–পেরেছি। তোমাদের বাড়ির যত অনর্থের মূলেই আছে এই অর্থ।
–অর্থটা শুনি।
–এখন নয়। অর্থটা ইঙ্গিতম, শুনলেও ভাল করে বুঝতে পারবে না। অর্থটা প্রকাশ করবার আগে আমি একটা কথা জানতে চাই।
কি কথা?
সত্যনারায়ণের পুঁথির এই বিশেষত্ব নিয়ে তুমি আর কারুর সঙ্গে আলোচনা করেছ?
–আগে-আগে করতুম বইকী! কিন্তু কেউই ওই হেঁয়ালি বুঝতে পারেনি। শেষে হতাশ হয়ে হাল ছেড়েদি। কেবল গত মাসে শীতলবাবুর কৌতূহল দেখে, পুঁথিখানা তার হাতে দিয়েছিলুম বটে!
তারপর?
–শীতলবাবু পরদিন পুঁথিখানা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, তিনিও কিছুই বুঝতে পারেননি।
শীতলবাবুকে একবার এখানে ডাকবে?
–তিনি বৈকালেই দেশের জন্যে বাজারহাট করতে বেরিয়ে গিয়েছেন, সন্ধ্যার আগে ফিরতে পারবেন না।
–দেশের জন্যে বাজারহাট?
–হ্যাঁ। তার কোনও আত্মীয়ের বিয়ে, তাই এক হপ্তার ছুটি নিয়ে কাল তিনি দেশে যাচ্ছেন।
কাল, কখন?
–খুব ভোরের গাড়িতে। সূর্যোদয়ের আগেই তাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।
শীতলবাবু কি তোমার বাড়ির দোতলায় থাকেন?
না, বাড়ির একতলায় খিড়কির বাগানের সামনেই।
জয়ন্ত প্রায় পাঁচ মিনিটকাল স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তারপর বললে, তপন আজ তোমার বাড়িতে আমাদের জন্য একটুখানি জায়গা হবে?
তপন বিস্মিত কণ্ঠে বললে, তার মানে।
–আমি আর আমার বন্ধু মানিক আজ তোমাদের বাড়িতে রাত্রি বাস করতে চাই।
যদিও তোমার এই প্রস্তাবের কারণ বুঝতে পারছি না, তবু সানন্দে স্বাগত সম্ভাষণ করছি। কেবল রাত্রিবাস কেন, ডানহাতের ব্যাপারটাও আমার এখানে সেরে নিও।
–আপত্তি নেই! আর একটা কথা; আমি আবার দক্ষিণ খোলা না হলে ঘুমুতে পারি না।
–নির্ভয় হও। আমার বাড়ির দক্ষিণ দিকে আছে বাগান আর পুকুর–এখানা সেকেলে বাড়ি কিনা! আমার শয়ন-গৃহও সেইদিকে। তোমরাও আমার সঙ্গে সেই ঘরেই শয়ন করবে।
.
পাঁচ
তপন যে গুরুতর আহার্যের ব্যবস্থা করেছিল, একটিমাত্র ডান হাতের সাহায্যে কোনও মানুষই তার সদ্ব্যবহার করতে পারে না। খানিক পেটে পাঠিয়ে খানিক পাতে ফেলে আমরা উঠে পড়তে বাধ্য হলুম–তপনের ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও।
বাগানের দিকে দোতলার বারান্দায় খানিকক্ষণ পায়চারি করলুম তিনজনে। জ্যোত্সামালা রাত, বাগানের তাল-নারিকেল পাতায় পাতায় আলোর ফুলঝুরি, সরোবরের নৃত্যশীল জলে চন্দ্রকরের চকমকি। মৃদু পত্র-মর্মর, বাতাসের ঠান্ডা দীর্ঘশ্বাস, ঝিল্লিদের ঘুমপাড়ানো ঝঙ্কার।
খানিকক্ষণ চলল গল্প। তারপরে ঘুমে আমার চোখ ভরে এল। জয়ন্ত ঘন ঘন হাই তুলতে শুরু করেছে দেখে তপন বললে, চলো, এইবার শয্যায় গিয়ে আশ্রয় নেওয়া যাক।
শুয়ে-শুয়ে খানিকক্ষণ ভাবলুম, জয়ন্ত গুপ্তলিপির এমনকী গূঢ় অর্থ আবিষ্কার করেছে, যে জন্য আজ এখানে তার রাত কাটাবার দরকার হল? জিজ্ঞাসা করলেও এখন সে জবাব দেবে না জানি, তাই তাকে কিছু জিজ্ঞাসাও করিনি। সময়ে নিরতিশয় রহস্যময় হয়ে ওঠে জয়ন্ত! এই সব ভাবতে-ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়লুম নিজের অজ্ঞাতসারে।
আচম্বিতে আমার ঘুম গেল ভেঙেকে আমাকে ধাক্কার পর ধাক্কা মারছে।
ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দেখি, জয়ন্ত। তারপর সে ধাক্কা মেরে জাগিয়ে দিল তপনকেও।
ঘড়িতে ঢং ঢং করে বাজল রাত দুটো।
তপন সবিস্ময়ে বললে, এত রাত্রে এ কী ব্যাপার জয়ন্ত?
–কোনও কথা নয়। একেবারে একতলায় নেমে চলো। সিধে শীতলবাবুর ঘরে।
–সে কী, কেন?
কথা নয়, কথা নয়! যা বলি শোনো!
ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে পড়লুম। সিঁড়ি বেয়ে একতলায় নামলুম। খানিক এগিয়ে একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে তপন বললে, এই শীতলবাবুর ঘর।
দরজার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসছিল আলোর রেখা।
জয়ন্ত বললে, তপন, শীতলবাবুকে ডাকো।
তপন ডাকলে, শীতলবাবু, শীতলবাবু!
ঘরের আলো গেল নিভে।
কোনও সাড়া নেই।
তপন আবার ডাকলে, শীতলবাবু! ঘরের আলো নেবালেন কেন? আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না কেন?
এবার ঘরের ভিতর থেকে সাড়া এল, কে?
–আমি তপন, দরজা খুলুন।
দরজা খুলে একটি লোক বাইরে বেরিয়ে এসে বললে, এত রাতে। ব্যাপার কী? কোনও বিপদ-আপদ হয়েছে নাকি!
ইতিমধ্যে জয়ন্ত হাতের টর্চ জ্বেলে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিয়েছে।
শীতলবাবুও ঘরে ঢুকে ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠল, কে আপনি? আমার ঘরে আপনার কি দরকার?
তপন বললে, চুপ করুন শীতলবাবু। উনি আমার বন্ধু।
শীতলবাবু বললে, কিন্তু আপনার বন্ধু এত রাতে আমার ঘরে ঢুকে কি করতে চান?
জয়ন্ত বললে, আমি দেখতে চাই, একটা ভিজে পোঁটলা আপনি ঘরের ভিতরে কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?
–পোঁটলা? কীসের পোঁটলা?
কিন্তু জয়ন্ত আর তার কথার জবাব না দিয়ে নিজের মনেই বললে, হুঁ। এই তো ঘরের মেঝেয় রয়েছে জলের দাগ। এই তো একটা জলে ভেজা জিনিস টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হা, টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে একেবারে চৌকির তলায়–বলতে-বলতে সে মেঝের ওপরে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে বুকে হেঁটে প্রবেশ করল চৌকির তলদেশে এবং সেইভাবেই আবার যখন বাইরে বেরিয়ে এল, তখন দেখা গেল, সে টানতে টানতে নিয়ে আসছে একটা চটের থলি।
তারপর সে থলির ভিতর হাত চালিয়ে একে-একে বার করলে রাধা কৃষ্ণ, লক্ষ্মী, কালী, মহাদেব ও সরস্বতী–এই সাতটি দেবদেবীর এনামেল করা মূর্তি।
তপন নির্বাক, বিষম বিস্ময়ে। শীতলবাবুরও নির্বাক, দারুণ আতঙ্কে।
