আমার তো বিশ্বাস, তাই!
মানিক শিউরে উঠে বললে, কী ভয়ানক! ভবতোষ কি তার বন্ধুদের ঘুমন্ত দেহ আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করতে চায়?
জয়ন্ত বললে, তা ছাড়া তার পক্ষে উপায় কি? ওই দেহগুলোই যে এখন তার বিরুদ্ধে প্রধান সাক্ষী!
কথা কইতে কইতে জয়ন্ত বরাবরই অগ্নিময় বাড়িখানার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিল। হঠাৎ সে ব্যস্ত স্বরে বললে, মানিক, দূরবিন দিয়ে দেখো তো, কে একটা লোক মোটরবোটের ভিতর থেকে বেরিয়ে আবার ওই বাগানবাড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছে?
মানিক দেখেই উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, ওই তো ভবতোষ!
জয়ন্ত বললে, শীগগির ওইখানে চলো। ভবতোষ বাড়িতে আগুন লাগিয়ে আবার চম্পট দিচ্ছিল। কিন্তু এবারেও পালাতে পারল না, চলো, চলো!
পুলিশের লঞ্চ ও মোটরবোট তিরবেগে তীরের দিকে চলল।
মানিক বললে, বাতাসে কী পেট্রলের গন্ধ!
জয়ন্ত বললে, পেট্রল ঢেলেই ওই আগুন সৃষ্টি করা হয়েছে!
সুন্দরবাবু ভয়ঙ্কর চিৎকার করে বললেন, সেপাইরা, শোনো! বন্দুকে গুলি ভরে নাও! ওই বাগানবাড়ির চারিদিক ঘেরাও করো! ওখান থেকে একটা মাছি বেরুলেও গুলি করে মেরে ফেলবে।
মানিক হেসে বললে, সুন্দরবাবু, আপনার ভুল হল যে! মাছি মারবার জন্যে তো জন্মায় খালি কেরানিরাই। মাছি মারবার জন্যে বন্দুক তৈরি হয় না!
সুন্দরবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, এমন সময়ে ওরকম ঠাট্টা আমি পছন্দ করি না মানিক। হুম, উনি এলেন আবার কথার ছল ধরতে।
লঞ্চ ও বোট তীরে গিয়ে লাগল। বন্দুকধারী পুলিশ থেকে তখন সেখানকার জনতা আরও বেড়ে উঠেছে সকলেরই মুখে নতুন বিস্ময় ও কৌতূহল, অগ্নিকাণ্ডের দিকে তখন আর কারুরই দৃষ্টি নেই।
সুন্দরবাবু এত চটপট বোট থেকে লাফিয়ে পড়ে বাগানবাড়ির দিকে ছুটে গেলেন যে, দেখলে সন্দেহ হয় না, তার দেহের মাঝখানে মস্ত-ভারী একটা দোদুল্যমান ভূঁড়ি বলে কোনও নিরেট উপসর্গ আছে!
অগ্নিদেবের নৃত্যোৎসব চলেছে তখনও পূর্ণ উদ্যমে। তার চিৎকারও তেমনি নিষ্ঠুর ও প্রচণ্ড! রক্তের আভায় চারিদিক লাল হয়ে উঠেছে, কুণ্ডলী-পাকানো ধুমে নিশ্বাস রুদ্ধ ও দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে, জ্বালাকর উত্তাপে তার কাছে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব।
কেবল পেট্রলের নয়, আর একটা ভয়াবহ দুর্গন্ধে বাতাস যেন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।
অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে মানিকের দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত অভিভূত স্বরে বলল, মানিক, শ্মশানের শবদাহের গন্ধ! কতগুলো জীবন্ত দেহ আজ ওইখানে পুড়ে ছাই হচ্ছে, কে তা জানে?
মানিক কিছু বলতে পারলে না, তার প্রাণ তখন যেন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। মনে মনে সে ভাবলে, ওরা পাপ করেছিল বলেই ওদের এমন শোচনীয় পরিণাম হল–কিন্তু পাপীর হাতেই পাপীর কি ভয়ানক শাস্তি! জীবন্ত পুড়লেও অচেতন ওরা যে সে যন্ত্রণা ভোগ করছে না, এইটুকুই যা সান্ত্বনার কথা।
আচম্বিতে সেই অগ্নিময় বাড়ির ভিতর থেকে একটা মূর্তি টলতে টলতে বাইরে বেরিয়ে এল। তার জামা কাপড়ে আগুন জ্বলছে।
সে ভবতোষ, আগুন তাকে বাড়ির ভিতর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
আগুনের উত্তাপকে গ্রাহ্য না করে সুন্দরবাবু দ্রুতপদে তার দিকে অগ্রসর হলেন।
উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি তুলে বজ্রকঠিন কণ্ঠে ভবতোষ বললে, যদি বাঁচতে চাও, আমার পথ থেকে সরে দাঁড়াও!
সুন্দরবাবু তবু এগুতে লাগলেন।
ভবতোষ গর্জন করে কি একটা জিনিস ছুড়লে।
জিনিসটা সুন্দরবাবুর কাছ থেকে খানিক তফাতে এসে মাটির উপরে পড়ে বিষম শব্দে ফেটে গেল এবং পুঞ্জ পুঞ্জ ধোঁয়ার ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল সুন্দরবাবুর দেহ!
জয়ন্ত উদ্বিগ্ন স্বরে বলে উঠল, বোমা, বোমা! ভবতোষ বোমা ছুঁড়েছে!
সকলে ছুটে গিয়ে দেখলে, রক্তাক্ত দেহে সুন্দরবাবু মাটির উপরে বসে আছেন!
কর্কশ কণ্ঠে ভবতোষ বললে, এখনও সরে যাও, নইলে আবার আমি বোমা ছুড়ব!
আহত সুন্দরবাবু হঠাৎ পাশের সেপাইয়ের হাত থেকে বন্দুকটা ছিনিয়ে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বললেন, প্রাণ থাকতে আমি এখান থেকে নড়ব না!
ভবতোষ শুষ্ক, নিষ্ঠুর অট্টহাস্য করে বললে, আমি তো মরবই, তবে তোরা বেঁচে থাকতে নয়! বলেই সে আবার বোমাসুদ্ধ হাত তুললে।
কিন্তু চোখের পলক পড়বার আগেই সুন্দরবাবুর বন্দুক গর্জন করে উঠল।
শূন্যে দুই বাহু ছড়িয়ে ভবতোষ ঘুরে মাটির উপর পড়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের বোমাটা ফেটে গিয়ে রাশিকৃত ধোঁয়ার আড়ালে তাকে একেবারে ঢেকে দিলে।
সেপাইরা যখন ছুটে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল তখন দেখলে, নিজেরই বোমার আঘাতে ভবতোষের কলঙ্কিত দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে!
জয়ন্ত চমৎকৃত গাঢ় স্বরে বললে, সুন্দরবাবু, এতদিনেও আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। আপনার বীরত্ব আমার মাথা আজ শ্রদ্ধায় নত করে দিয়েছে!
দেহের রক্ত মুছতে মুছতে সুন্দরবাবু হাসিমুখে বললেন, হুম!
.
পরিশিষ্ট
যাঁরা জয়ন্তের কীতি শেষ পর্যন্ত পড়বেন, তাঁরা যে খালি গল্পের জন্যই পড়বেন, এ কথা জানি। কিন্তু জয়ন্তের কীতির মধ্যে গল্প ছাড়াও আর একটি যা লক্ষ করবার বিষয় আছে তা হচ্ছে এই : এটি হচ্ছে আধুনিক বৈজ্ঞানিকের অপরাধের কাহিনি এবং বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণরূপে নতুন। এর আখ্যানবস্তু কাল্পনিক হলেও কতকগুলি সত্য তথ্য ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের উপর নির্ভর করেই তা কল্পনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে মানুষের দেহকে জিইয়ে রেখে তাকে যে মৃত্যু ও বার্ধক্যের কবল থেকে রক্ষা করা যেতে পারে, প্রথম দৃষ্টিতে এটা ঔপন্যাসিকের অসম্ভব কল্পনা বলে মনে হতে পারে বটে, কিন্তু আসলে বহু পরীক্ষার পর আধুনিক পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকরা ওই অভাবনীয় বিস্ময়কর ও চমকপ্রদ সিদ্ধান্তে উপস্থিত হয়েছেন, অবশ্য, কি এদেশে ও কি পাশ্চাত্য দেশে, ওই বিচিত্র তথ্য বা আবিষ্কার নিয়ে আজ পর্যন্ত উপন্যাস লেখবার কল্পনা আর কোনও লেখক করেছেন বলে জানি না।
