সুন্দরবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আর আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকা উচিত নয়। এখনি পোর্ট-পুলিশের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে ফেলব–তাদের লঞ্চে উঠে সদলবলে সেই বজরা আর ভবতোষকে গ্রেপ্তার করব।
মানিক বললে, তাদের বজরা কি আর সেখানে আছে?
জয়ন্ত বললে, বজরাখানা তারা যদি ডুবিয়ে দিয়ে না থাকে, তাহলে গঙ্গার যেখানেই হোক, তাকে আবার পাওয়া যাবে।
সুন্দরবাবু বললেন, চলো চলো, আর দেরি নয়! এমন আশ্চর্য আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারলে আমার সুনাম আর উন্নতির সীমা থাকবে না।
.
সুন্দরবাবুর বীরত্ব
একখানা লঞ্চ ও একখানা মোটরবোট সশব্দে গঙ্গার জল কেটে হু-হু করে ছুটে চলেছে। বোটে আছে জয়ন্ত, মানিক ও সুন্দরবাবু প্রভৃতি এবং লঞ্চে আছে একদল পুলিশের লোক।
গঙ্গার আর্তনাদে ভ্রূক্ষেপ না করে দু-ধারে ফেনার মালা দোলাতে দোলাতে লঞ্চ ও বোট যখন সাগ্রহে ঘুষুড়ির কাছে গিয়ে হাজির হল তখন ভবতোষের বজরার চিহ্নটুকু পর্যন্ত দেখা গেল না!
এটা সকলেই আশা করেছিল। যে ভবতোষ ধারণাতীত শয়তানি চক্রান্তে অদ্বিতীয়, সে যে বোকার মতন এত সহজে ধরা দেবে, এটা কেহ-ই মনে করেনি।
সুন্দরবাবু বললেন, বজরা আর মোটর-বোট তো ডাঙা দিয়ে হাঁটে না, তাদের জলের ওপরে কোথাও না কোথাও থাকতেই হবে।
জয়ন্ত বললে, জলের ওপরে না থেকে তারা যদি জলের ভেতরে থাকে? কে বলতে পারে, তাদের ডুবিয়ে দেওয়া হয়নি?…আচ্ছা, খোঁজ নিয়ে দেখা যাক।
খোঁজ পেতে বেশি দেরি হল না। উত্তরদিক থেকে যেসব নৌকা আসছিল, তাদের একখানার ভিতর থেকে খবর পাওয়া গেল, ত্রিবেণীর খানিক আগে তারা মোটরবোটের পিছনে একখানা বজরাকে যেতে দেখেছে।
জয়ন্ত বললে, মানিক, তুমি বোধহয় ভোলোনি যে, ত্রিবেণীতে ভবতোষের একখানা বাগানবাড়ি আছে?
সুন্দরবাবু প্রচণ্ড রোখে বলে উঠলেন, ত্রিবেণী, ত্রিবেণী। চলো সবাই ত্রিবেণীর দিকে! মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন! হুম!
লঞ্চের ও বোটের গতি দ্বিগুণ বাড়ল, তবু সুন্দরবাবু তুষ্ট নন! মহাবিরক্ত স্বরে বার বার তিনি বলতে লাগলেন, তোমাদের মড়াখেকো লঞ্চ দৌড়ে কচ্ছপকেও হারাতে পারবে না! আরও জোরে–আরও জোরে! হুম, আমরা হাওয়া খেতে যাচ্ছি না, লড়াই করতে যাচ্ছি?
মানিক চোখে দূরবিন লাগিয়ে বসেছিল। সে হঠাৎ বলে উঠল, একখানা মোটরবোট এদিকে আসছিল। হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে সেখানা, আবার তিরের মতো উত্তরদিকে চলে গেল!
জয়ন্ত বললে, ব্যাপারটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। বলরাম আর হাবসিটার দেহ লুকিয়ে ফেলে ভবতোষ নিশ্চয়ই পালাবার ফিকিরে ছিল। আমাদের দেখে আবার ফিরে গেল।
সুন্দরবাবু আরও উত্তেজিত হয়ে দুহাতে মাথার চুল টানতে টানতে বললেন, আমরা মোটরবোটে যাচ্ছি, না গাধা-বোটে যাচ্ছি? আমরা লন্ডনে যাচ্ছি, না, ত্রিবেণীতে যাচ্ছি? এ জীবনে কি সেখানে গিয়ে পৌঁছোতে পারব?
লঞ্চ ওবোট ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে–এত জোরে তারা বোধহয় আর কোনওদিন ছোটেনি। বালি-ব্রিজ, ডাইনে দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি, বাঁয়ে বেলুড় ও উত্তরপাড়া পিছনে পড়ে আছে, দু-ধারে আকাশের ভাঙা থামের মতো কলের চিমনিগুলোও তাড়াতাড়ি পিছনে চলে যাচ্ছে এবং গঙ্গার পানসি ও অন্যান্য নৌকোগুলো তাদের উন্মত্ত গতি দেখে এস্ত হয়ে পথ ছেড়ে দিচ্ছে।
সুন্দরবাবু বললেন, ওরে, কেউ আমাকে দুখানা ডানা দে না রে! তাহলে আমি এখনি বাজপাখির মতো ভবতোষের ঘাড়ে গিয়ে ছোঁ মারি!
মানিক চোখ থেকে দূরবিন নামিয়ে বললে, ত্রিবেণীর কাছেই আমরা এসে পড়েছি। কিন্তু আকাশের গায়ে ও আগুনের শিখা কীসের?
জয়ন্ত দূরবিনটা মানিকের হাত থেকে নিয়ে নিজের চোখে লাগিয়ে বললে, হুঁ। ওখানে কোথাও আগুন লেগেছে। ত্রিবেণীও তো ওইখানেই।
অল্পক্ষণ পরেই দেখা গেল, গঙ্গার ঠিক ধারেই একখানা বাড়ি অগ্নির কবলে পড়ে দাউ দাউ করে জ্বলছে! টকটকে লাল শত শত সাপের মতো আঁকাবাঁকা ক্ষুধার্ত ভঙ্গিতে অগ্নিশিখারা ক্রমাগত আকাশকে ছোবল মারবার জন্যে নিষ্ফল চেষ্টা করছে, গঙ্গার তীরে কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়ে আছে, অনেকে ব্যস্তভাবে ছুটাছুটি করছে, তাদের সম্মিলিত কণ্ঠের হই-হই রবে, ভীত পশুপক্ষীদের আর্তনাদে ও অগ্নির প্রচণ্ড গর্জনে চতুর্দিক পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে!
জয়ন্ত হঠাৎ চেঁচিয়ে বলে উঠল, ভাই সব! যেখানে আগুন লেগেছে ওইখানে চলো!
সুন্দরবাবু তার চেয়েও জোরে চেঁচিয়ে বললেন, খবরদার, সিধে চলো। আমার মাথার ভেতরে এখন আগুন জ্বলছে, ও বাজে আগুন দেখবার শখে আর কাজ নেই!
জয়ন্ত বললে, কী মুশকিল! দেখছেন না, যে বাড়িতে আগুন লেগেছে তার সামনের ঘাটেই একখানা বজরা আর মোটরবোট বাঁধা রয়েছে? এই তো ত্রিবেণী। আর আগুন লেগেছে নিশ্চয়ই ভবতোষের বাগানবাড়িতেই!
সুন্দরবাবু পরম বিস্ময়ে মুখব্যাদান করে বললেন, অ্যাঁ!
জয়ন্ত বললে, খুব সম্ভব, আমরা আসছি দেখে ভবতোষ বুঝে নিয়েছে, তার লীলাখেলার দিন ফুরিয়েছে। সে পালাবার চেষ্টায় ছিল, কিন্তু পথ বন্ধ দেখে আবার এখানে ফিরে এসে নিজের বাড়িতেই আগুন লাগিয়ে দিয়েছে!
সুন্দরবাবু বললেন, হুম! কেন?
জয়ন্ত বললে, তার বিরুদ্ধে যেসব প্রমাণ আছে সেগুলো নষ্ট করে ফেলবে বলে। এই বাগানবাড়িতেই বোধহয় তার প্রধান আড্ডা।
মানিক বললে, তুমি কি বলতে চাও যে, এই বাড়িতেই ভবতোষের পাপসঙ্গীদের অচেতন দেহগুলো গুদামজাত করা আছে?
