খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, মৃত ব্যক্তির নাম হ্যাঁন্স ভোগেল, লোহার ব্যবসায়ে কোটিপতি। নিমন্ত্রণ খেয়ে শেষ-রাতে ফিরছিলেন, পথেই এই কাণ্ড। আরও প্রকাশ পেলে, তার পকেটে অনেক টাকা ছিল।
পুলিশ স্থির করলে, অর্থলোভে কেউ ভোগেলকে হত্যা করেছে। কিন্তু ওই পর্যন্ত। সে যে কে, তা জানা গেল না; কারণ, হত্যাকারী কোনও সূত্র রেখে যায়নি।
পুলিশ এ মামলা নিয়ে হয়তো বেশি মাথা ঘামাত না, কিন্তু ঘামাতে বাধ্য হল। এক জীবনবিমা কোম্পানির অধ্যক্ষ এসে পুলিশের বড়সাহেবকে জানালে, ভোগেল আমাদের কোম্পানিতে তিন লক্ষ টাকার জীবনবিমা করেছেন। দুষ্ট লোকেরা আমাদের বড় বড় মক্কেলকে যদি এইভাবে খুন করে পার পায়, তাহলে বেশি ক্ষতি হয় আমাদেরই। অতএব খুনিকে ধরা চাই, আর যে ধরতে পারবে তাকে আমরা তিন হাজার টাকা পুরস্কার দেব।
পুরস্কার বড় সামান্য নয়। হত্যাকারীকে ধরবার জন্যে পুলিশের বড়সাহেব উঠে পড়ে লাগলেন।
.
খ
বড়সাহেব নিজে হালে পানি না পেয়ে, বিখ্যাত রাসায়নিক প্রফেসর এক্স-এর খোঁজে বেরুলেন।
কিন্তু প্রফেসর এক্স তখন ভিয়েনা শহর থেকে তিনশো ষাট মাইল দূরে টাইরেল। গেছেন বায়ু পরিবর্তনে।
বড়সাহেব তাকে ফোন করলেন।
প্রফেসর আগাগোড়া সব শুনে বললেন, ডাক্তারের মানা আছে, আমার পক্ষে এখন ভিয়েনায় ফেরা অসম্ভব!
বড়সাহেব এত সহজে ছোড়নেওয়ালা নন। বললেন, আচ্ছা প্রফেসর, ফোনের সাহায্যেই তাহলে কাজ চালানো যাক। আপনি যা বলবেন, আমি তা পালন করব। বলুন আমায় কি করতে হবে? যদি কোনও দরকারি তথ্য আবিষ্কার করতে পারেন, তাহলে তিন হাজার টাকা লাভের সম্ভাবনা!
প্রফেসর বললেন, বহুত আচ্ছা, ইজিচেয়ারে এই আমি খুব আরাম করে গদিয়ান হয়ে বসলুম। আমার সামনে আছে তামাকের পাইপ, খবরের কাগজ, পেনসিল আর টেলিফোন। বেশ, তাহলে কাজ শুরু করা যাক! আচ্ছা, একজন কেমিস্টকে ডাকুন, আমার এইসব কেমিকেল দরকার। তিনি কেমিকেলের ফর্দ দিলেন।
ভিয়েনার পুলিশের অফিসে কেমিস্টকে আনবার জন্যে খবর পাঠানো হল।
টাইরেল থেকে ফোনে প্রফেসর বললেন, বড়সাহেব, ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে যে রিভলভারটা পেয়েছেন, তার নলচেটা (barrel) খুলে ফেলুন। নলচের দুটো মুখই ছিপি এঁটে এমনভাবে বন্ধ করে দিন, ভিতরে যাতে ধুলো-হাওয়া ঢুকতে না পারে।
বড়সাহেব খানিক পরে জবাব দিলেন, প্রফেসর, আপনার কথামতো কাজ করা হয়েছে। কেমিস্টও এসেছেন।
টেলিফোনে কেমিস্টকে ডেকে প্রফেসর বললেন, আমি যা বলি তাই করুন। রিভলভারের নলচের ছিপি দুটো খুলে ফেলুন। হয়েছে? আচ্ছা, খানিকটা distilled জল নলচের ভিতরে পুরে বেশ করে নাড়াচাড়া করুন। হয়েছে? আচ্ছা, এইবার নলচের জলটুকু filter করে নিন। আচ্ছা এইবারে নলচের জলে Sulphuric acid, alkaline sulphides আর Salts of iron-এর খোঁজ করুন। পরীক্ষার ফল কী হল? নলচের ভিতর থেকে মর্চে, কী green crystals of ferrous sulphate পাওয়া গেল?
না।
যে জলটা বেরুল তার রং কি হালকা হলদে নয়?
না মশাই!
সে কি, এ তো বড় অদ্ভুত কথা! আচ্ছা, ও-জলে কি Sulphuretted hydrogen এর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে?
না।
তাই তো, আমি যে কিছু বুঝতে পারছি না! বেশ, জলের সঙ্গে salts of lead মিশিয়ে দিন তো! কী হল? কালো তলানি দেখতে পাচ্ছেন?
উঁহু!
কী! বিশেষজ্ঞ প্রফেসরের কাছ থেকে খানিকক্ষণ কোনও জবাবই এল না। তারপর তার গলা আবার পাওয়া গেল? শুনুন! এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে নিশ্চয় কোনও গভীর রহস্য আছে! নলচের জলের ভিতরে Sulphuric acid পেলে প্রমাণিত হত যে, ওই রিভলভার চব্বিশ ঘণ্টার ভিতরে ছোঁড়া হয়েছে। কিন্তু তা যখন পাওয়া যায়নি তখন বুঝতে হবে যে, রিভলভারটা ছোঁড়া হয়েছে চব্বিশ ঘণ্টার আগেই। কিন্তু তা হতে পারে না, কারণ তাহলে অমন প্রকাশ্য সাঁকোর উপরে মৃতদেহটা ঘটনার আগের দিন সকালেই পাওয়া যেত! আচ্ছা, জলে বোধহয় oxide of iron আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, আছে!
বেশ। পুলিশের বড়সাহেবকে ফোন ধরতে বলুন।
বড়সাহেব ফোন ধরে বললেন, প্রফেসর, এসব কী শুনছি? ও রিভলভারটা পাওয়া গেছে লাশের ঠিক পাশেই, আর তা থেকে যে একটা গুলি ছোঁড়া হয়েছে, সে প্রমাণও রয়েছে!
–হতে পারে। কিন্তু ও রিভলভারটা মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর জন্যে দায়ী নয়। কারণ, ওটা ছোঁড়া হয়েছে ঘটনার দেড়দিন থেকে পাঁচদিন আগে!
তাহলে আমাদের ঠকাবার জন্যেই হত্যাকারী ওটা ওখানে ফেলে গেছে।
আচ্ছা, আরেকটু পরখ করা যাক। আচ্ছা মৃতব্যক্তির দেহের ভিতর থেকে গুলি পাওয়া গেছে?
হ্যাঁ, সেটা আমার টেবিলের উপরেই রয়েছে।
গুলিটা পরীক্ষা করেছেন?
এখনও করিনি।
বেশ, এখন পরীক্ষা করে দেখুন দেখি, গুলিটার মাপ কত?
খানিক পরেই বড়সাহেব অভিভূত কণ্ঠে বললেন, প্রফেসর, প্রফেসর! আপনি যা বলেছেন তাই! ও গুলিটা এ-রিভলভারের ব্যাসের চেয়ে বড়! ওটা অন্য কোনও রিভলভারের গুলি!
বড়সাহেব প্রায় হতভম্ব! চোর-ডাকাত-খুনে ধরা তার ব্যবসায়, ঘটনাস্থল তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন, সমস্ত প্রমাণ তারই হাতে রয়েছে এবং শত শত গোয়েন্দা তাকে সাহায্য করছে, অথচ একজন প্রফেসর সাড়ে তিনশো মাইল দূরে বসে, কোনও কিছু চোখে না দেখে এবং হাতে-নাতে পরীক্ষা না করে অনায়াসেই রহস্যটা ধরে ফেললেন! তার আত্মসম্মানে বোধহয় অত্যন্ত আঘাত লাগল।
