কিন্তু এখন সব দেশেরই পুলিশের চিত্রশালায় প্রত্যেক নবীন ও প্রবীণ অপরাধীর ফোটোগ্রাফ সযত্নে তোলা থাকে। কাজেই কোনও অপরাধের সঙ্গে কোনও পলাতক পুরাতন অপরাধীর সম্পর্ক আবিষ্কৃত হলেই এই ফোটোগ্রাফের সাহায্য নেওয়া হয় নানা ভাবে, এবং ওই অপরাধী পৃথিবীর শেষপ্রান্তে পলায়ন করলেও কেবল, ফোটোর সাহায্যেই তাকে আবার গ্রেপ্তার করবার সুবিধা হয়। আসলে, অপরাধীদের দেহ মুক্তি পেলেও পুলিশের চিত্র কারাগারে তারা চিরকালের জন্যে বন্দি হয়ে থাকে।
কেবল ফোটোর মহিমায় নির্দোষ ব্যক্তির প্রাণ বা সম্মান রক্ষা পেয়েছে। একটা দৃষ্টান্ত দিই।
আমেরিকার রাইও-ডি জেনিরো বন্দর থেকে এক ইংরেজ তার এক ব্রেজিলিয়ান বন্ধুর সঙ্গে প্রমোদ-তরণীতে yacht চড়ে সমুদ্রে হাওয়া খেতে বেরিয়েছিল। কিন্তু সে ফিরে এল তার ব্রেজিলিয়ান বন্ধুর মৃতদেহ নিয়ে!
ইংরেজ বললে, তার বন্ধু নাকি মাস্তুল থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় আহত হয়ে মারা পড়েছেন।
প্রমোদতরীর একখানা দাঁড় পাওয়া গেল না। ডাক্তাররা বললেন, মৃত ব্যক্তির মাথায় যে ক্ষত রয়েছে, দাঁড়ের বাড়ি আঘাত করলেও সেরকম ক্ষত হতে পারে!
তারপরে জানা গেল, নৌকো নিয়ে বেড়াতে বেরুবার দুইদিন আগেই দুই বন্ধুর ভিতরে অত্যন্ত ঝগড়াঝাটি হয়েছিল।
ইংরেজ বললে, কিন্তু সে ঝগড়া স্থায়ী হয়নি। আবার আমাদের ভাব হয়ে গিয়েছিল।
পুলিশ তার কথা বিশ্বাস করলে না। খুনের অপরাধে তাকে চালান দেওয়া হল।
আসামির বাঁচবার কোনও উপায়ই রইল না; কিন্তু হঠাৎ আসামির সপক্ষে এক আশ্চর্য প্রমাণ পাওয়া গেল।
বন্দর থেকে আসামির প্রমোদ তরী যখন বাইরে যাচ্ছিল, তখন একখানা বড় জাহাজ বন্দরের ভিতরে প্রবেশ করছিল।
একজন শখের ফোটোগ্রাফার সেই সময়ে ডাঙায় দাঁড়িয়ে ছবি (Snap-shot) তুলেছিলেন।
ছবি ডেভালপ করে দেখা গেল, একখানা নৌকোর উপরে শূন্যে কি একটা কালো দাগ রয়েছে।
এনলার্জ করবার পর বোঝা গেল, ওই কালো দাগটা আর কিছু নয়, মাস্তুলের উপর থেকে একটি লোক নৌকোর পাটাতনের দিকে পড়ে যাচ্ছে!
ইংরেজ বেচারার বিপদের কথা ফোটোগ্রাফার শুনেছিল। সে তখনি ওই ফটোখানি পুলিশে দাখিল করলে। ফলে ইংরেজটির ফঁড়া কেটে গেল, সে বেকসুর খালাস পেলে।
লাশ বেশিদিন অবিকৃত থাকে না। কিন্তু তার দেহ হত্যাকাণ্ডের অনেকদিন–সময়ে সময়ে কয়েক বৎসর–পরেও পুলিশের কাজে বিশেষ দরকার হয়। এক্ষেত্রেও ক্যামেরার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। উপরন্তু ঘটনাস্থলের সাময়িক ও স্থায়ী ছবি এবং অপরাধকালে ব্যবহৃত নানা জিনিসের ছবিও ওই ক্যামেরার সাহায্যে দেশ-বিদেশে যখন-তখন কাজে লাগানো যায়।
বিশেষ করে আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করবার সময়ে এখন সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে ওই ক্যামেরাই (triple extension camera)। আগেই বলেছি, আঙুলের ছাপ ক্যামেরার প্রসাদে তিন-চারগুণ বেশি বড় করে তুললে পরীক্ষার যে কত সুবিধা হয়, তা আর বলবার নয়। দলিল-পত্র সম্পর্কীয় অনেক জটিলতাই আজকাল কেবল ক্যামেরার সাহায্যেই পরিষ্কার করে ফেলা হয়।
কিন্তু কিছু বেশি অর্ধ শতাব্দীর আগে ক্যামেরার সঙ্গে পুলিশের কোনও সম্পর্কই ছিল না–যদিও সত্যিকার ফোটোগ্রাফি আবিষ্কৃত হয়েছে তার বহু পূর্বে–১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে।
আধুনিক ডিটেকটিভের আর একটি প্রধান সাহায্যকারী হচ্ছে মাইক্রোস্কোপ বা অণুবীক্ষণ। কিন্তু এ-জিনিসটির সঙ্গেও সেকেলে পুলিশ পরিচিত ছিল না। এমনকী ঔপন্যাসিক কন্যান ডইলের মানসপুত্র ডিটেকটিভ শার্লক হোমস্ যখন অপরাধ-রহস্য আবিষ্কারের জন্যে বিশেষরূপে বীক্ষণকাচের সাহায্য নিতেন, সত্যিকার পুলিশ তখনও ওই বিষয় নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে রাজি হয়নি।
কিন্তু আজ তাদের সমস্ত সন্দেহ দূর হয়েছে। পুলিশের খাতাপত্র খুঁজলে জানা যাবে, অণুবীক্ষণ অভাবে বহু ক্ষেত্রেই আধুনিক গোয়েন্দাগিরি অচল হয়ে পড়ে!
১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে বিলাতে কোল নামে এক কনস্টেবল চোর ধরতে গিয়ে মারা পড়ে। সেই খুনি চোর তার দুর্ভাগ্যক্রমে লাশের কাছে একখানা বাটালি ফেলে গিয়েছিল।
বাটালির তলায় কতকগুলো হিজিবিজি কি দাগ ছিল। খালি চোখ দিয়ে দেখে দাগগুলো বাজে বলেই মনে হয়। কিন্তু ইন্সপেক্টর গম যখন বীক্ষণ কাচ দিয়ে দেখলেন তখন সেই হিজিবিজির ভিতর থেকে হত্যাকারীর নাম স্পষ্ট হয়ে উঠল। ফলে ধরা পড়ে তার ফাঁসি হয়। বীক্ষণ কাচ না থাকলে এ মামলার কোনওই কিনারা হত না। এমন অসংখ্য মামলার কাহিনি এখানে বলা যায়। কিন্তু আমাদের জায়গা নেই!
বীক্ষণকাচ আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করবার সময়েও অপরিহার্য! ঘটনাস্থলে চোর বা হত্যাকারী হয়তো নিজের জামা কাপড়ের দু-একটা অতি-ক্ষুদ্র কণা-পরিমাণ টুকরোও ফেলে গিয়েছে, পরে বীক্ষণ কাচের সাহায্যে সেই তুচ্ছ জিনিস পরীক্ষা করেও বড় বড় অপরাধীকে ধরে ফেলা হয়েছে! জালিয়াতি আবিষ্কার করতেও বীক্ষণকাচ অদ্বিতীয় এবং রক্ত-পরীক্ষাকালেও বৈজ্ঞানিক পুলিশ অণুবীক্ষণ ব্যবহার না করে পারে না।
এই বৈজ্ঞানিক পুলিশের আবির্ভাবে আধুনিক অপরাধ-কাহিনি নতুনতায় বিচিত্র হয়ে উঠেছে, এর কাছে সেকেলে গোয়েন্দা কাহিনি অনেক সময় ছেলেভুলানো গল্প বলেই মনে হয়।
জয়ন্তের প্রথম মামলা (উপন্যাস)
আমার বন্ধু জয়ন্ত গোয়েন্দাগিরি করে এখন যথেষ্ট যশস্বী হয়েছে। সে যে কত মামলার কিনারা করেছে, তার আর সংখ্যা হয় না। কিন্তু তার প্রথম মামলার কথা আজ। পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয়নি। মামলাটি যদিও বিশেষ অসাধারণ নয়, তবু তরুণ বয়স থেকেই সে যে কীরকম আশ্চর্য পর্যবেক্ষণ শক্তির অধিকারী ছিল, আমার এই কাহিনির ভিতরে তার উজ্জ্বল পরিচয় পাওয়া যাবে।
