বুঝিয়ে বলছি। আমার প্রপিতামহ সুরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের জন্যেই আমাদের বংশের সমৃদ্ধি আরম্ভ হয়। সিপাহী বিপ্লবের সময়ে তিনি ইংরেজ ফৌজে রসদ বিভাগের পদস্থ কর্মচারী হয়ে পশ্চিম ভারতে গিয়েছিলেন। সেই দেশব্যাপী অশান্তি আর বিশৃঙ্খলার যুগে কী উপায়ে জানি না, তিনি প্রচুর ধনদৌলতের মালিক হয়ে দেশে ফিরে আসেন। তাঁর সংগ্রহের মধ্যে ছিল। তিনটি অপূর্ব ও অমূল্য মুক্তো–শুনেছি তিনি তা পেয়েছিলেন কোনও ভাগ্যহীন নবাবের কাছ থেকে। মুক্তো তিনটি আমিও দেখেছি। দুটির আকার পায়রার ডিমের মতো, একটি আরও বড়। তেমন বড় মুক্তো আমি আগে কখনও দেখিনি, আজকের বাজারে তাদের দাম অন্তত দুই-আড়াই লক্ষ টাকাও হতে পারে। এই মুক্তা তিনটি আমার পিতামহের অধিকারে আসে উত্তরাধিকার সূত্রে। তারপর আমার জ্যাঠামশাই ও আমার পিতা দুজনেরই দাবি ছিল তাদের উপরে। কিন্তু জ্যাঠামশাই আমার বাবার দাবি অগ্রাহ্য করে বলেন, তাঁর বাবা ওই মুক্তা তিনটি কেবল তাঁকেই দিয়ে গিয়েছেন। এই নিয়েই প্রথমে মনোমালিন্য, তারপর মুখ দেখাদেখি বন্ধ।
জয়ন্ত ভাবতে-ভাবতে বললে, বটে, এমন ব্যাপার। সেই মুক্তা তিনটি এখন কোথায় আছে?
শুনেছি জ্যাঠামশাইয়ের শোবার ঘরে লোহার সিন্দুকে। কিন্তু সে ঘর তো এখন পুলিশের জিম্মায়।
সুন্দরবাবু করলেন একটি নিষ্ঠুর প্রশ্ন, তাহলে রবীন্দ্রবাবুর মৃত্যুর ফলে আপনিই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন?
দীনেন্দ্র বিরক্ত মুখে বললে, লাভ-লোকসানের হিসাব এখনও আমি খতিয়ে দেখিনি মশাই!
কিন্তু পুলিশ তা দেখতে বাধ্য।
দেখুন।
জয়ন্ত এইবারে সত্যানন্দের মুখের পানে তাকিয়ে বললে, আপনার চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে, রবীন্দ্রবাবুর মৃত্যুর জন্যে আপনি বড়ই কাতর হয়ে পড়েছেন।
সত্যানন্দ করুণস্বরে বললেন, কাতর হব না? তিনি আর আমি ছিলুম হরিহর আত্মার মতো, বহু সুখ-দুঃখের দিন আমাদের একসঙ্গে কেটে গিয়েছে।
তা হলে আপনারা ছিলেন পুরাতন বন্ধু?
না, ঠিক তা বলতে পারি না। তার সঙ্গে আমার আলাপ হয় বছর চারেক আগেই। কিন্তু এর মধ্যেই আমাদের ঘনিষ্ঠতা নিবিড় হয়ে উঠেছিল পুরাতন বন্ধুদের মতোই।
রবীন্দ্রবাবু আপনার সঙ্গে দাবা খেলতে ভালোবাসতেন?
হ্যাঁ, আমি এলেই তিনি পাততেন দাবার ছক।
রবীন্দ্রবাবুর মৃত্যুর দিনেও তাঁর সঙ্গে আপনি দাবা খেলেছিলেন?
আজ্ঞে না, সেদিন আমি নিজের বাড়ির বাইরে পা বাড়াতেই পারিনি।
কেন?
অসুস্থতার জন্যে। উদরাময়।
কিন্তু সেদিনও সন্ধ্যার সময়ে বা পরে রবীন্দ্রবাবু দাবা খেলেছিলেন।
অত্যন্ত বিস্মিতের মতো সত্যানন্দ নিজের দীর্ঘ দাড়ির ভিতরে অঙ্গুলি চালনা করতে করতে বললে, কেমন করে জানলেন?
তার মৃতদেহের সামনে পাতা ছিল দাবার ছক আর সেই ছকের ওপরে সাজানো ছিল গোটাকয়েক ঘুঁটি।
ও, তাই বলুন। তা হতে পারে! যারা দাবা খেলতে অভ্যস্ত, তারা মাঝে-মাঝে নতুন চালের কৌশল আবিষ্কার করবার জন্যে একা একাই ছকের খুঁটি সাজিয়ে বসে।
ঠিক। সেটা আমিও জানি। আমার আর কিছু জিজ্ঞাসা নেই।
.
সুন্দরবাবু সদলবলে প্রথমে বাড়ির একতলার সর্বত্র ঘুরে-ঘুরে দেখলেন।
তারপর দ্বিতল। চারখানা বাস করবার ঘর, তারপর পায়খানা ও গোসলখানা। বাইরের দিকে একফালি বারান্দা থেকে লোহার ঘোরানো সিঁড়ি নিচের একটা শুড়িগলির ভিতরে নেমে গিয়েছে।
জয়ন্ত শুধাল, এই সিঁড়িটা বোধহয় মেথরের ব্যবহারের জন্যে?
দীনেন্দ্র বললে, হ্যাঁ।
নিচের শুঁড়িগলিটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে?
বাড়ির বাইরেকার রাস্তায়।
কোনও লোক যদি সদর দরজার বদলে ওই শুড়িগলি দিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠে, তাহলে বাড়ির লোক তাকে দেখতে পাবে না–তাই নয় কি?
হ্যাঁ।
তারপর ত্রিতলে রবীন্দ্রবাবুর শয়নকক্ষ। তালাবন্ধ দরজার চাবি ছিল পুলিশের কাছে। দরজা খুলে সকলে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে।
মাঝারি আকারের ঘর। একদিকে খাট, একদিকে ড্রেসিংটেবিল, একদিকে একটা প্রকাণ্ড আলমারি এবং একদিকে একটা ভারী সেকেলে ডালা-দেওয়া লোহার সিন্দুক। খানদুই চেয়ার। কার্পেটমোড়া মেঝেয় ছোট বিছানা পাতা। গুটি দুই তাকিয়া।
মৃতদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মেঝের বিছানার একাংশে ও একটা তাকিয়ার ওপরে রয়েছে শুকনো রক্তের ছোপ। বিছানার মাঝখানে দাবার ছক, তার ওপরে ও আশেপাশে কতকগুলি খুঁটি।
সুন্দরবাবু বললেন, দীনেন্দ্রবাবু এইবারে আপনি সিন্দুক খুলে মুক্তো-টুক্তো কী আছে বার করুন। আমরা এখনও সিন্দুক পরীক্ষা করিনি। এই নিন রবীন্দ্রবাবুর চাবির গোছা, এটা লাশের পাশেই পাওয়া গিয়েছে।
জয়ন্ত বললে, সাবধানে দীনেন্দ্রবাবু, আপনি সিন্দুকের হাতলে হাত দেবেন না, চাবিটা আমাকে দিন, আমি সিন্দুক খুলছি।
সুন্দরবাবু কী প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু জয়ন্তের চোখের ইশারা দেখেই তার মুখ বন্ধ হয়ে গেল।
সিন্দুকের মধ্যে তথাকথিত একটিমাত্র মুক্তাও আবিষ্কৃত হল না। পরিবর্তে পাওয়া গেল একতাড়া দলিল-দস্তাবেজ, অন্যান্য কাগজপত্র, একশো টাকার বারোখানা নোট, কতকগুলো পুরাতন মোহর ও কিছু খুচরো টাকা প্রভৃতি।
দীনেন্দ্র বললে, কী আশ্চর্য মুক্তাগুলো কে নিলে?
সত্যানন্দ বললেন, কে আবার নেবে বাবা? তোমার জ্যাঠা ছেলের শোকে আত্মঘাতী হয়েছেন, বাইরের কেউ এখানে আসেনি। চোর এলে কি অতগুলো টাকা আর মোহর সিন্দুকের ভেতরেই ফেলে রেখে যেত?
