হতভাগ্য ভোগেলের তখনি মৃত্যু হল। এবং সঙ্গে সঙ্গে দড়িবাঁধা রিভলভারটা ছিনিয়ে নিয়ে সেই মস্ত ভারী পাথরখানা ডানিউব নদীর ভিতরে গিয়ে পড়ল। কিন্তু রেলিংয়ের ভিতর দিয়ে গলাবার সময়ে ভারী পাথরের টানে রিভলভারটা খুব জোরে রেলিংয়ের উপরে গিয়ে পড়ল–লোহার গায়ে তাই চটা-ওঠা দাগ হয়ে গেল।
বড়সাহেব, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই নাটকের দুরাত্মা ওই পকেটমার বেচারা নয়, ভোগেল নিজেই! ডানিউব নদীতে ডুবুরি নামিয়ে খোঁজ করলেই দড়ির দুই প্রান্তে বাঁধা সেই রিভলভার ও পাথরখানা খুঁজে পাওয়া যাবে। ভোগেল ভেবেছিল, এত চালাকির পরেও তার মৃত্যুকে কেউ আত্মহত্যা বলে সন্দেহ করতে পারবে না, জীবনবিমা কোম্পানি তার পরিবারবর্গকে তিনলক্ষ টাকা দিতে বাধ্য হবে এবং নম্বরি নোট ভাঙাতে গিয়ে তাকে হত্যা করবার অপরাধে ধরা পড়বে ওই পকেটকাটা-ই!
কিন্তু নিজের স্ত্রী-পুত্রকন্যার সুখের জন্যে সে আর-এক অভাগাকে ফাঁসিকাঠে তুলে দিতে চেয়েছিল, আপন প্রাণ বিসর্জন দিয়েও, তাই সে ভগবানের দয়া পেলে না!
.
ঙ
প্রফেসরদের অনুমান সব দিক দিয়েই সত্যে পরিণত হল।
ডানিউব নদীর গর্ভ থেকে দড়িবাঁধা পাথর ও রিভলভার দুই-ই পাওয়া গেল।
জীবনবিমা কোম্পানি তিন লক্ষ টাকা লোকসানের দায় থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে, কৃতজ্ঞ হয়ে, অঙ্গীকৃত তিন হাজার টাকার চেয়েও বেশি পুরস্কার দিয়ে প্রফেসরদের খুশি করলে।
এই ব্যাপারটি কি উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য নয়? কখনও কোনও উপন্যাসের ডিটেকটিভও কি ওই দুই প্রফেসরের চেয়ে বেশি বুদ্ধির পরিচয় দিতে পেরেছে? কিন্তু তোমরা কেউ এই ব্যাপারটিকে অবিশ্বাস কোরো না, কারণ, এটি হচ্ছে অস্ট্রিয়া দেশের একটি বিখ্যাত সত্য ঘটনা!
ডবল মামলার হামলা
আজকের প্রাতরাশটা হয়েছিল পুরোদস্তুর পূর্ণভোজনের সামিল। চায়ের পেয়ালায় অন্তিম চুমুক দিয়ে এবং একটি আরামসূচক আঃ শব্দ উচ্চারণ করে ফেললেন ডিটেকটিভ ইনস্পেকটর সুন্দরবাবু।
দৈনিক প্রভাতী খানাপিনার অব্যবহিত পরেই উল্লেখযোগ্য সংবাদ পরিবেশনের ভার ছিল মানিকের উপরে। সে সামনের টেবিলের ওপর থেকে টেনে নিল খবরের কাগজখানা।
জয়ন্ত বার করলে তার রুপোর শামুকের নস্যদানি। সে একটিপ নস্য নাসিকার সাহায্যে আকর্ষণ করতেই সুন্দরবাবু বিকৃত মুখে বলে উঠলেন, হুম! তোমার ওই নোংরা সেকেলে নেশাটা তুমি কি কস্মিনকালেও ছাড়তে পারবে না হে!
জয়ন্ত বললে, কে বলে নস্য সেকেলে নেশা? সব ব্যাপারেই উঠতি-পড়তি আছে, নস্যেরও রেওয়াজ মাঝে কিছু কমে গিয়েছিল বটে, কিন্তু পাশ্চাত্য দেশে নস্যের চলন আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। আপনি কি জানেন, এক ইংল্যান্ডেই বৎসরে পঁয়ষট্টি লক্ষ টাকার নস্য তৈরি হয়!
সুন্দরবাবু বললেন, হুম বলো কী হে! খামোখা আট কোটি পনেরো লাখ টাকা নস্যাৎ। বড়ই, বড়ই বড়ই অন্যায়।
আজ্ঞে হ্যাঁ। নস্য নোংরা নয় মশাই, নস্য হচ্ছে রাজকীয় নেশা, তার আভিজাত্য অতুলনীয়। নস্যের উৎপত্তি আমেরিকায়, পঞ্চদশ শতাব্দীতে দ্বিতীয়বার সেখানে গিয়ে কলম্বাস তার ব্যবহার দেখে এসেছিলেন। ষোলো শতাব্দীতে নস্যের আমদানি হয় ইউরোপে। তারপর সেখানকার বড় বড় রাজা-রানি, সেনাপতি, আমীর-ওমরাহ, রাজনৈতিক, কবি, শিল্পী, অভিনেতা–এমনকী সাধু-সন্ন্যাসী পর্যন্ত নস্যের সেবাইত হয়ে পড়েন। আমি তো তুচ্ছাদপি তুচ্ছ। দিগ্বিজয়ী নেপোলিয়নের মতন ব্যক্তিও ছিলেন নস্যগতপ্রাণ। তার সোনার নস্যদানি ছিল অসংখ্য, সেগুলিরও মোট দাম হবে লক্ষাধিক টাকা। নস্যের এত কদর কেন শুনবেন?
সুন্দরবাবু গাত্রোত্থান করে বললেন, না ভাই, এখন আমার নস্যকাহিনি শোনবার মতো ফুরসত নেই।
কেন ত্বরা কীসের?
তদন্ত।
কীসের তদন্ত?
আত্মহত্যার। এক ভদ্রলোক পুত্রশোকে আত্মহত্যা করেছেন। বিশেষ হন্তদন্ত হতে হবে না, কারণ জোর তদন্ত নয়, একান্ত সহজ মামলা। তবু একবার যেতে হবে।
আপনার হাতে ওই খামখানা কিসের?
এর মধ্যে ঘটনাস্থলের আর লাশের খানকয় ফটো আছে।
একবার দেখি না।
ফটোগুলি নিয়ে জয়ন্ত খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে যেন নিজের মনেই বললে, মৃতদেহের ডানহাতে রয়েছে একটা রিভলভার। ওইটেই বোধহয় আত্মহত্যার অস্ত্র। ডানহাতের মনিবন্ধে দেখা যাচ্ছে একটা হাতঘড়িও।
সুন্দরবাবু বললেন, কোনও-কোনও খেয়ালি লোকের ডানহাতেই থাকে হাতঘড়ি।
তা থাকে বটে। কিন্তু মৃত ব্যক্তিকে একটু বেশিরকম খেয়ালি বলেই মনে হচ্ছে!
এ কথা বলছ কেন?
মৃতদেহের সামনে রয়েছে দাবা-বোড়ের ছক। কয়েকটা খুঁটি এখনও ছকের ওপরে সাজানো আছে। তাহলে কি হত্যার আগে ভদ্রলোক দু-এক চাল দাবা খেলে নিয়ে শখ মিটিয়েছিলেন?
সুন্দরবাবু বললেন, তোমার প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারব না। কারণ মামলাটার প্রাথমিক তদন্তে গিয়েছিলেন আমার এক সহকারী। তবে ভদ্রলোক যে রিভলবারের গুলিতে মারা পড়েছেন তাতে আর সন্দেহ নেই। গুলিটা তার বক্ষ ভেদ করে পিছন দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। সেই বুলেটটাও পাওয়া গিয়েছে।
রিভলভার আর বুলেটটা দেখবার জন্যে আগ্রহ হচ্ছে।
এখনি দেখাতে পারি, আমার গাড়ির ভিতরেই আছে।
সুন্দরবাবুর হুকুমে একজন পাহারাওয়ালা একটা ছোট ব্যাগ এনে দিয়ে গেল। তার মধ্যে ছিল ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া রিভলভার, বুলেট ও আরও কোনও কোনও জিনিস।
