প্রফেসর এক্স বললেন, বড়সাহেব, বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্বের সহকারী প্রফেসর ওয়াই সম্প্রতি আমার এখানে আছেন। এইবারে আপনি ফোনে তার সঙ্গে কথা বলুন। হ্যাঁ, আর-এক জিজ্ঞাসা। মৃত ব্যক্তির জামাটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে আছে? দেখুন তো, জামায় যেখানে গুলি ঢুকেছে, সেখানে পোড়া বারুদের দাগ আছে কিনা?
আছে।
হুঁ। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, মৃতের দেহের খুব কাছ থেকেই গুলি ছোঁড়া হয়েছে। আচ্ছা, প্রফেসর ওয়াই কথা বলছেন।
প্রফেসর ওয়াই ফোন ধরে বললেন, নমস্কার বড়সাহেব। ভোগেলের মৃতদেহ থেকে আপনি কী কী জিনিস পেয়েছেন, আর কী কী হারিয়েছে?
প্রাপ্ত জিনিসের ফর্দ দিয়ে বড়সাহেব বললেন, কিন্তু, ভোগেলের পকেটে তিনখানা গভর্নমেন্টের প্রমিসরি নোট ছিল তা পাওয়া যাচ্ছে না!
বড়সাহেব, আসল ব্যাপার আমরা কতকটা আন্দাজ করতে পারছি। কিন্তু সেটা এখন আপনাকে বলতে পারব না। ওই প্রমিসরি নোটগুলোর নম্বর আপনার কাছে আছে তো?
আছে।
সরকারি ব্যাঙ্কের নামে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিন, যে ব্যক্তি ওই নোটগুলো ফেরত দেবে, সে ওদের বর্তমান দামের চেয়ে বেশি মূল্য পাবে!
বড়সাহেব বললেন, প্রফেসর, আপনি কি খুনিকে এতই বোকা ভাবেন যে, সে এই বিজ্ঞাপনের উত্তরে ধরা দিয়ে আত্মহত্যা করবে?
একবার বিজ্ঞাপন দিয়েই দেখুন না! আমাদের বিশ্বাস, অপরাধী নিজে না এসে, অর্থলোভে অন্য-কোনও লোককে ব্যাঙ্কে পাঠিয়ে দেবে।
.
গ
পরদিনেই প্রফেসরদের ঘরে পুলিশের বড়সাহেব ফোনের ঘণ্টা বাজিয়ে বললেন, আশ্চর্য প্রফেসর, আশ্চর্য ব্যাপার! আপনারা যা বলেছিলেন ঠিক তাই হয়েছে। একজন লোক সেই নোটগুলো নিয়ে সত্যি-সত্যিই ব্যাঙ্কে এসেছিল। তাকে যে পাঠিয়েছিল, আমরা সে-ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করেছি।
সে কী বলে?
সে ভয়ে দিশেহারা হয়ে মহা কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে। বলে, ভোগেল নিমন্ত্রণ খেয়ে মাতাল হয়ে ফেরবার পথে এক জায়গায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সেইসময়ে সে তার পকেট কেটে, নোট নিয়ে পালিয়ে এসেছে।
আপনার কী মনে হয়?
প্রফেসর, আমার বিশ্বাস সে খুন করেনি। যারা মানুষ খুন করে তাদের চেহারা, ভাবভঙ্গি, কথাবার্তা অন্যরকম হয়। আপাতত তাকে আমি গারদে পুরে রেখেছি।
বেশ করেছেন। কারণ, সে যে ভোগেলের পকেট কেটেছে, তাতে তো আর সন্দেহ নেই! বড়সাহেব, এক কাজ করতে পারবেন?
কী কাজ?
সাঁকোর উপরে যেখানে ভোগেলের লাশ পাওয়া গেছে একবার সেইখানে যান। সাঁকোর ধারে যে লোহার রেলিং পাবেন, তার নীচে মনে রাখবেন ভিতরদিকে লোহার গায়ে কোনও চটাওঠা দাগ আছে কিনা দেখে আসুন।
প্রফেসরের অদ্ভুত অনুরোধ শুনে পুলিশসাহেব রীতিমতো অবাক হয়ে গেলেন। রেলিংয়ের গায়ে দাগই-বা থাকবে কেন, আর থাকলেও তার সঙ্গে এই খুনের সম্পর্ক কি?
খানিকক্ষণ পরে টেলিফোনে আবার পুলিশসাহেবের বিস্মিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল। হ্যালো প্রফেসর! আমি দেখতে গিয়েছিলুম! হ্যাঁ, নীচের রেলিংয়ের ভিতরদিকের রং এক জায়গায় চটে গেছে বটে! নতুন দাগ! যেন সেখানে কোনও একটা ভারী জিনিস গিয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেটা আপনি জানলেন কী করে? কেউ কি আপনাকে বলেছে?
সশব্দে হাস্য করে খুশি গলায় প্রফেসর বললেন, না! আমরা দুই প্রফেসর মাথা খাঁটিয়ে একটা সিদ্ধান্তে উপস্থিত হয়েছি। আমরা যে গল্পটি তৈরি করেছি সেটা সত্য কি না, আপনারা খোঁজ নিলেই বুঝতে পারবেন। এই হচ্ছে আমাদের গল্পঃ
.
ঘ
ভোগেলের ব্যবসায়ে আজকাল খুব লোকসান হচ্ছিল, আর দুদিন পরেই হয়তো তাকে দেউলে হতে হত এবং তার পরিবারবর্গ পথে বসত।
চোখের সামনে স্ত্রী-পুত্রকন্যার দারিদ্রের ছবি দেখতে-দেখতে ভোগেল প্রায় পাগলের মতন হয়ে উঠল। দিন-রাত ভাবতে লাগল, এই দুর্ভাগ্যের দায় থেকে কি উপায়ে সে পরিবারবর্গকে উদ্ধার করবে?
প্রথমে সে তিন লক্ষ টাকায় নিজের জীবনবিমা করলে। কিন্তু জীবনবিমার শর্তে লেখা রইল, সে আত্মহত্যা করলে জীবনবিমা কোম্পানি তার পরিবারবর্গকে টাকা দিতে বাধ্য থাকবে না। এ শর্ত না থাকলে ভোগেলের খুবই সুবিধা হত। কারণ সে স্থির করেছিল, এই উপায়েই পরিবারবর্গকে রক্ষা করবে।
প্রথমে সে একটি রিভলভারে ছয়টি গুলি পুরে একটি গুলি ছুড়লে। সেই রিভলভারের সঙ্গে আর-একটা গুলিভরা রিভলভার পকেটে পুরে ভোগেল নিমন্ত্রণ বাড়িতে গেল।
অনেক রাতে নিমন্ত্রণ খেয়ে সে পথে বেরুল। দেখলে একটা চোরের মতন লোক তার পিছু নিয়েছে। তখন তার মাথায় আর এক বুদ্ধি জুটল। সে মাতলামির অভিনয় করতে করতে এক জায়গায় বসে পড়ে ঘুমের ভান করলে! চোর তার পকেট কাটলে, কিন্তু সজ্ঞানেও সে বাধা দিলে না!
তারপর ভোগেল উঠে সাঁকোর উপরে গেল। প্রথম রিভলভারটা বার করে একটু তফাতে ফেলে দিলে! লোকে ভাববে, তাকে খুন করে পালাবার সময়ে খুনি ওই রিভলভারটা ফেলে গেছে। রিভলভারটা তার কাছে থাকলে পাছে কেউ ভাবে যে, ওর দ্বারা সে-ই আত্মহত্যা করেছে, তাই সেটাকে ফেলে দিলে খানিক তফাতে। দ্বিতীয় রিভলভারটা বার করে একগাছা শক্ত দড়ির একপ্রান্তে বেঁধে ফেললে। এবং দড়ির অন্য প্রান্তে বাঁধলে একটা খুব ভারী জিনিস– খুব সম্ভব মস্ত একখানা পাথর। তারপর পাথরখানা রেলিং গলিয়ে সাঁকোর বাইরে ঝুলিয়ে দিলে। তারপর নিজের বুকে রিভলভার রেখে গুলি ছুড়লে!
