জয়ন্ত বললে, আমার বক্তৃতার আর অল্পই বাকি আছে, আপনি আর একটু ধৈর্য ধরে শুনুন!
এতক্ষণ আমি এই কথাই বোঝাতে চাইছি যে, ঠিকভাবে রাখতে পারলে কোনও সজীব পদার্থই মরে না–অন্তত প্রায় অমর হতে পারে।
দেহের ভিতরে নতুন ও সতেজ রস সঞ্চার করে বৈজ্ঞানিকরা মানুষকে সহজে বুড়ো হতে দেন না। যতদিন না মানুষ বুড়ো হয় ততদিন মৃত্যু তার কাছে আসে না।
উদ্ভিদ নিম্নশ্রেণির সজীব পদার্থ। হাজার হাজার বৎসর পরেও সে যদি আবার ঘুমন্ত থেকে পূর্ণজীবনের লক্ষণ নিয়ে বেঁচে উঠতে পারে, তবে তার চেয়ে উচ্চশ্রেণির জীব মানুষেরও পক্ষে তা সম্ভবপর হবে না কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর পাই আমেরিকার রকফেলার ইনস্টিটিউটের ডা. আলেক্সিস ক্যারেলের কাছ থেকে। সুন্দরবাবু, আপনি ক্যারেল সাহেবের নাম শুনেছেন?
সুন্দরবাবু প্রচণ্ড মাথা নাড়া দিয়ে বলে উঠলেন, ওসব বাজে লোকের নাম আমি শুনতে চাই না। তোমাদের মতো আমারও মাথা খারাপ নয়!
জয়ন্ত হেসে বললে, সুন্দরবাবু, ক্যারেল সাহেব বাজে লোক নন, তার নাম আজ পৃথিবীজোড়া। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন।
সুন্দরবাবু বললেন, নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। তাহলে ক্যারেল সাহেব বাজে লোক নন!
জয়ন্ত বললে, আপনার সার্টিফিকেট পেয়ে ক্যারেল সাহেব ধন্য হলেন। এই ক্যারেল সাহেব কি বলেন জানেন? তাঁর মতে, মৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে উদ্ধার করা অসম্ভব নয়। মানুষের দেহকে মাঝে মাঝে ঘুম পাড়িয়ে যদি দীর্ঘকালের জন্যে গুদামজাত করে রাখা হয় এবং মাঝে মাঝে তাকে যদি গুদাম থেকে বার করে আবার লীলাখেলা করতে দেওয়া হয়, মানুষও তাহলে শত শত বৎসর বাঁচতে পারে।
সুন্দরবাবু বললেন, হুম! হতে পারে তোমাদের ক্যারেল সাহেব নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, হতে পারে তিনি বাজে লোক নন, কিন্তু ওকথা আমি বিশ্বাস করি না।
জয়ন্ত বললে, কেন বিশ্বাস করেন না? প্রাণের লক্ষণ না থাকলেও মানুষের দেহ যে নষ্ট হয় না, এর তো প্রমাণ আছে। আপনি সমাধির কথা শুনেছেন তো? কোনও কোনও যোগীর সমাধিস্থ দেহ এই আধুনিক কালেও মাটির তলায় কবর দেওয়া হয়েছে। প্রায় চল্লিশ দিন পরে মাটি খুঁড়ে সেই মৃতবৎ দেহ উপরে তোলা হয়েছে, তখন তার মধ্যে আবার পূর্ণজীবন ফিরে এসেছে।
সুন্দরবাবু বললেন, হ্যাঁ, একথা আমি শুনেছি বটে!
জয়ন্ত বললে, তবে গুদামজাত করলে মানুষের দেহ নষ্ট হবে কেন? অবশ্য, দেহকে এখানে যোগবলে ঘুম পাড়ানো হবে না–বৈজ্ঞানিকরা রসায়ন-বিদ্যা বা অন্যকিছুর সাহায্য নেবেন। ক্যারেল সাহেব বলেন, মানুষের দেহে ক্ষয়ের লক্ষণ প্রকাশ পেলেই তাকে যদি ঘুম পাড়িয়ে গুদামে তুলে ফেলা হয়, তাহলে অনেককাল পরেও তাকে জাগালে সে আবার তাজা আর সবলরূপেই জেগে উঠবে–যেমন নতুন জীবন পায় রজনীগন্ধা,–যেমন নতুন জীবন পেয়েছে কেপটারেফ সাহেবের দ্বারা আবিষ্কৃত হাজার হাজার বৎসর আগেকার উদ্ভিদ।
মানিক এতক্ষণ নীরবে একাগ্রভাবে জয়ন্তের কথা শুনছিল, এইবারে সে মৌনব্রত ভঙ্গ করে একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে উচ্ছ্বসিত স্বরে বললে, জয়, জয়! এতক্ষণ পরে আমি তোমার বক্তৃতার অর্থ বুঝেছি! তুমি তো এই কথাই বলতে চাও যে, ভবতোষও কোনওরকম রাসায়নিক ঔষধের গুণে মানুষের দেহকে ঘুম পাড়িয়ে গুদামজাত করে ফেলতে শিখেছে?
জয়ন্ত ঘাড় নেড়ে বললে, হা!
সুন্দরবাবু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, হুম! জয়ন্ত, তুমি বরং বাঁশি বাজিও আমি সহ্য করব। তোমার আজকের পাগলামি সহ্য করা অসম্ভব। হচ্ছিল ক্যারেল সাহেবের কথা, কিন্তু তার মধ্যেও ভবতোষ? ভবতোষ ভবতোষ করেই তুমি খেপে গেলে দেখছি!
জয়ন্ত বললে, আপনার সঙ্গে আপাতত আমি আর বকতে পারব না, আগে এক পেয়ালা চা খেয়ে গলা ভিজিয়ে আসি। মানিক, আজকে বজরার গিয়ে আমরা যে দৃশ্য দেখেছি, ততক্ষণ তুমি সুন্দরবাবুর কাছে তা বর্ণনা করো।–এই বলে সে বেরিয়ে গেল।
.
ঘরের ভিতরে পুনঃপ্রবেশ করে জয়ন্ত দেখলে, ভয়ঙ্কর বিস্ময়ে প্রকাণ্ড হাঁ করে সুন্দরবাবু স্তম্ভিতের মতন বসে আছেন। জয়ন্তকে দেখে মুখ বুজেই আবার খুলে ফেলে তিনি বলে উঠলেন, এতক্ষণে তোমার লেকচারের মানে বুঝলুম। কিন্তু, এও কি সম্ভব? আর ভবতোষের এমন অদ্ভুত উপায় অবলম্বন করবার কারণই বা কি?
জয়ন্ত বললে, কারণ কি, বুঝছেন না? যেসব আসামি প্রাণদণ্ড বা গুরুতর শাস্তি পেয়েছে, ভবতোষের আশ্রয়ে তারা পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে নিরাপদে ঘুমিয়ে কিছুকাল কাটিয়ে দেয়। তারা আপত্তি করে না, কেন না মৃত্যুভয়ও নেই, পুলিশের ভয়ও নেই! বরং লাভ আছে, কেন না বুড়ো হবার ভয় নেই! এতে ভবতোষেরও দুরকম সুবিধা। প্রথমত, পাপকাজ হাসিল করবার জন্যে চুরি-জুয়াচুরি-জালিয়াতি-খুন-ডাকাতিতে একেবারে শিক্ষিত পাকা লোকের সাহায্য পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, পুলিশ যখন বেশি প্রমাণ পেয়ে বেশি গোলমাল করবে, তখন আসামিদের সরিয়ে ফেলে কফিনে পুরে গুদামজাত করলেই হবে। আসল আসামিদের না পেয়ে পুলিশ ভবতোষের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। বলরাম আর সেই হাবসিটা যে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সেটা আন্দাজ করতে পেরেই ভবতোষ নিজের আবিষ্কৃত অদ্ভুত উপায়ে কৃত্রিম মৃত্যুঘুমের সাহায্যে তাদের আবার সরিয়ে ফেলতে চায়। কোনও গুদামে কাচের কফিনে করে তাদের মৃতবৎ দেহ আপাতত সরিয়ে ফেলা হবে। পাঁচ-দশ বারো বৎসর পরে আমরা যখন তাদের কথা ভুলে যাব, তখন আবার হয়তো তাদের সজীব হবার পালা আসবে! দৈবক্রমে গুদামজাত করবার আগেই আমি সেই হাবসিটার আর বলরামের সমাধিস্থ দেহ দেখে ফেলেছি, তাই রক্ষা, নইলে এ বিষয়ে আমার পড়াশোনা থাকলেও কোনওকালেই আসল ব্যাপারটা হয়তো সন্দেহ করতে পারতুম না। এ যে অস্বাভাবিক কাণ্ড! বৈজ্ঞানিকরা চিরস্থায়ী মানবদেহের স্বপ্ন দেখেছেন বটে, কিন্তু কোনও অজানা মানুষ নিজের পাপ-ইচ্ছা পূর্ণ করবার জন্যে সেই স্বপ্নকে গোপনে এমনভাবে সত্য করে তুলেছে, আমিও এটা কল্পনা করতে পারতুম না! জানি না ভবতোষের গুদামে এমন আরও কত পাপী ফাঁসিকাঠকে ফঁকি দিয়ে আবার জাগবে বলে ঘুমিয়ে আছে। পুলিশ তাদের দেখলেও মড়া ছাড়া আর কিছু ভাববে না, ডাক্তারি পরীক্ষাও তাদের মড়া বলেই স্থির করবে, তাদের গুপ্তকথা জানে কেবল ভবতোষই, তাদের জাগাবার ঔযধও আছে কেবল তার হাতেই।
