মেঝের ওপরে অল্প ছটফট করেই নফরচন্দ্র ওরফে সত্যানন্দের মূর্তি নিশ্চেষ্ট ও একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গেল। তার কপাল থেকে বেরুতে লাগল ঝলকে ঝলকে রক্ত।
সুন্দরবাবু আপশোশ করে বলে উঠলেন, হায় হায় হায়! নফরা আমাকে লাথি মেরেও ফাঁকি দিলে, ব্যাটাকে ফাঁসিকাঠে দোল খাওয়াতে পারলুম না! ছি জয়ন্ত, ওকে তোমার বাধা দেওয়া উচিত ছিল?
জয়ন্ত হেসে বললে, উচিত তো ছিল, কিন্তু আপনি এমন কমলির মতন আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন যে আমার অবস্থা তখন ন যযৌ ন তহৌ। তবে আপনার একূল ও কূল দুকূল নষ্ট হয়নি, নফরচন্দ্রের লাশ দাখিল করতে পারলেও আপনার ভাগ্যে লাভ হবে পুরস্কারের পঞ্চসহস্র মুদ্রা।
পুরস্কারের কথা মনে হতেই সুন্দরবাবু একমুখ হাস্য করলেন। তারপর বুকের ওপরে হাত বুলোতে-বুলোতে বললেন, নফরা তো পটল তুলল, কিন্তু রবীন্দ্রবাবুর মুক্তো তিনটে কোথায় লুকিয়ে রেখে গেল।
জয়ন্ত বললে, আশা করি এখানে খানাতল্লাশ করলেই মুক্তো পাওয়া যাবে। আর নফরের হাতের ওই রিভলভারটা দেখুন। আমার বিশ্বাস, রবীন্দ্রবাবু মারা পড়েছেন ওই রিভলভারের বুলেটেই।
নবযুগের মহাদানব (উপন্যাস)
প্রথম পরিচ্ছেদ । অলৌকিক দস্যু
কলকাতার মায়ারঞ্জু ছেদন করেছিল জয়ন্ত ও মানিক।
বাসা বেঁধেছিল তারা পুরীর সমুদ্রতটে, একেবারে এক দিকের শেষ বাড়িতে। সেখানে মানুষের আনাগোনা খুব কম, চোখ খুললেই দেখা যায় কেবল নীল সাগরের তরঙ্গের পর তরঙ্গ সাদা ফেনার মালা পরে সুদীর্ঘ সৈকতের উপরে ভেঙে পড়ছে আর পড়ছে আর পড়ছে– ভেঙে পড়ছে অহরহ, কিবা রাত কিবা দিন! সূর্য এসে চন্দ্র এসে সেই সদাচঞ্চল চলচ্চিত্রের উপরে মাখিয়ে দিয়ে যায় সোনালি-রূপোলি আলোর পালিশ। আরও দূরে নজর চালিয়ে যাও, পাবে কেবল নিস্তরঙ্গ, নিশ্চেষ্ট নীলিমার অসীমতা এবং সর্বক্ষণই মুগ্ধ চোখে ওই দেখতে দেখতে তৃপ্ত শ্রবণে শুনতে পাবে তুমি সেই রোমাঞ্চকর, সুগম্ভীর মহাসঙ্গীত, পৃথিবীতে মনুষ্য সৃষ্টিরও লক্ষ লক্ষ বৎসর আগে থেকে মহাসাগর প্রত্যহই যা গেয়ে আসছে বিপুলোৎসাহে।
নিশ্চিন্ত আলস্যের ভিতর দিয়ে শুয়ে, গড়িয়ে স্বপন দেখে পরম সুখে বেশ কেটে যাচ্ছিল দিনের পর দিন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সাগর-সৈকতে পদচারণ, বালুকাশয্যা থেকে সাগরতরঙ্গের দেওয়া বিচিত্র উপহার সংগ্রহ, দুপুরে সমুদ্রের নীল জলে ডুবে এবং ভেসে এবং সাঁতার কেটে অবগাহন, বৈকালে নুলিয়াদের ডিঙায় চেপে সাগর ভ্রমণ এবং রাত্রে সমুদ্রের নৃত্যশীল বীচিমালার উপরে হিরার গুঁড়ো ছড়িয়ে জ্যোত্সার লীলা দর্শন। কলকাতার কথা তাদের মনেও পড়ত না। কিন্তু আচম্বিতে কলকাতা একদিন জানিয়ে দিলে নিজের অস্তিত্ব। নগর ত্যাগ করে জনতার নাগালের বাইরে পলায়ন করলেও নাগরিকদের মুক্তি দেয় না নগরের নাগপাশ।
এল একখানা টেলিগ্রাম, বহন করে এই সমাচার
জয়ন্ত, অবিলম্বে কলকাতায় চলে এসো–ভয়াবহ মামলা–কোনও গতিকে বেঁচে গিয়েছি–ঘটনার পর ঘটনা–তোমরা নেই বলে অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় পড়ে আছি– সুন্দর।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জয়ন্ত কেবল বললে, হুঁ।
মানিক বললে, আমরা ছাড়তে চাইলেও কমলি আমাদের ছাড়বে না।
নিশ্চয়ই খুব জটিল, রহস্যময় মামলা।
বলা বাহুল্য। কিন্তু আমাদের পক্ষে এখন কিংকর্তব্য?
বাঁধো তল্পিতল্পা, কেনো কলকাতার টিকিট।
.
পুরী থেকেই জয়ন্ত টেলিগ্রামে সুন্দরবাবুকে জানিয়ে দিয়েছিল কবে, কখন তারা কলকাতায় এসে পৌঁছোবে।
কাপড়চোপড় বদলে, হাত-মুখ ধুয়ে তারা সবে চা পান করতে বসেছে, এমন সময়ে সুন্দরবাবুর আবির্ভাব। রীতিমতো হন্তদন্ত মূর্তি।
জয়ন্ত বললে, আসতে আজ্ঞা হোক। চা-টা আনতে বলি?
আরে, থ্রো করো তোমার চা-টায়ের কথা। আগে মামলাটার কথা শোনো।
বসুন।
মানিক বুঝলে, সুন্দরবাবু যখন চায়ের সঙ্গে টাএর লোভ সংবরণ করলেন, ব্যাপার তখন নিশ্চয়ই গুরুতর।
সুন্দরবাবু, উপবেশন করে খবরের কাগজ থেকে কেটে নেওয়া একটা অংশ জয়ন্তের হাতে দিয়ে বললেন, প্রথমে এইটে পড়ে দেখো। ঘটনাটা ঘটেছে তেসরা মে তারিখে।
জয়ন্ত পাঠ করলেঃ
কলকাতায় অলৌকিক অতিকায় দস্যু
গতকল্য রাত্রি সাড়ে দশটার সময়ে চিনুভাই চুনিলাল ও হীরালাল গোবিন্দলাল নামে দুইজন রত্নব্যবসায়ী নিজেদের দোকান বন্ধ করিয়া বাসার দিকে ফিরিয়া আসিতেছিলেন। তাঁহাদের সঙ্গে ছিল বহুমূল্য রত্নে পরিপূর্ণ দুইটি ছোট ব্যাগ। বড়বাজারে বাসার সামনে আসিয়া তাহারা যখন রিকশা হইতে নামিবার উপক্রম করিতেছেন, তখন পিছন হইতে হঠাৎ একখানা কালো রঙের প্রাইভেট মোটরগাড়ি আসিয়া রিকশার উপর ধাক্কা মারে, রিকশাখানি তৎক্ষণাৎ উলটাইয়া যায় এবং আরোহী দুই জনও পথের উপরে পড়িয়া গিয়া আহত হন।
ঠিক সেই সময়ে মোটরের ভিতর হইতে বাহিরে আসিয়া দাঁড়ায় অদ্ভুত এক মূর্তি। তাহার সঠিক বর্ণনা কেহই দিতে পারিতেছে না বটে, কিন্তু মোটামুটি এইটুকু জানা গিয়াছে যে, মূর্তিটার মাথার উচ্চতা অন্তত সাত ফুটের কম হইবে না। তাহার মুখ মানুষের মতো, কিন্তু তাহার চক্ষু দিয়া নির্গত হইতেছিল বিদ্যুতের মতো তীব্র এমন দুইটি অগ্নিশিখা, যা পথের অন্ধকারকে আলোকিত করিয়া তুলিয়াছিল মোটরের হেডলাইটের মতো। তাহার দেহও মানুষের মত, কিন্তু সেই দেহের উপরে ছিল লোহার বর্ম বা ওইরকম কঠিন কোনও কিছু।
