সুন্দরবাবু বললেন, ঠিক কথা। পায়রার ডিমের মতো ডাগর-ডাগর মুক্তো যদি রূপকথার অশ্বডিম্ব না হয়, তাহলে সেগুলো অন্য কোথাও লুকোনো আছে, খুঁজে দেখতে হবে।
সুন্দরবাবুর গা টিপে দিয়ে জয়ন্ত বাইরে এসে দাঁড়াল। তার পিছু পিছু গিয়ে সুন্দরবাবু বললেন, আবার গা টেপাটেপি কেন? তোমার আবার কী গুপ্তকথা?
সিন্দুকের হাতলে কারুর আঙুলের ছাপ পাওয়া যায় কি না পরীক্ষা করে দেখুন।
মানে?
পরে বুঝবেন।
.
দিন দুই পরে দূরভাষের মধ্যস্থতায় শ্রুতিগোচর হল থানায় বিরাজমান সুন্দরবাবুর উত্তেজিত কণ্ঠস্বর : হ্যালো! জয়ন্ত শোনো। তুমি যা বলেছ তাই!
আমি কী বলেছি?
রবীন্দ্রনারায়ণ রায় আত্মহত্যা করেনি।
নবীন সহকারীর ওপর নির্ভর না করে একটু মাথা ঘামালে আপনিও এটা বুঝতে পারতেন।
আমি কিন্তু তোমার চেয়েও বড় একটা আবিষ্কার করেছি।
আপনাকে অভিনন্দন দিচ্ছি।
তারপর থেকে আমার অবস্থা হয়েছে কীরকম জানো? যাকে বলে একেবারে সসেমিরা!
ভাবনার কথা!
সব শুনলে তোমারও আক্কেলগুড়ুম হয়ে যাবে।
ভয়ের কথা!
ফোন ছেড়ে সবেগে থানায় ছুটে এসো।
যথা আজ্ঞা।
থানায় গিয়ে জয়ন্ত দেখলে, সুন্দরবাবু তখনও উত্তেজিতভাবে ঘরের ভিতর পদচালনা করছেন।
ভো সুন্দরবাবু, অতিথি হাজির। আপনার সন্দেহ পরিবেশন করুন।
তিষ্ঠ ক্ষণকাল। রবীন্দ্রবাবু যে আত্মহত্যা করেননি, সেটা তুমি কেমন করে ধরতে পারলে আগে সেই কথাই বলো।
দেখলুম মৃতের ডান হাতে রয়েছে হাতঘড়ি। কোনও-কোনও খেয়ালি ব্যক্তি ডানহাতেও ঘড়ি ধারণ করে বটে, কিন্তু সেটা হচ্ছে ব্যতিক্রম। সাধারণত যারা ন্যাটা, অর্থাৎ ডানহাতের কাজ সারে বাম হাতে, তারাই হাতঘড়ি ব্যবহার করে ডানহাতে। অতএব ধরে নিলুম রবীন্দ্রবাবু ন্যাটা। সে ক্ষেত্রে বাম হাতে রিভলভার নিয়েই তাঁর আত্মহত্যা করবার কথা। কিন্তু রিভলভার ছিল তার ডান হাতে। তাই দেখেই প্রথমে আমার সন্দেহ জাগ্রত হয়। কিন্তু তা হচ্ছে সামান্য সন্দেহ, বিশেষ উল্লেখযোগ্য নয়।
বেশ তারপর?
তারপর দেখলুম মৃতের সামনে দাবার ছক। যে আত্মহত্যার জন্যে প্রস্তুত, তার মনের অবস্থা হয় ভয়ানক অস্বাভাবিক, তার দাবা খেলবার বা নতুন চাল আবিষ্কার করবার শখ কিছুতেই হতে পারে না। রবীন্দ্রবাবু নিশ্চয় সেদিন সহজ আর স্বাভাবিক মন নিয়েই আর কারুর সঙ্গে দাবা খেলায় নিযুক্ত হয়েছিলেন, আত্মহত্যার কোনও ইচ্ছাই তার ছিল না। সুতরাং
সুতরাং তোমার সন্দেহ দৃঢ়তর হল, কেমন এই তো!
হ্যাঁ। তারপর রিভলভার আর বুলেট দেখেই নিঃসন্দেহে আমি বুঝতে পারলুম যে, এটা হচ্ছে আত্মহত্যার নয়, নরহত্যার মামলা। রবীন্দ্রবাবুর হাতের রিভলভারটা ছিল ২২ ক্যালিবারের ছোট রিভলভার, তার ভিতর থেকে ৩৮-ক্যালিবারের বুলেট নির্গত হওয়া অসম্ভব। অর্থাৎ যে বুলেটটা হয়েছে রবীন্দ্রবাবুর মৃত্যুর কারণ, সেটা বেরিয়েছে কোনও ৩৮-ক্যালিবারের রিভলভার থেকে।
সুন্দরবাবু বললেন, তাহলে হত্যার কারণ চুরি?
সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
তবে সিন্দুকের ভিতর থেকে টাকা আর মোহরগুলো চুরি যায়নি কেন?
এই খুনে-চোর হচ্ছে অতিশয় চতুর। সে পুলিশকে ভুল পথে চালাতে চায়। সে লাভ করতে চায় তিন-তিনটি মহামূল্যবান অতুলনীয় মুক্তা, তার কাছে কয়েক শত টাকা তুচ্ছ। সে দেখাতে চায় চুরি বা হত্যা করবার জন্য কেউ ঘটনাস্থলে আসেনি। তাই রবীন্দ্রবাবুর হাতে তার নিজের রিভলভার গুঁজে দিয়ে আর টাকাগুলো ফেলে রেখে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি ভেবে দেখতে পারেনি যে, ন্যাটা রবীন্দ্রবাবুর ডান হাতে রিভলভার থাকতে পারে না–বিশেষত ২২ ক্যালিবারের রিভলভার। তার আরও একটা মস্ত ভ্রম হয়েছে। দাবার ছক আর খুঁটি সে তুলে। রেখে যায়নি। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের মধ্যেই এমনি সব ছোটখাটো ত্রুটি থেকে যায় বলেই হত্যাকারী শেষ পর্যন্ত আত্মরক্ষা করতে পারে না।
জয়ন্ত, অনেক কথাই তো তুমি ভেবে দেখেছ। কিন্তু তুমি কি বলতে পারো, হত্যাকারী কে?
বাড়ির লোকদের কথা মানলে বলতে হয়, বাহির থেকে কোনও ব্যক্তিই সেদিন বাড়ির ভিতরে আসেনি। অথচ সেদিন রবীন্দ্রবাবুর পরিচিত কোনও লোক তার সঙ্গে দাবা খেলেছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এখন আমাদের খুঁজে দেখতে হবে, সেই খেলোয়াড় ব্যক্তি কে?
আমি জানি সে কে!
জয়ন্ত সবিস্ময়ে বললে, আপনি জানেন!
নিশ্চয়। তোমার আগে আমিই তাকে আবিষ্কার করেছি।
বাহাদুর! কিন্তু কে সে?
বাড়ির কেউ নয়।
দীনেন্দ্র?
না।
সত্যানন্দ!
সেও নয়।
তবে?
তার নাম নফরচন্দ্র প্রামাণিক।
স্তব্ধভাবে স্থির হয়ে বসে রইল জয়ন্ত নির্বাতনিষ্কম্প দীপশিখার মতো। কিন্তু মস্তিষ্ক চালনা করতে লাগল তুরন্ত গতিতে, তারপর সে ধীরে-ধীরে বললে, বুঝেছি। আপনার এই আবিষ্কারের মূলে আছে আমারই অভিভাবন!
অভিভাবন! সে আবার কী চীজ!
সাজেসান-এর বাংলা পরিভাষা হচ্ছে অভিভাবন।
মাথায় থাক আপনার বাংলা পরিভাষা, এর চেয়ে ইংরেজিই ভালো। কিন্তু আমার আবিষ্কারের সঙ্গে তোমার সাজেসান-এর সম্পর্ক?
আমি কি আপনার কাছে প্রস্তাব করিনি যে রবীন্দ্রবাবুর লোহার সিন্দুকের হাতলটা আঙুলের ছাপের জন্যে পরীক্ষা করা হোক?
তা করেছিলে।
তা করা হয়েছে কি?
হুঁ।
আর তারই ফলে বোধকরি তথাকথিত নফরচন্দ্র প্রামাণিক নামধেয় ব্যক্তি আবিষ্কৃত হয়েছে?
