আমি আর জয়ন্ত তখন থার্ড-ইয়ার-এর ছাত্র। সে যে ভবিষ্যতে একজন বিখ্যাত গোয়েন্দা হবে, জয়ন্ত তখনও একথা জানত না বটে, কিন্তু সেই সময় থেকেই দেশ-বিদেশের অপরাধী-বিজ্ঞান, নামজাদা গোয়েন্দা ও অপরাধীদের কার্যকলাপ নিয়ে দস্তুরমতো মস্তিষ্ক চালনা শুরু করে দিয়েছিল। সময়ে সময়ে অতি তুচ্ছ সূত্র ধরে সে এমন সব বৃহৎ বৃহৎ তথ্য আবিষ্কার করত যে, আমরা তার সহপাঠীরা বিস্ময়ে অবাক না হয়ে পারতুম না।
একটি বৈকাল। জয়ন্ত ও আমি গোলদিঘিতে পায়চারি করছি। এমন সময় তপনের সঙ্গে দেখা। সেও আমাদের কলেজের থার্ড ইয়ারের ছাত্র। বনিয়াদি বংশের ছেলে। তার পূর্বপুরুষেরা আগে বিপুল সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তাদের আধুনিক অবস্থা ততটা উন্নত না হলেও, এখনও তারা ধনবান বলে পরিচিত হতে পারে। আজও তাদের বাড়িতে দোল-দুর্গোৎসবে সমারোহের অভাব হয় না।
জয়ন্তকে দেখেই তপন বলে উঠল, আরে, তোমাকেই খুঁজছি যে।
জয়ন্ত শুধালে, আমাকে খুঁজছ কেন?
–একটা হেঁয়ালির অর্থ জানতে চাই।
কীরকম হেঁয়ালি?
আমাদের বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটেছে। গুরুতর কিছু নয় বটে, কিন্তু যথেষ্ট কৌতূহলদ্দীপক। এ ব্যাপারে তোমার মাথা খুব খেলে কিনা, তাই তোমার সঙ্গে পরামর্শ করতে চাই।
–ঘটনাটা বলো।
–এই ভিড়ে নয়, আমার বাড়িতে চল। মনে কোরো না কেবল ঘটনাটা বলবার জন্যেই তোমাদের বাড়িতে টেনে নিয়ে যাচ্ছি। যৎসামান্য ঘটনা, তুচ্ছ চুরি–কোনও ছিঁচকে চোরের কীর্তি। কিন্তু তোমাদের সঙ্গ আমার ভালো লাগে, তাই একসঙ্গে বসে চা-টা খেতে-খেতে কিছুক্ষণ গল্পসল্প করতে চাই।
আমার দিকে ফিরে জয়ন্ত বললে, কি হে মানিক, রাজি আছ?
আমি বললুম, মন্দ কি! অন্তত খানিকটা সময় কাটানো যাবে তো।
.
দুই
তপনদের সাজানো-গুছানো বৃহৎ বৈঠকখানা। চা এল, খাবার এল।
তপন বললে, আগে ঘটনাটা শোনো, তোমার মত বলো, তারপর অন্য গল্পসল্প। দেখ, আমার প্রপিতামহ স্বর্গীয় তারাশঙ্কর চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত খেয়ালি মানুষ। কোন খেয়ালে জানি না, তিনি গুটিকয় দেব-দেবীর মূর্তি গড়িয়েছিলেন। বিষ্ণু, মহাদেব, কৃষ্ণ, রাধা, কালী, লক্ষ্মী আর সরস্বতী–এই সাতটি মূর্তি। ওর মধ্যে লক্ষ্মীর মূর্তিটিই সবচেয়ে বড় লম্বায় এক ফুট। অন্য অন্য মূর্তির কোনওটি আট ইঞ্চি লম্বা, কোনওটি ছয় ইঞ্চি। মূর্তিগুলি বেশ ভারী। কি দিয়ে গড়া জানি না, বাবা বলতেন পিতলের মূর্তি। কিন্তু বাহির থেকে বোঝবার উপায় ছিল না, কারণ প্রত্যেক মূর্তির আপাদমস্তক ছিল রঙিন এনামেল দিয়ে ঢাকা। ঠাকুরঘরের মধ্যে একটি গ্লাস-কেসের ভিতরে মূর্তিগুলি সাজানো ছিল আমার প্রপিতামহের আমল থেকেই। আমার ঠাকুরদা কি বাবা, ও মূর্তিগুলো নিয়ে কিছুমাত্র মাথা ঘামাননি, আমিও মাথা ঘামানো দরকার মনে করিনি। কিন্তু সম্প্রতি এক ব্যক্তি তাদের নিয়ে রীতিমতো মাথা না ঘামিয়ে পারেনি।
–কে সে?
–কোনও অজ্ঞাত চোর।
–তাহলে মূর্তিগুলি চুরি গিয়াছে?
হ্যাঁ।
কবে?
–তিন দিন আগে।
–মূর্তিগুলি কি মূল্যবান?
–মূল্যবান হলে সেগুলিকে কাচের আধারে ওভাবে ঠাকুরঘরে ফেলে রাখা হত না। শিল্পের দিক দিয়েও তাদের কোনও মূল্য থাকতে পারে তো?
–মোটেই নয়, মোটেই নয়। অতি সাধারণ মূর্তি, শিল্পীরা তাদের দিকে ফিরেও তাকাবে । কেবল এনামেল করা মূর্তি এইটুকুই যা, বিশেষত্ব। তবে সেজন্য কেউ-ই তাদের খুব বেশি দাম দিয়ে কিনতে রাজি হবে না। কিন্তু মজার কথা কি জানো। আমার অতি খেয়ালি প্রপিতামহ তার উইলেও মূর্তিগুলির উল্লেখ করতে ভোলেননি।
কীরকম?
উইলে তিনি বলেছেন, তার কোনও বুদ্ধিমান বংশধরের জন্য ওই মূর্তিগুলি আর সত্যনারায়ণের পুঁথিখানি রেখে গেলেন, যে ওগুলির সদ্ব্যবহার করতে পারবে। মূর্তি আর পুঁথি যেন সযত্নে রক্ষা করা হয়।
বটে, বটে! এতক্ষণ পরে একটা চিত্তাকর্ষক কথা শুনলুম। সত্যনারায়ণের পুঁথি কি তপন?
–সেকালে হাতে লেখা একখানা পুরাতন পুঁথি। সত্যনারায়ণের পুজার সময়ে পুঁথিখানি পাঠ করা হয়।
–আচ্ছা, পুঁথির কথা পরে হবে, আগে চুরির কথা বলো।
পরশু দিন মামাতো-বোনের বিয়ে ছিল। বাড়ির সবাইকে নিয়ে মামার বাড়িতে রাত কাটাতেই হয়েছিল। কাল সকালে ফিরে এসে দেখি গ্লাস-কেসের ভিতর থেকে মূর্তিগুলি অদৃশ্য হয়েছে।
ঠাকুরঘরের দরজা কি তালাবন্ধ থাকত না?
–থাকত বইকী! চোর অন্য কোনও চাবি দিয়ে তালাটা খুলে ফেলেছিল।
–মূর্তি ছাড়া আর কিছু চুরি যায়নি?
–না। এও এক আশ্চর্য কথা। ঠাকুরঘরের লক্ষ্মীর হাঁড়ির ভিতর ছিল আকবরী মোহর, কিছু কিছু রূপোর বাসনকোশন, গৃহদেবতা রঘুনাথের রূপোর সিংহাসন, সোনার ছাতা, চুড়া, পৈতা আর খড়ম। চোর কিন্তু সেসব স্পর্শ করেনি। সে যেন খালি মূর্তিগুলো চুরি করবার জন্যেই এখানে এসেছিল।
–পুলিশে খবর দিয়েছ?
–এই সামান্য চুরির মামলা নিয়ে পুলিশ হাঙ্গামা করতে ইচ্ছেই হচ্ছে না।
কারুর ওপরে তোমার সন্দেহ হয়?
কাকে সন্দেহ করব? দাস-দাসী, পাঁচক, দ্বারবান সকলেই বাবার আমলের পরীক্ষিত লোক, এতদিন পরে তাদের কারুর ওই তুচ্ছ মূর্তিগুলোর ওপরে দৃষ্টি পড়বে কেন? তারা ছাড়া বাড়িতে থাকেন শীতলবাবু। তার কর্তব্য দুরকম। ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের পড়ানো। আর এটা ওটা সেটার তত্ত্বাবধান করা। তিন বছর কাজ করছেন, প্রায় আমাদের সংসারেরই একজন হয়ে উঠেছেন। গরিব হলেও লেখাপড়া জানা নিরীহ সচ্চরিত্র ব্যক্তি সকল রকম সন্দেহের অতীত।
