফিরিতেছিলেন। তাঁহার সঙ্গে ছিল মোট পনেরো হাজার টাকা মূল্যের কয়েকটি সোনার বার বা তাল। সেগুলো একটা কাঠের বাক্সের ভিতরে বন্ধ ছিল। গাড়ির মধ্যে ছিল আরও তিনজন লোক–চালক ও দুইজন দ্বারবান, তাদের মধ্যে একজন বন্দুকধারী।
গাড়ি যখন দমদম ছাড়াইয়া আসিয়াছে, তখন বিপরীত দিক হইতে হঠাৎ একখানা কালো রঙের প্রাইভেট মোটর ছুটিয়া আসিয়া পথ জুড়িয়া দাঁড়াইয়া পড়ে। গুলজারিমলের ড্রাইভারও তার গাড়ি থামাইতে বাধ্য হয়।
আচম্বিতে কালো রঙের গাড়ির ভিতর হইতে একটা ভয়াবহ মূর্তি পথের উপরে লাফাইয়া পড়ে! মাথায় সে প্রায় সাত ফুট লম্বা এবং তার দুই চক্ষে জুলজুলে প্রচণ্ড অগ্নিশিখা! তার সেই ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখিয়া গাড়ির আরোহীদের দেহ-মন-চক্ষু দারুণ আতঙ্কে আচ্ছন্ন হইয়া যায় এবং তাদের সেই আচ্ছন্ন ভাবটা কাটিতে না কাটিতেই মূর্তিটা গাড়ির ভিতরে লাফাইয়া পড়ে। তারপর প্রত্যেক আরোহীকেই এমন বিদ্যুৎবেগে শিশুর মতো শুন্যে তুলিয়া পথের উপরে ছুড়িয়া ফেলিয়া দেয় যে, কেউ একখানা হাত পর্যন্ত নাড়িবারও অবসর পায় না।
পথের ওপরে গিয়া পড়িয়া কেউ অর্ধচেতন ও কেউ-বা একেবারেই অচেতন হইয়া যায়। তারপর ভালো করিয়া জ্ঞান ফিরাইয়া পাইবার পর তারা দেখে, গুঞ্জারিমলের গাড়ির ভিতর হইতে সোনার তালের বাক্সটা অদৃশ্য এবং সেই কালো গাড়িখানারও আর কোনও পাত্তা নাই।
বেশ বুঝা যাইতেছে, এই আশ্চর্য ও ভয়াল মুর্তিটাই গত তেসরা তারিখের রাত্রে বড়বাজারে গিয়া রাহাজানি করিয়াছিল। এমন রহস্যময় ঘটনা কলিকাতায় আর কখনও ঘটিয়াছে। বলিয়া শুনি নাই। পুলিশ যদি অবিলম্বে এই রহস্যের কিনারা করিতে না পারে, তাহা হইলে কলিকাতায় কোনও ধনীই আর নিজের ধনপ্রাণ নিরাপদ বলিয়া মনে করিতে পারিবেন না।
পড়া শেষ করে জয়ন্ত বললে, এর পরেও আর কোনও ঘটনা ঘটেনি তো?
সুন্দরবাবু বললেন, ঘটেছে বই কী! কিন্তু এবারে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করবেন সুন্দরবাবু স্বয়ং।
বলেন কি।
এইবার তোমরা আমার মুখেই শুনতে পাবে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা।
তাহলে সেই অমানুষিক মূর্তির সঙ্গে আপনারও চাক্ষুষ পরিচয় হয়েছে?
হ্যাঁ, শোনো!
.
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ । অগ্নিচক্ষুর কাণ্ড
সুন্দরবাবু বললেন, সতেরোই মে তারিখের রাত্রি। কলকাতার পথে-পথে আজকাল গুন্ডার অত্যাচার বড়ই বেড়ে উঠেছে। রোজই থানায় থানায় নালিশের পর নালিশ হয়। তাই সেদিন রাত বারোটার পর জনকয় লোক নিয়ে রোদে বেরিয়েছিলুম, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটনাগুলো ঘটে রাত্রিবেলাতেই।
হঠাৎ কানহাইয়ালাল হরগোবিন্দের গদির সামনে গিয়ে দেখি হুলুস্থুল কাণ্ড! লোকজনের ছুটোছুটি, হুটোপুটি, চিৎকার, আর্তনাদ–সে কী হল্লা! তাড়াতাড়ি দলবল নিয়ে সেইদিকে দৌড়ে গেলুম। গদির ভিতর থেকে একজন লোক বাইরে বেরিয়ে ছুটে পালিয়ে আসছিল, তার একখানা হাত চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করলুম, ব্যাপার কী? সে সভয়ে পিছনপানে একবার তাকিয়েই কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল, ভূত! দৈত্য! রাক্ষস! তার পরই প্রাণপণ শক্তিতে এক টান মেরে আমার হাত ছাড়িয়ে চটপট পা চালিয়ে পালিয়ে গেল!
ভূত? দৈত্য? রাক্ষস? তোমরা বুঝতেই পারছ তো, তার আগেই কলকাতার ওই দুটো আশ্চর্য ঘটনার কথা আমার কর্ণগোচর হয়েছে। আমারও মনটা তৎক্ষণাৎ চাঙ্গা হয়ে উঠল। হুম, পুলিশের কাছে ভূত-দৈত্য-রাক্ষস বলে কিছুই নেই–ডিউটি ইজ ডিউটি! সাক্ষাৎ শমনের নামেও ওয়ারেন্ট বেরুলে আমরা তাকে গ্রেপ্তার করবার চেষ্টা করব। ভগবানের হুকুমের উপরেও থাকে আমাদের ওপরওয়ালার হুকুম। সুতরাং সেই ভূত কিংবা রাক্ষসের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে পাহারাওয়ালাদের ডেকে নিয়ে গদির ভিতরে ঢুকব ঢুকব করছি, এমন সময়ে শুনতে পেলুম, বাড়ির ভিতর থেকে বাইরের দিকে এগিয়ে আসছে কেমন একটা ধাতব শব্দ–ঘটাং, ঘটাং, ঘটাং! তার পরই চোখের সামনে দেখা দিলে যে বিভীষণ মূর্তি, ভাষায় তার সঠিক বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব, কারণ তেমন সৃষ্টিছাড়া মূর্তি বর্ণনা করবার জন্যে মানুষের ভাষা সৃষ্টি হয়নি।
