জয়ন্ত বললে, তোমাদের ওই সত্যনারায়ণের পুঁথির কথা এইবার বলো। তোমার প্রপিতামহ ওই পুঁথিখানাতেও যখন সযত্নে রক্ষা করতে বলেছেন, তখন ওর মধ্যেও নিশ্চয়। কোনও বিশেষত্ব আছে।
তপন বললে, বিশেষত্ব? পুঁথির ভিতরে আবার কি বিশেষত্ব থাকবে? বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে একটু ভেবে সে আবার বললে, না-না, একটা বিশেষত্ব আছে বটে, কিন্তু তার সঙ্গে মূর্তি চুরির কোনও সম্পর্কই থাকতে পারে না।
জয়ন্ত বললে, হয়তো, কোনওই সম্পর্ক নেই। তবু বিশেষত্বের কথাটা শুনে রাখা উচিত।
তপন উঠে দাঁড়িয়ে বললে, পুঁথিখানা আমি এখনি নিয়ে আসছি, তুমি স্বচক্ষে দেখতে পারো।
.
তিন
তপন নিয়ে এল পুঁথিখানা।
জয়ন্ত তার পাতা ওলটাতে-ওলটাতে বললে, খুব প্রাচীন পুঁথি বটে। কিন্তু তপন, আর কোনও বিশেষত্বই তো দেখতে পাচ্ছি না।
–পুঁথি যেখানে শেষে হয়েছে, বিশেষত্বটা খুঁজে পাবে সেইখানে।
যথাস্থানে দৃষ্টিপাত করে কিছুক্ষণ মৌন মুখে বসে রইল জয়ন্ত। আরও লক্ষ করলুম, তার দুই চক্ষে ফুটে উঠেছে জ্বলন্ত কৌতূহল।
পুঁথি থেকে মুখ তুলে অবশেষে সে বললে, এখানে ভিন্ন হাতের একটু লেখা রয়েছে।
তপন বললে, হা, হিজিবিজি হেঁয়ালি। কোন ভাষা, কিছু বোঝবার যো নেই। কৌতূহল জাগায়, কিন্তু কৌতূহল মেটায় না। বহু চেষ্টা করে শেষটা হার মেনেছি।
–তোমার বাবা, তোমার ঠাকুরদাদাও নিশ্চয় পুঁথির এই লেখা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, তারাও কিছুই বুঝতে পারেননি।
–তপন, বড়ই দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, তোমার প্রপিতামহ যে বুদ্ধিমান বংশধরের জন্যে এই পুঁথিখানি সযত্নে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন, তিনি এখনও তোমাদের পরিবারের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেননি!
কিঞ্চিৎ বিরক্ত স্বরে তপন বললে, তোমার কথার অর্থ বুঝলুম না।
–বেশ, বুঝিয়ে দিচ্ছি। জয়ন্ত উঠে পড়ে দেয়ালে ঝুলানো প্রকাণ্ড একখানা দর্পণের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর পুঁথিখানা তুলে ধরে আয়নার ভিতরে তার প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে একখণ্ড কাগজের ওপরে কি সব লিখে যেতে লাগল। তারপর ফিরে এসে কাগজখানা আমাদের সামনে টেবিলের ওপরে ফেলে দিয়ে বলল, এইবারে পড়ে দ্যাখো।
সাগ্রহে ঝুঁকে পড়ে আমরা দুজনে এই কথাগুলি পাঠ করলুম
অভাবে স্বভাব নষ্ট করিবে না। সর্বদা দেবদেবীর মূর্তি স্মরণ করিবে। নিশ্চিত জানিও, তোমার অভাব লইয়া মাথা ঘামাইতে হইবে না। চিন্তা দূর করিবে। লক্ষ্মীছাড়া হইলে জীবনে লক্ষ্মীর ঝাপি বিশেষ কাজে লাগে না। জগদীশ্বর কত রূপে দ্রষ্টব্য।
তপন চমৎকৃত কণ্ঠে বললে, ওই হেঁয়ালির ভিতরে এই কথা ছিল?
জয়ন্ত বললে, হ্যাঁ। কিন্তু যা তুমি হেঁয়ালি বলে ভ্রম করছ, তা হচ্ছে আমাদের সরল মাতৃভাষাই। কেবল উলটোভাবে সাজানো।
–উলটোভাবে সাজানো মানে?
–এ হচ্ছে এক রকম সাদাসিদে গুপ্তলিপি। ইংরেজিতে একে বলে Looking Glass clipper (দর্পণ-গুপ্তলিপি)। পঞ্চদশ শতাব্দীতেও ইতালির চিন্তাশীল চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য। ভিঞ্চি এই উপায়েই গুপ্তলিপি রচনা করে গিয়াছেন। আয়নার সামনে ধরলেই এরকম গুপ্তলিপি খুব সহজেই পাঠ করা যায়।
তপন বললে, এত সহজে গুপ্তলিপির পাঠোদ্ধার করে তুমি যথেষ্ট বাহাদুরির পরিচয় দিলে বটে, কিন্তু এটা আমাদের কোন কাজে লাগবে? এত কতকগুলি মামুলি উপদেশ মাত্র। সকলেই যা জানে, তার আবার গুপ্তলিপির কি প্রয়োজন?
–ঠিক বলছ তপন। এরকম মামুলি উপদেশের জন্যে গুপ্তলিপির প্রয়োজন হয় না। তার ওপরে উপদেশগুলো কেমন যেন খাপছাড়া! আমার কি সন্দেহ হচ্ছে জানো? তোমার প্রপিতামহ এই গুপ্তলিপি রচনার সময়ে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করেছিলেন। যেমন বেনারসের একরকম কৌটোর ভিতরেও আবার কৌটো থাকে, তেমনি এই গুপ্তলিপির প্রথম রহস্যের ভিতরেও অন্য কোনও রহস্য আছে। তোমরা এখন দয়া করে বাইরে যাও, আমাকে কিছুক্ষণ একলা থাকতে দাও, একবার চেষ্টা করে দেখি, গুপ্তলিপির আসল অর্থ আবিষ্কার করতে পারি কিনা।
.
চার
বৈঠকখানার পাশেই ছিল তপনদের লাইব্রেরি। তপন আমাকে সেই ঘরেই নিয়ে গেল।
সাধারণত বাঙালিদের বাড়িতে এত বড় লাইব্রেরি চোখে পড়ে না। মস্ত ঘরের চারিদিকের দেওয়ালের আধখানা ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে আলমারির পর আলমারি। ভিতরকার বইগুলোর নাম পড়তে-পড়তে কেটে গেল খানিকক্ষণ।
ফিরে বললুম, তপন, এখানে যতগুলো বই-এর নাম পড়লুম, সবই দেখছি পুরানো যুগের।
–তা তো হবেই। এ ঘরের চার ভাগের তিন ভাগ কেতাব সংগ্রহ করে গিয়েছেন আমার প্রপিতামহ। বই কেনা আর বই পড়া ছিল তাঁর আর-এক অদ্ভুত খেয়াল।
বই কেনা আর পড়াকে তুমি অদ্ভুত খেয়াল বলে মনে করো। জানো, আমরা পশুত্বের ধাপ থেকে মানুষের ধাপে উঠতে পেরেছি কেবলমাত্র জ্ঞানার্জনের দ্বারা?
জানি। যে-কোনও বিষয়েই বাড়াবাড়িটাকে আমি ফ্যাড বলেই মনে করি।
–না। যা আমাদের মনকে উন্নত করে, প্রশস্ত করে, তার বাড়াবাড়িও নিন্দনীয় নয়। দেখছি তোমার প্রপিতামহ একজন অত্যন্ত সুধী ব্যক্তি ছিলেন।
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে জয়ন্ত উত্তেজিত কণ্ঠে ডাক দিলে–তপন, মানিক! শিগগির এ-ঘরে এসো।
আমরা বৈঠকখানায় ঢুকে দেখলুম, জয়ন্ত একখণ্ড কাগজের দিকে তাকিয়ে স্থিরভাবে বসে আছে।
তপন শুধাল, ব্যাপার কি ভায়া? গুপ্তলিপির ভিতর থেকে কোনও নতুন অর্থ আবিষ্কার করতে পেরেছ নাকি?
