হঠাৎ বিষ্ণু মূর্তিটি তুলে ধরে জয়ন্ত বললে, আরে এ কী! বিষ্ণুঠাকুরের ডান পায়ের ওপর থেকে খানিকটা এনামেলের আবরণ তুলে ফেললে কে? বুঝেছি, এ হচ্ছে সুচতুর শীতলবাবুর কাজ! উনি সন্দেহ করেছিলেন, এনামেলের পাতলা আবরণ কেবল বোকাদের চোখ ঠকাবার জন্যে, কিন্তু তলায় আছে কোনও মহার্ঘ ধাতু। তপন দেখতে পাচ্ছ কি, বিষ্ণু মূর্তিটির পা কি দিয়ে গড়া?–সোনা। খালি পা কেন, সমস্ত মূর্তিটাই সোনা দিয়ে গড়া।
বলো কি জয়ন্ত!
–হ্যাঁ। কেবল বিষ্ণুমূর্তি নয়, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, প্রত্যেক দেবদেবীর মূর্তিই নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি। আন্দাজে মনে হচ্ছে এ মূর্তিগুলির মোট ওজন এক মণের কম নয়।
আমি তো স্তম্ভিত!
জয়ন্ত লক্ষ্মীদেবীর সবচেয়ে বড় মূর্তিটি তুলে নিয়ে বলল, তপন এইবার আমি তোমাকে অধিকতর অভিভূত করতে চাই। দেখছি লক্ষ্মীদেবীর দেহের তুলনায় আঁপিটি অতিরিক্ত বড়। ঝাপির ভিতরটা ফাঁপা। কিন্তু ঝাপির ঢাকনিটা ভেঙে খুলে ফেললে কে? নিশ্চয়ই শীতলবাবুর কীর্তি। শীতলবাবু, ঝাপির ভিতরে কি ছিল?
শীতলবাবু শুষ্কস্বরে বললেন, আমি জানি না।
–আহা, জানেন বইকী! ঝাঁপির ভিতরে যা ছিল এখনি আমাকে ফিরিয়ে দিন।
ঝাঁপির ভিতর কিছুই ছিল না।
–এখনও মিথ্যা কথা! তপন তাহলে আর দয়া নয়, তুমি এখনি থানায় ফোন করে দাও, পুলিশ এসে শেষ ব্যবস্থা করুক।
পুলিশের নামেই শীতলবাবু ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বললে, আমাকে ধরিয়ে দেবেন না, আমাকে ধরিয়ে দেবেন না।
তাহলে ঝাঁপির ভিতরে কি ছিল দিন।
শীতলবাবু বিনা বাক্যব্যয়ে জামার পকেটের ভিতর থেকে একটি ছোট কাগজের মোড়ক বার করে জয়ন্তের হাতে সমর্পণ করলে।
জয়ন্ত আগে মোড়কটা খুলে তার ভিতরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুখ টিপে একটুখানি হাসলে। তারপর বললে, তপন, শীতলবাবুর মস্তিষ্ক যে তোমার চেয়ে শক্তিশালী সেটা তিনি প্রমাণিত করেছেন। কিন্তু অপরাধী হিসাবে তিনি একেবারে শিশুর মতো কচি আর কাঁচা।
তিনি যদি এত তাড়াতাড়ি বামাল নিয়ে এখান থেকে সরে পড়বার চেষ্টা না করতেন, তাহলে আমরা কিছুতেই ওঁর নাগাল পেতুম না। যাক ওকথা। এটা হচ্ছে শীলতবাবুর প্রথম অপরাধ। আর উনি এই অপরাধটা করেছেন বলেই তুমি হলে সব দিক দিয়েই আশাতীত রূপে লাভবান, কারণ উনি অপরাধটা না করলে তুমিও আমাকে ডাকতে না, আর তাহলে। তোমাদের এই দেবদেবীর মূর্তিগুলিও এনামেলের চাদরে গা ঢাকা দিয়ে ওই কাচের আধারেরই শোভাবর্ধন করতেন, এ জীবনেও তুমি তাদের আসল চেহারা দেখতে পেতে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তুমি ওকে ক্ষমা করবে, না পুলিশের হাতে সমর্পণ করবে?
তপন বললে, আমি ওঁকে ক্ষমাও করব না, পুলিশেও দেব না। শীতলবাবু বিশ্বাসহন্তা। উনি যেন এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বিদায় হয়ে যান।
শীতলবাবুর অধিকাংশ মোটঘাট বাঁধাই ছিল। সে আর দ্বিরুক্তি না করে বাকি জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিয়ে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, জয়ন্ত ওই মোড়কটার ভিতরে কি আছে?
জয়ন্ত হাসিমুখে মোড়কটা আমার সামনে খুলে ধরে বললে, সাত রাজার ধন এক মানিক।
প্রকাণ্ড এক হীরক খণ্ড। অতবড় হীরা আমি কখনও চক্ষেও দেখিনি।
তপনের বোধহয় মাথা ঘুরে গেল। সে একটা অস্ফুট শব্দ উচ্চারণ করে ধপাস করে চৌকির ওপরে বসে গড়ল।
.
ছয়
জয়ন্ত বললে, আমি কেন শীতলবাবুর ওপরে সন্দেহ করেছিলুম, এখন সেই কথাই শোনো।
এনামেল করা মূর্তিগুলি যে অত্যন্ত মূল্যবান, আর সত্যনারায়ণের পুঁথিখানি যে অতিশয় দরকারি, এতদিন কেন যে তোমাদের এমন সন্দেহ হয়নি, সেটা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। গুপ্তলিপির রহস্য তোমরা জানতে না বটে কিন্তু এটা তো সকলেই জানতে যে, তোমার প্রপিতামহ উইলে স্পষ্ট ভাষায় বলে গেছেন, যে ওই মূর্তিগুলির আর পুঁথির সদ্ব্যবহার করতে পারবে, সে তার নাম কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে। হয়তো অভাবে পড়নি বলেই তোমরা ও কথাগুলির ওপরে বিশেষ ঝোঁক দাওনি। হয়তো অভাবে পড়লেই তোমাদেরও মাথা খুলে যেত।
আমি গুপ্তলিপির পাঠোদ্ধার করবার আগেই ওই কথাগুলি শুনেই নিশ্চিতভাবে ধরে নিয়েছিলুম দেবদেবীর মূর্তিগুলি মহামূল্যবান। অবশ্য গুপ্তলিপি পড়বার পর ও সম্বন্ধে আমার আর কোনও সন্দেহই থাকেনি।
বাড়ির লোকই যে চুরি করেছে, এটা বুঝতেও আমার বিলম্ব হয়নি। ঠাকুরঘরে তালার নতুন একটা চাবি গড়াবার সুযোগ হয় বাড়ির লোকেরই। বাইরের চোর মূর্তি রহস্য জানত না, অতএব কেবল মূর্তিগুলিই চুরি করে সে সরে পড়ত না। ঘটনার দিন রাত্রে বাড়িতে ছিল দাসদাসী, পাঁচক আর দ্বারবানরা। নিশ্চয় তাদেরও কেউ চুরি করেনি, কারণ তাহলে সে ঠাকুর ঘরের সোনা-রূপোর জিনিসগুলোও ফেলে যেত না। বাড়ির ভিতরে তাদের কথা বাদ দিলে বাকি থাকে কেবল শীতলবাবু। আমার যুক্তি বললে, সেই-ই চোর।
কিন্তু কেন সে বেছে বেছে মূর্তিগুলোই চুরি করলে? আমার মতো সেও কি ভিতরের রহস্য আবিষ্কার করবার কোনও সুযোগ পেয়েছিল? তপনকে জিজ্ঞাসা করে জানলুম, পেয়েছিল। মাসখানেক আগে সে হস্তগত করেছিল পুথিখানা। খুব সম্ভব আমার মতো তাড়াতাড়ি সে গুপ্তলিপির পাঠোদ্ধার করতে পারিনি। সেই চেষ্টাতেই তার কিছুদিন কেটে যায়। তারপর নতুন চাবি গড়িয়ে চুরি করে সে প্রথম সুযোগেই।
