জয়ন্ত খুব মন দিয়ে রিভলভার ও বুলেটটা পরীক্ষা করলে। তারপর গম্ভীর স্বরে বললে, সুন্দরবাবু, মামলাটা মোটেই সহজ নয়।
সুন্দরবাবু ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন, তার মানে? তোমার কথায় সোজা বাঁকা হবে নাকি?
রিভলভারটার মালিক ছিলেন তো মৃত ব্যক্তিই?
তাই তো শুনেছি।
তাহলে এটা হচ্ছে বড়ই জটিল মামলা। এ সম্বন্ধে আপনি আরও যা জানেন, শুনতে পেলে খুশি হব।
অতঃপর জয়ন্তের অন্বেষণের ফলে নতুন যে রহস্যনাট্যের যবনিকা উঠে গেল, তা হচ্ছে সম্পূর্ণরূপেই অপ্রত্যাশিত। একটা একান্ত সাধারণ মামলা কেবল অসাধারণ হয়ে উঠল না, তার ওপরে আরোপিত হল আর-একটা এমন নতুন ও রোমাঞ্চকর মামলা, যা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর।
.
সুন্দরবাবু বললেন, ভাই জয়ন্ত, মামলাটা নিয়ে এখনও আমি মাথা ঘামাবার সময় পাইনি। আজ দুদিন সর্দিজ্বরে পড়ে আমি বিছানা নিয়েছিলুম। প্রাথমিক তদন্তের পর আমার সহকারী যে রিপোর্ট পেশ করেছেন, সেটুকু ছাড়া আর কিছুই জানি না। শোনো–
যিনি আত্মহত্যা করেছেন তার নাম রবীন্দ্রনারায়ণ রায়। বয়স পঞ্চান্ন। তিনি দক্ষিণ বাংলার এক জমিদার। দেশ ছেড়ে উত্তর কলকাতায় বাস করতেন। বিপত্নীক। তার একমাত্র সন্তান সত্যেন্দ্র গতমাসে কলেরা রোগে মারা গিয়েছেন। প্রকাশ, তারপর থেকেই রবীন্দ্রবাবু অত্যন্ত মনমরা হয়ে থাকতেন এবং তাঁর আত্মহত্যার আসল কারণও নাকি ওই পুত্রশোক।
রবীন্দ্রবাবুর এক সহোদর দেশেই থাকতেন, কিন্তু তিনিও এখন পরলোকে এবং তাঁরও একমাত্র পুত্র দীনেন্দ্রনারায়ণই এখন রবীন্দ্রবাবুর সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। যতদূর জানা যায়, রবীন্দ্রবাবুর সঙ্গে তাঁর ভ্রাতা বা ভ্রাতুস্পুত্রের বনিবনাও ছিল না, সম্পত্তি-সংক্রান্ত মতানৈক্যই নাকি এই মনোমালিন্যের কারণ।
রবীন্দ্রবাবুর বাড়ি ত্রিতল। একতলা ব্যবহার করে জমিদার সেরেস্তার কর্মচারীরা এবং পাঁচক, দারোয়ান, দাসদাসী ও অন্যান্য লোকজন। দোতলায় বৈঠকখানা এবং তাঁর মৃত পুত্রও সেখানে থাকতেন। ত্রিতলে রবীন্দ্রবাবুর শয়নগৃহ ছাড়া আর কোনও ঘর নেই।
পরশু গিয়েছে কালীপুজোর রাত্রি। শরীর সুস্থ ছিল না বলে রবীন্দ্রবাবু সেদিন সন্ধ্যার পরেই ত্রিতলে উঠে যান এবং পরদিন সকালেই ঘরের ভিতর পাওয়া যায় তার মৃতদেহ। ঘরের দরজা খোলাই ছিল–যদিও তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে, রবীন্দ্রবাবুর দরজা খুলে শয়ন করার অভ্যাস ছিল না।
বাড়ির লোকজনরা বলে, রবীন্দ্রবাবুর নিষেধ ছিল বলে সন্ধ্যার পর আর কোনও লোক সেদিন ত্রিতলের ঘরে যায়নি। অন্যান্য দিনেও সে ঘরে একজন ছাড়া আর কোনও বাইরের লোকের প্রবেশ করবার অধিকার ছিল না। সেই একজন হচ্ছেন সত্যানন্দ বসু, রবীন্দ্রবাবুর প্রধান ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি অন্য পাড়ার বাসিন্দা, প্রায়ই রবীন্দ্রবাবুর সঙ্গে আলাপ করতে আসতেন। রবীন্দ্রবাবুর দাবাখেলার শখ ছিল অত্যন্ত প্রবল, সত্যানন্দবাবুর আবির্ভাব হলেই দুজনে দাবার ছক পেতে বসে যেতেন। কিন্তু সবাই একবাক্যে বলেছে, ঘটনার দিন সত্যানন্দবাবু একবারও সেই বাড়িতে পদার্পণ করেননি।
নিজের হাতে রিভলভার ছুঁড়ে রবীন্দ্রনাথ আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু বাড়ির কেউ রিভলবারের শব্দ শুনতে পায়নি; অন্তত শুনতে পেলেও বুঝতে পারেনি, কারণ সেদিন ছিল কালীপুজো,–বোমার ও বাজির দুমদাম শব্দে সারা শহর হয়ে উঠেছিল মুখরিত।
রবীন্দ্রবাবুর ভাইপো দীনেন্দ্র খবর পেয়ে কলকাতায় এসে হাজির হয়েছেন। সত্যানন্দবাবুকেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। আজ তদন্তে গিয়ে প্রথমেই তাঁদের এজাহার গ্রহণ করব।
জয়ন্ত বললে, আমিও যদি সঙ্গে যাই, তাহলে আপনার কোন আপত্তি আছে?
মোটেই না, মোটেই না। মানিকও যেতে পারে। কিন্তু জয়ন্ত হঠাৎ তোমার এই আগ্রহের কারণ কী? কোনও সূত্র-টুত্র পেয়েছ নাকি?
যথাসময়েই জানতে পারবেন।
ওই রোগেই তো ঘোড়া মরেছে? এত ঢাকঢাক-গুড়গুড় কেন বাবা?
জয়ন্ত জবাব দিল না।
.
রবীন্দ্রনারায়ণের বাড়ি। সদর দরজায় পুলিশ পাহারা।
দোতলার বৈঠকখানায় উপবিষ্ট দুই ভদ্রলোক। একজন প্রৌঢ়, মাথায় কাঁচা-পাকা লম্বা চুল, শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডল, চোখে কালো চশমা, দোহারা চেহারা, পরণে পাঞ্জাবি ও পায়জামা। একান্ত বিষণ্ণ ভাবভঙ্গি।
আর একজন যুবক, বয়স বাইশের বেশি নয়, সুশ্রী, ফরসা, একহারা দেহ, জামাকাপড়ে বাবুয়ানার লক্ষণ। মুখ-চোখ ভাবহীন।
যুবকের দিকে তাকিয়ে সুন্দরবাবু শুধোলেন, আপনিই বোধহয় দীনেন্দ্রবাবু।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আর উনি?
সত্যানন্দবাবু–আমার জ্যাঠামশাইয়ের বিশেষ বন্ধু।
উত্তম। বাড়ির আর সবাইকে ডাকুন। আমি সকলের এজাহার নেব।
সকলেরই আবির্ভাব। একে একে প্রত্যেকেই এজাহার দিল। বিশেষ কোনও নতুন তথ্য প্রকাশ পেল না।
এইবারে জয়ন্ত জিজ্ঞাসা করলে, আচ্ছা দীনেন্দ্রবাবু, আপনার জ্যাঠা কি ন্যাটা ছিলেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ, তাঁর বাঁ-হাতই বেশি চলত।
তাই তিনি ডানহাতেই কবজি ঘড়ি ব্যবহার করতেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
রবীন্দ্রবাবুর সঙ্গে আপনাদের মনোমালিন্যের কারণ কি?
কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে দীনেন্দ্র বললে, মনোমালিন্যের উৎপত্তি হয় তিনটি মুক্তোর জন্যে।
তিনটি মুক্তো?
হ্যাঁ, তিনটি মহামূল্যবান মুক্তো।
ব্যাপারটা বুঝতে পারলুম না।
