তারপর, এই উপন্যাসের মধ্যে অপরাধীরা যেসব নতুন উপায় অবলম্বন করেছে এবং জয়ন্ত যেসব পদ্ধতিতে সেইসব অপরাধ আবিষ্কার করেছে, তাও আধুনিক অপরাধ বিজ্ঞানসম্মত। এদেশে ওরকম বৈজ্ঞানিক অপরাধী ও বৈজ্ঞানিক ডিটেকটিভ এখনও আত্মপ্রকাশ করেনি বটে, কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকায় তারা যথেষ্ট সুলভ।
বৈজ্ঞানিক চোর, ডাকাত ও খুনেদের জ্বালায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পাশ্চাত্য পুলিশও এখন বিজ্ঞানের সাহায্য না নিয়ে পারে না। কথাসাহিত্যে বিখ্যাত গোয়েন্দা শার্লক হোমস্ অল্পবিস্তর বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়েছেন, কিন্তু পাশ্চাত্য পুলিশ তার চেয়েও ঢের-বেশি অগ্রসর হয়ে প্রমাণিত করেছে, বাস্তব জীবনের সত্য উপন্যাসের চেয়েও অধিকতর বিস্ময়কর।
ইউরোপে এখন চারিটি দেশের পুলিশ সবচেয়ে বিখ্যাত। এই চারিটি দেশ হচ্ছে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স ও ইংলন্ড। আজকাল সব দেশেরই পুলিশ কমবেশি বিজ্ঞানের সাহায্য নেয় বটে, কিন্তু বিশেষ করে অস্ট্রিয়ার পুলিশকে বিজ্ঞানের দাস বললেও চলে। অস্ট্রিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানে সুপণ্ডিত অধ্যাপকরা আপন আপন রসায়ন-পরীক্ষাগারে বসেই অনেক সময়ে পুলিশকে আশ্চর্যরূপে সাহায্য করে অপরাধী গ্রেপ্তার করবার উপায় বাতলে দেন! একবার পুলিশের সাহায্যকারী এক বৈজ্ঞানিক অধ্যাপক ঘটনাস্থলে হাজির না থেকেও আপন পরীক্ষাগারে বসে এমন অভাবিত উপায়ে একটি রহস্যময় আত্মহত্যার কিনারা করে দেন যে, ঔপন্যাসিক কন্যান ডইল সাহেব তার শার্লক হোমসের কীর্তি কাহিনির মধ্যে পাত্র-পাত্রীর নাম বদলে সেই ঘটনাটিকে অবিকল বর্ণনা করেছিলেন।
দুজন মানুষের হাতের আঙুলের ছাপ এরকম হয় না–এই মস্ত আবিষ্কার হয় প্রথমে বঙ্গদেশের পুলিশ কমিশনার স্যার উইলিয়ম হার্শেলের দ্বারা ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে। তারপর ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখানে অপরাধীদের টিপসই নেওয়ার প্রথা প্রচলিত হয়। (কিন্তু তার আগেও চিনারাও আঙুলের টিপ-রহস্য জানত, যদিও অপরাধী ধরবার জন্যে তারা কখনও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করত না)। এই প্রথা যখন পাশ্চাত্য দেশেও অবলম্বিত হয়, তখন সেখানকার অপরাধীদের মধ্যে দস্তুরমতো বিভীষিকার সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ ঘটনাস্থলে গিয়ে অপরাধী কোনও কাচের জিনিসে হাত দিলেই আর রক্ষা নেই। কাচের উপরে অতি সহজেই আঙুলের দাগ পড়ে এবং পুলিশ অনায়াসেই সেই দাগের ফোটো তুলতে পারে। বিলাতী অপরাধীরা তখন হাতে দস্তানা পরে চুরি-ডাকাতি খুন করতে লাগল। তাতেও নিস্তার নেই। কারণ, দস্তানা ঘামে ভিজে গেলেই আবার সেই আঙুলের রেখার ছাপ পাওয়া যায়। তখন অপরাধ করবার পর অনেকে শিরীষ কাগজ দিয়ে ঘষে আঙুলের রেখা এমন ভাবে তুলে ফেলতে শুরু করল যে, আগেকার আঙুলের ছাপের সঙ্গে এখনকার ছাপ যাতে আর না মিলতে পারে! কিন্তু তাতেও বিশেষ সুবিধা হল না। কারণ, ঘষা আঙুলের আগেকার রেখা কিছুদিন পরে অবিকল ফুটে বেরোয়!
এই আঙুলের ছাপ এখন অপরাধী ধরবার একটা প্রধান উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে এখনও নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কৃত হচ্ছে। যে উপায়ে আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করা হয়, তাকে বলে লোকার্ডের পোরোস্কোপিক পদ্ধতি (Locards poroscopic method)। ফোটোমাইক্রোগ্রাফির (photomicrography) সাহায্যে ওই পদ্ধতিটি অধিকতর ফলপ্রদ হয়েছে। ফোটোমাইক্রোগ্রাফির দ্বারা আঙুলের খুব ছোট্ট রেখাগুলোর প্রকাণ্ড ছবি তুলতে পারা যায়। এই আঙুলের ছাপ বিচার করবার জন্যে যে রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়, তা micro-chemical examination নামে বিখ্যাত।
সাহিত্যে খুব প্রাচীন একটি ডিটেকটিভের গল্প, পাওয়া যায় বাইবেলে।
বেল ছিলেন বাবিলনের দেবতা। তার পূজার ও সেবার জন্যে রাজা অনেক রকম খাবার সাজিয়ে নৈবেদ্য পাঠাতেন। রাত্রে মন্দিরের দরজা বাহির থেকে বন্ধ করা হত। কিন্তু সকালে উঠে দেখা যেত কী আশ্চর্য! পাথরের দেবতা বেল জ্যান্ত হয়ে সব খাবার খেয়ে ফেলেছেন!
দেবতার শক্তি দেখে বেলের মূর্তির প্রতি রাজার ভক্তি শ্রদ্ধার সীমা নেই। তার ফলে দেব-মন্দিরের পুরোহিত-সম্প্রদায়ের প্রভাব, প্রতিপত্তি ও লাভের অঙ্ক বেড়ে উঠল রীতিমতো।
দানিয়েল ছিলেন চালাক লোক। তিনি জানতেন, পাথুরে দেবতা বেলের পেটের ভিতরটাও নিরেট পাথরে ভর্তি হয়ে আছে, রাশি রাশি মিষ্টান্ন, ফল ও মাংস খাবার লোভে সে পেট কখনও ফাঁপা হতে পারে না।
অতএব একদিন তিনি বললেন, মহারাজ, এসব হচ্ছে জোচ্চুরি আর ধাপ্পাবাজি! বেল এ-সব খাবার খান না!
মহারাজা বললেন, কী যে বলো তার ঠিক নেই। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, রাত্রে মন্দিরের দরজা বাহির থেকে বন্ধ থাকে। মন্দিরের ভিতরে জনপ্রাণী থাকে না, তবু খাবার কোথায় উড়ে যায়?
দানিয়েল বললেন, আচ্ছা মহারাজ, কাল সকালেই আপনাকে দেখাব, বেল খাবার খান না।
সে রাত্রেও ষোড়শোপচারে বেল-দেবকে ভোগ দেওয়া হল।
তারপর দানিয়েল এসে প্রথমে মন্দিরের মেঝের উপরে সর্বত্র ভালো করে ছাই ছড়িয়ে দিলেন এবং তারপর মন্দিরের দরজা বাহির থেকে বন্ধ করে চলে গেলেন!
সকালবেলায় মহারাজা মন্দিরে এলেন দানিয়েলকে সঙ্গে করে। দরজা খোলা হল। মন্দিরের ভিতরে ঢুকে দেখা গেল, সমস্ত নৈবেদ্যের থালা একেবারে খালি!
মহারাজ দেবমূর্তির দিকে তাকিয়ে ভক্তিভরে গদগদ স্বরে বললেন, হে প্রভু, হে বেল, তোমার অসীম মহিমা! সত্যই তুমি জাগ্রত দেবতা!
