কিন্তু চোরাই মাল রাখলে কোথায়? অতরাত্রে মূর্তিগুলো নিয়ে নিশ্চয়ই সে বাড়ির বাইরে যেতে সাহস করেনি, কেউ না কেউ তাকে দেখে ফেলতে পারে। আর বাইরেই বা সে যাবে কোথায়, তার বাসা যখন এই বাড়িতেই? কিন্তু চোরাই মাল সে নিজের ঘরে রাখতেও ভরসা করবে না। পুলিশে খবর দিলে পুলিশ এসে তার ঘরখানা তল্লাশ করতে পারে। অতএব চোরাই মাল সে এমন কোনও জায়গায় লুকিয়ে রেখেছে, যা তার ঘরের বাইরে কিন্তু বাড়ির বাইরে নয়। কিন্তু সে জায়গাটা কোথায়? তার ঘরের পাশেই আছে বাগান আর পুকুর। বাগানের মাটি খুঁড়ে বা পুকুরের জলে ডুবিয়ে মূর্তিগুলো লুকিয়ে রাখা যেতে পারে।
শীতলবাবু বুদ্ধিমান, কিন্তু কাঁচা অপরাধী। ধরা পড়বার ভয়ে দুদিন যেতে না যেতেই স্থির করলে, কোন ওজরে ছুটি নিয়ে দেশে চলে যাবে। আমি তৎক্ষণাৎ আমার পথ দেখতে পেলুম। সে দেশে যাবে কাল সকালে। আর যাবার সময়ে বহুমূল্য মূর্তিগুলো নিশ্চয়ই এখানে। ফেলে রেখে যাবে না, আজ রাত্রে এখানে রাত্রিবাস করবার জন্যে আমি তপনের কাছ থেকে চাইলুম একখানা দক্ষিণ খোলা ঘর, কারণ এ বাড়ির দক্ষিণে যে বাগান আছে, সেটা আমার অজানা ছিল না।
আমি ঘুমোবার ভান করে তোমাদের সঙ্গেই শুয়েছিলুম। তারপর তোমাদের নাসাগর্জন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উঠে পড়ে দক্ষিণের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম। যা দেখবার আশা করেছিলুম, রাত পৌনে দুটোর সময়ে দেখতে পেলুম ঠিক সেই দৃশ্যই। সন্তর্পণে বাগানে এসে দাঁড়াল শীতলবাবু। তারপর পুকুর পাড়ে গেল। জলের ভিতর থেকে দড়ি ধরে টেনে তুললে পোঁটলার মতো কি একটা জিনিস।
তার পরের কথা আর বলবার দরকার নেই।
.
সাত
আমি বললুম, কিন্তু এখনও আমরা আসল কথা শুনতে পেলুম না।
জয়ন্ত বললে, কি কথা শুনতে চাও?
–গুপ্তলিপির ভিতর থেকে তুমি দ্বিতীয় কি অর্থ আবিষ্কার করেছে?
–কেবল আমি নই, শীতলবাবুও আবিষ্কার করেছে।
–অর্থটা কি?
জয়ন্ত আমাদের সামনে একখণ্ড কাগজ খুলে ধরলে–তার ওপরে লেখা ছিল গুপ্তলিপির সেই উপদেশগুলি : অভাবে স্বভাব নষ্ট করিবে না–প্রভৃতি।
তারপর সে বললে, তপনের প্রপিতামহ সাবধানতার ওপরে সাবধানতা অবলম্বন করেছিলেন। যদি কেহ Looking glass cripper-এর গুপ্তকথা ধরতেও পারে, তা হলেও সে আসল গুঢ় অর্থ বুঝতে পারবে না, কথাগুলোকে উপদেশ বলেই গ্রহণ করবে। কিন্তু ভালো করে উপদেশের শব্দগুলোকে লক্ষ করো। মোট লাইন আছে ছয়টি। এখন প্রত্যেক লাইন থেকে যদি কোনও প্রথম আর শেষ শব্দ নিয়ে পরে পরে সাজিয়ে যাও, তাহলে পাওয়া যাবে এই কথাগুলি : অভাবে দেব-দেবীর মূর্তি তোমার অভাব দূর করিবে, লক্ষ্মীর ঝাপি বিশেষরূপে দ্রষ্টব্য। দেখছ, এখানেও সাবধানতা! স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি, কেবল ইঙ্গিত। কিন্তু বুদ্ধিমানের পক্ষে ওই ইঙ্গিতই যথেষ্ট।
আমি বললুম, তাহলে উপন্যাসের মর্যালটা দাঁড়াল কি?
জয়ন্ত হেসে বললে, মনীষা থাকলেও বুদ্ধিমান ব্যক্তি যদি অসৎ পথে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত তাকে ঠকতে হয়, যেমন শীতলবাবু।
–আর মনীষা না থাকলে?
–সৎপথে নির্বোধকেও লাভবান করে। যেমন তপন। তপন সহাস্য বদনে বললে, যতই আজ বাক্য-বাগুরা বিস্তার করো, কিছুই আমি গ্রাহ্য করব না। আমার সোনার দেব-দেবীদের শত শত প্রণাম করে, এখনি দুর্ভেদ্য লোহার সিন্দুকে তুলে রাখব।
টেলিফোনে গোয়েন্দাগিরি
ক
যে গল্পটি বলতে বসেছি তা গল্প বটে, কিন্তু একেবারে সত্য ঘটনা। কবি শেকসপিয়র বলেছেন, সত্য হচ্ছে, উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য। অন্তত এ-ঘটনাটি সত্য হলেও এমন আশ্চর্য যে, বিখ্যাত বিলাতি লেখক কন্যান ডইল সাহেব একে অবলম্বন করেই শার্লক হোমসের একটি গল্প লিখে ফেলেছেন। আমি কিন্তু শার্লক হোমসের গল্প তোমাদের শোনাব না, আমি যা বলব তা হচ্ছে, অস্ট্রিয়া দেশের সত্যিকার পুলিশের কাহিনি, এর প্রত্যেকটি কথা পুলিশের নিজস্ব দপ্তরে লেখা আছে।
অস্ট্রিয়ার পুলিশ, চোর-ডাকাত-হত্যাকারী ধরবার জন্যে অনেক সময়ে এক নতুন উপায় অবলম্বন করে। ঘটনাস্থলে যে সব জিনিস পাওয়া যায়, পুলিশ সেগুলো দেয় রাসায়নিক পণ্ডিতদের হাতে। তাদের পরীক্ষার ফলে অপরাধীরা প্রায়ই বিচিত্র উপায়ে ধরা পড়ে। সে পরীক্ষার পদ্ধতি কীরকম, নীচের ঘটনা থেকে কতকটা আন্দাজ করা যেতে পারে।
কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে আর-একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, রসায়নশাস্ত্রের দুজন অধ্যাপক ঘটনাস্থল থেকে তিনশো ষাট মাইল দূরে অবস্থান করেও এবং ঘটনাস্থলে প্রাপ্ত কোন জিনিস চোখে না দেখেও আসল অপরাধী ধরে ফেলে পুলিশের চক্ষুস্থির করে দিয়েছিলেন! অপরাধের ইতিহাসে, এমনকী, কাল্পনিক গোয়েন্দা কাহিনিতেও এরকম ঘটনার কথা কেউ কখনও শোনেনি।
ভিয়েনা হচ্ছে অস্ট্রিয়ার রাজধানী। ভিয়েনা শহরের পা ধুয়ে বয়ে যায় ডানিউব নদী। তার উপরে আছে কয়েকটি সাঁকো। একদিন খুব ভোরবেলায় সাঁকোর পিল্লাদার-রেলিংয়ের তলায় পাওয়া গেল একটি মৃতদেহ!
.
দেখলেই বোঝা যায়, সন্ত্রান্ত ব্যক্তির দেহ। জমকালো দামি পোশাক-পরা। বয়সে লোকটি প্রাচীন। দেহের খানিক তফাতে পাওয়া গেল রিভলভার, খুব সম্ভব, হত্যাকারী তাড়াতাড়ি পালাবার সময়ে ফেলে গিয়েছে। দেহে গুলির দাগ আছে। মৃতের পকেট একেবারে খালি।
