দানিয়েল হেসে বললেন, মহারাজ, ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখুন।
মহারাজা ছাই-ছড়ানো মেঝের দিকে সবিস্ময়ে তাকিয়ে বললেন, একী, এখানে এত পায়ের দাগ এল কেমন করে? এ যে দেখছি পুরুষের পায়ের দাগ, মেয়ের পায়ের দাগ, শিশুর পায়ের দাগ! ব্যাপার কী?
দানিয়েল বললেন, ব্যাপার আর কিছুই নয় মহারাজ! পুরুতরা তাদের বউ আর ছেলে-মেয়ে নিয়ে পিছনের একটা গুপ্তদ্বার দিয়ে মন্দিরে ঢুকে রোজ রাত্রে দেবতার নৈবেদ্য পেট ভরে খেয়ে যায়!
রাজার চোখ ফুটল! পুরুতদের প্রাণদণ্ড হল।
পায়ের ছাপ অবলম্বনে বাবিলনের ওই দানিয়েল মান্ধাতার আমলে গোয়েন্দাগিরি করেছেন। এবং তারপর ওই পায়ের ছাপ আজ হাজার হাজার বৎসর ধরে হাজার হাজার চোর-ডাকাত-খুনির ধরা পড়বার প্রধান কারণ হয়ে আছে!
পায়ের ছাপ দেখে অনায়াসেই বলে দেওয়া যায়, কোন লোক রোগা না মোটা, বেঁটে ঢ্যাঙা, সে খোঁড়া কিনা, সে স্ত্রী না পুরুষ, এবং যদি স্ত্রীলোক হয় তবে গর্ভবতী কিনা। আস্তে-আস্তে চললে একরকম পায়ের ছাপ পড়ে এবং দৌড়লে পড়ে আর একরকম। পায়ের ছাপ পরীক্ষা করবার জন্যে এখনকার ইউরোপীয় পুলিশ সূক্ষ্মতম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে।
মাটি থেকে পায়ের ছাপের ছাঁচ তোলবার জন্যে অনেকরকম জিনিসের সাহায্য নেওয়া হয়েছে–গদ, চর্বি, পাউরুটির গুঁড়ো প্রভৃতি। অনেক পরীক্ষার পর দেখা গেছে যে, প্লাস্টার অফ প্যারিসই হচ্ছে এ কাজের পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী। কোথাও পায়ের ছাপ পড়লে আগে নেওয়া হয় তার মাপ ও ফোটোগ্রাফ এবং তারপর প্লাস্টারের ছাঁচ তোলা হয়। বালি, কাদা, ধুলো ও তুষারের উপর থেকে রীতিমত নিখুঁত পদচিহ্নের ছাঁচ তোলা যায়। হালে পরীক্ষা পদ্ধতি এতটা উন্নত হয়েছে যে, আসবাবপত্তরে, সামান্য মিহি ধুলোয় বা চকচকে গৃহতলে বা যে-কোনও রকম কাগজে অস্পষ্ট পায়ের ছাপ পড়লেও তার ছাঁচ তোলা কঠিন হয় না।
পায়ের ছাপ যে পুলিশের কত কাজে লাগে তার একটা দৃষ্টান্ত দিই। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে বিলাতের একটি গ্রামে এক খুন হয়। মাঠের মাঝখানে একটি লোকের লাশ পাওয়া যায়– হত্যাকারী তার মাথা গুঁড়ো করে দিয়ে তার জিনিসপত্তর লুট করে অদৃশ্য হয়েছিল।
পাশেই খানিকটা তার দিয়ে ঘেরা জমি ছিল। সেই তারের বেড়ার জন্যে যে-সব কাঠের খুঁটি ব্যবহৃত হয়েছিল তার একটা খুঁজে পাওয়া গেল না। ওপড়ানো খুঁটির গর্তের পাশেই ছিল একটা জুতোসুদ্ধ পায়ের ছাপ। সেই ছাপটা মাটির ভিতরে খুব গম্ভীর হয়ে বসে গিয়েছিল।
পুলিশ অনুমান করলে যে, এই খুঁটিটা উপড়ে নিয়ে হত্যাকারী তার সাহায্যেই খুন করেছে। খুঁটিটা খুব জোরে টানাটানি করবার সময়েই তার পায়ের জুতো চেপে মাটির ভিতরে বসে গিয়েছে।
ছাপ পরীক্ষা করে দেখা গেল, খুনির পায়ে বুটজুতো এবং জুতোর তলায় ছিল বড় বড় পেরেক। একটা পেরেক আবার অসাধারণ ও আকারে অন্যগুলোর চেয়ে ঢের বড়। পুলিশ সেই ছাপের ছাঁচ তুলে রেখে দিলে।
ঘটনাস্থলের আশপাশে কড়া পাহারা বসল। এক রবিবার স্থানীয় গির্জা থেকে একটি যুবক বেরিয়ে এল, যার ভাবভঙ্গি সন্দেহজনক। পুলিশের লোক তার পিছু নিলে। পথে এক জায়গায় নরম মাটির উপর দিয়ে যাবার সময়ে, কাদায় তার জুতোর ছাপ পড়ল। তাতেও দেখা গেল একটা বড় আকারের অসাধারণ পেরেকের দাগ। যুবককে তখনি গ্রেপ্তার করে তার জুতোর ছাপের ছাঁচ নেওয়া হল। হত্যাকারীর জুতোর ছাপের ছাঁচের সঙ্গে অবিকল মিল হয়ে গেল! যুবক তখন অপরাধ স্বীকার করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড লাভ করলে।
রক্তের দাগ হচ্ছে পুলিশের পক্ষে খুনের কিনারা করবার আর এক উপায়। খুনি বলে যার উপরে সন্দেহ করবার কারণ থাকে, তার ঘরে যদি রক্তমাখা জামাকাপড়, অস্ত্র বা অন্য কোনও জিনিস পাওয়া যায়, তাহলে পুলিশের পক্ষে যারপরনাই সুবিধা হয়।
কিন্তু সেকালে খুনির কাপড়ে রক্তের দাগ থাকলে অনেক সময়ে পুলিশের কিছুই বলবার থাকত না। সেদিন পর্যন্ত অনেক আসল খুনিই নিজের জামা-কাপড়ের বা ব্যবহার্য অস্ত্রের উপরকার রক্ত পশু-পক্ষীর রক্ত বলে আইনকে কলা দেখাতে পেরেছে। কিন্তু আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এটা আর হবার যো নেই! এখন কোনও কিছুতে রক্ত লাগলে কিছুকাল পরেও পুলিশ বলে দিতে পারে যে, সে রক্ত মানুষের কি না? এমন কি, তা গোরু বা ভেড়া বা শূকর বা অন্য কোনও পশুর রক্ত কি না, তাও ধরতে পারা যায়। কারণ, মানুষের এবং অন্যান্য পশুর রক্তাণু বা অণুকোষের corpuscles মধ্যে নিজস্ব বিশেষত্ব আছে। এমনকী, রক্তের বিশেষত্ব অনুসারে মানুষদেরও এখন নানা শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। কাপড়ে রক্তের দাগ দেখলে তা বিশেষ কোনও মানুষের রক্ত বলে এখনও প্রমাণিত করা যায় বটে, কিন্তু বিশেষ এক শ্রেণির মানুষের রক্ত বলে অনায়াসে ধরা যায়।
জয়ন্তের কীর্তির মধ্যে অপরাধীদের ফোটোগ্রাফের সাহায্যে আখ্যানবস্তুকে অধিকতর জোরালো করে তোলা হয়েছে। এই ফোটোগ্রাফির আবিষ্কার কেবল সাধারণ মানুষকে উপকৃত করেনি, পুলিশের কাজ অনেকদিক দিয়েই যথেষ্ট সহজ করে এনেছে। ধরতে গেলে আঙুলের ছাপ ছাড়া ফোটোগ্রাফির মতো আর কোনও আবিষ্কারই পুলিশকে এত বেশি সাহায্য করেনি।
সকলেই হয়তো জানেন যে, অপরাধীরা প্রায়ই পেশাদার হয়, অর্থাৎ অপরাধই হয় তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। কাজেই প্রত্যেক পেশাদার অপরাধীই জীবনে অনেকবার আইনভঙ্গ করে।
