সুন্দরবাবু ফিক করে হেসে ফেলে বললেন, ভায়া হে, তোমার ওপরে টেক্কা মারা অসম্ভব দেখছি! হ্যাঁ, ঠিক তাই! সিন্দুকের হাতলে ছিল আঙুলের ছাপ। পুলিশের ফাইলে সেই আঙুলের ছাপের জোড়া পাওয়া গেছে। সে ছাপ হচ্ছে নফরচন্দ্র প্রামাণিকের।
ওই মহাপুরুষের পরিচয় কী?
অতিশয় চিত্তোত্তেজক। পুলিশের কাছে রক্ষিত অপরাধীদের ইতিহাসে দেখি, সাত বৎসর আগে নফরচন্দ্র একটা খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু উপযোগী প্রমাণ অভাবে খালাস পায়। তার পর-বৎসরেই দু-দুটো খুন আর অর্থলুণ্ঠন করে সে আবার অভিযুক্ত হয় রাহাজানির মামলায়। বিচারে তার প্রতি পনেরো বৎসর কারাবাসের হুকুম হয়। কিন্তু পাঁচ বৎসর আগে সে জেল ভেঙে পালিয়ে যায়। সেই থেকেই নফরচন্দ্র ফেরার। যে তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরে দিতে পারবে তাকে পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।
আপনি তাকে দেখেছেন?
না, তার কোনও মামলাই আমার হাতে আসেনি।
নফরচন্দ্র যখন দাগী আসামি, পুলিশের কাছে নিশ্চয়ই তার ফটো আছে?
আছে বইকী! এই নাও।
শ্মশ্রুগুম্ফহীন এক সাধারণ চেহারার লোক সুশ্রী বা কুশ্রী কিছুই বলা যায় না। কেবল জোড়া ভুরুর তলায় দুই চক্ষু দিয়ে ফুটে বেরুচ্ছে যেন ক্রুরতার আভাস। বয়স হবে চল্লিশ বিয়াল্লিশ।
সুন্দরবাবু অভিযোগপূর্ণ স্বরে বললেন, আত্মহত্যার মামলা হয়ে দাঁড়াল নরহত্যার মামলা–তার সঙ্গে এল আবার তিন-তিনটে হত্যাকাণ্ডের নায়ক ফেরারি নফরচন্দ্রের মামলা! বাপ রে, এখন এই ডবল মামলার হামলা একলা সামলাই কেমন করে? নফরের মতো ধড়িবাজের পাত্তা পাওয়া কি সোজা কথা? পুলিশের কেউ যা পারেনি, আমি তা পারব কেন?
তীক্ষ্ণনেত্রে নফরচন্দ্রের ফটোর দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু আপনার বকবকানি থামান। এখানে স্বচ্ছ কাগজ আছে?
স্বচ্ছ কাগজ?
হ্যাঁ, ইংরেজিতে যাকে বলে ট্রেসিং পেপার।
মরছি নিজের জ্বালায়, এখন তোমার ওইসব ছাঁকা বাংলা বুলি ভালো লাগছে না। কেন সোজাসুজি বলতে পারো না কি–ট্রেসিং পেপার চাই? তা থাকবে না কেন? কিন্তু ও জিনিস নিয়ে তোমার আবার কী হবে?
একটু অপেক্ষা করুন, দেখতে পাবেন।
জয়ন্তের অল্পস্বল্প ছবি আঁকার হাত ছিল। সুন্দরবাবুর দিকে পিছন ফিরে বসে ফাউন্টেন পেন ও ট্রেসিং পেপারের সাহায্যে সে ফটো থেকে নফরচন্দ্রের একখানা হুবহু প্রতিলিপি তুলে নিলে। তারপর সেই নকল করা মুখের ওপরে যথাস্থানে এঁকে ফেললে লম্বা চুল, কালো চশমা, ঘন গোঁফদাড়ি।
সুন্দরবাবু বিরক্তভাবে বললেন, আরে গেল, ও আবার কী ছেলেমানুষি হচ্ছে শুনি?
সুন্দরবাবু এখন দেখুন দেখি, এই লোকটিকে কি চেনেন বলে মনে হচ্ছে? জয়ন্ত প্রশ্ন করলে কৌতুকপূর্ণ কণ্ঠে।
সুন্দরবাবু প্রথমে নিতান্ত অবজ্ঞাভরেই ছবিখানার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। তারপর দেখতে দেখতে যতদূর সম্ভব বিস্ফারিত হয়ে উঠল তার দুই চক্ষু। তিনি চমৎকৃত কণ্ঠে বলে উঠলেন, আরে আরে, এ যে রবীন্দ্রবাবুর বন্ধু সত্যানন্দ বসুর মুখ।
.
জয়ন্ত রুপোর শামুকানি থেকে একটিপ নস্য নিয়ে হাস্যমুখে বললে, ছবিতে আঁকা মুখে লম্বা চুল, কালো চশমা আর গোঁফদাড়ি বসিয়ে দিতেই নফরচন্দ্রের মূর্তির ভিতর থেকে আত্মপ্রকাশ করছে সত্যানন্দ স্বয়ং! এমন যে হবে, আমি তা আগেই অনুমান করেছিলুম। আমি নফরকে চিনতুম না, তার জীবনীও জানতুম না, কিন্তু এই মামলায় সমস্ত দেখে-শুনে আমি সবচেয়ে বেশি সন্দেহ করেছিলুম সত্যানন্দকেই। চেহারার রকমফের করে নাম ভাড়িয়ে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে নফরচন্দ্র বহাল তবিয়তে হতভাগ্য রবীন্দ্রবাবুর সঙ্গে মিতালি জমিয়ে ফেলেছিল–প্রথম থেকেই তার কুদৃষ্টি ছিল সেই মুক্তা তিনটির উপরে। সকলের অগোচরে শুড়িপথ দিয়ে ঢুকে মেথরের সেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে সে পাপকার্য সেরে আবার অদৃশ্য হয়েছিল। কিন্তু এইবারে তাকে মুখোশ খুলতে হবেই। নফরচন্দ্র এখনও আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে কারণ এখনও সে সন্দেহ করতে পারেনি যে, আমরা তাকে সন্দেহ করেছি। সুতরাং উঠুন। জাগুন। ছুটুন সবাই নফরচন্দ্র ওরফে সত্যানন্দের আস্তানার দিকে।
হুম! তথাস্তু, তথাস্তু, তথাস্তু!
.
নফর ওরফে সত্যানন্দের বাড়ি।
চারিদিকে পুলিশ পাহারা বসিয়ে সদরে কড়া নাড়তে-নাড়তে সুন্দরবাবু ডাকলেন, সত্যানন্দবাবু, সত্যানন্দবাবু!
বারান্দা থেকে উঁকি মারলে সত্যানন্দের মুখ। পুলিশ দেখে তার ভাবান্তর হল না। সহজ সুরেই শুধোলে, অধীনের গোলামখানায় আপনারা যে?
মামলা সংক্রান্ত একটা জরুরি কথা জানতে এসেছি।
বেশ করেছেন! বেয়ারা গিয়ে দরজা খুলে দিচ্ছে। সোজা ওপরে চলে আসুন।
দোতলায় ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে সুন্দরবাবু, তারপর জয়ন্ত, তারপর আরও দুজন পুলিশ কর্মচারী।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সত্যানন্দ হাসিমুখে বললে, অনুগ্রহ করে সকলে আসন গ্রহণ করুন। সুন্দরবাবু মাথা নেড়ে বললেন, বসবার সময় নেই।
কিন্তু আপনারা কী জরুরি কথা জানতে চান? যা বলবার সব তো আমি বলেছি।
কিন্তু একটা কথা বলেননি।
কী?
আপনি নফরচন্দ্র নামটা ত্যাগ করলেন কেন?
পরমুহূর্তে সুন্দরবাবুর বক্ষের ওপরে নিক্ষিপ্ত হল যেন দুর্যোধনের মহাগদা! আচম্বিতে নফরচন্দ্র অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে সুন্দরবাবুর বুকের মাঝখানে করলে পদাঘাত এবং বপুম্মান সুন্দরবাবুর দেহ ঠিকরে গিয়ে পড়ল হুড়মুড় করে একেবারে জয়ন্তের ওপরে এবং সঙ্গে-সঙ্গে ঘর কাঁপয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জন ও গুরুভার দেহপতনের শব্দ।
