ঘরের ভিতরে সুন্দরবাবুর আবির্ভাব হতেই জয়ন্ত বলে উঠল এই যে, আসতে আজ্ঞা হোক, এতক্ষণ আমরা আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছিলুম!..ওরে সুন্দরবাবুর জন্যে চা আর এ পোচ নিয়ে আয়!
সুন্দরবাবু দুই হাঁটু ফাঁক করে ভুড়ির জন্যে স্থান সংকুলান করে বসে পড়লেন। তারপর বললেন, হুম! আজ আমি চা আর এগ-পোচ খেতে এখানে আসিনি। তুমি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছ, সেই খুনি-ডাকাতদের সন্ধান দেবে বলে। আগে আমি তাদের চাই।
জয়ন্ত বললে, আজ্ঞে, তারা আমার বাড়িতে এখনও ভ্রমণ করতে আসেনি। তাদের নিমন্ত্রণ করবার জন্যে আমাদেরই যেতে হবে। কিন্তু তার আগে আপাতত আমি একটি বক্তৃতা দেব।
সুন্দরবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, বক্তৃতা? আমি কঁকা কথা চাই না, কাজ চাই। আমি কাজের মানুষ। হুম!
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার বক্তৃতায় স্বদেশোদ্ধারের কথা থাকবে না, কাজের কথাই থাকবে। আমার বক্তৃতা না শুনলে আপনি আসামি ধরতে পারবেন না।
সুন্দরবাবু নাচারভাবে বললেন, তবে দাও তোমার বক্তৃতা!
চা ও এগ-পোচ এল। জয়ন্ত তার বক্তৃতা শুরু করলে —
আপনারা কেউ জন্ম ও মৃত্যুর রহস্য নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন কিনা জানি না। করলে দেখতে পেতেন, মৃত্যু নিশ্চিত বটে, কিন্তু জীবনকে সুদীর্ঘস্থায়ী করা চলে।
মানুষের দেহ হচ্ছে মেশিনের মতো। মেশিনে কলকবজা বেশিদিনের ব্যবহারে খারাপ হয়ে যায়। তখন সেগুলোকে মেরামত করে নিলে মেশিন আবার সচল হয়।
মানুষের দেহে কলকবজা বিকল হয়ে গেলেও কি মেরামত করা চলে না? চিকিৎসা শাস্ত্রের সৃষ্টি দেহের কলকবজা মেরামত করবার জন্যেই। কিন্তু সাধারণ চিকিৎসকরা মেরামতি কাজ এখনও ভালো করে শিখতে পারেননি।
বৈজ্ঞানিক পণ্ডিতদের মতে, সমস্ত জীবন্ত পদার্থই ধরতে গেলে একরকম অমরই বটে। তরুণ জীবের দেহ থেকে টিসু বা বিধানতন্তু নিয়ে তুলে রেখে দিয়ে দেখা গেছে, তার ভিতরকার cell বা অণুকোষগুলি মরে না বরং দিনে দিনে বাড়তেই থাকে। অসম্পূর্ণ দেহের ত্রুটির জন্যেই মৃত্যু হয় এবং সেই জন্যেই tissue বা বিধানতন্তুও মারা পড়ে; নইলে তাদের প্রায় অমর বলা চলে।
মানুষ বুড়ো হয় কেন? তার দেহের ভিতরকর secretion বা সার বা রস শুকিয়ে যায় বলে। বৈজ্ঞানিক Steinach সাহেব অস্ত্রচিকিৎসার দ্বারা রসগ্রন্থি বা gland-এর বিধানতন্তুগুলি আবার কার্যক্ষম করার চেষ্টা করেছেন। Voronoff সাহেব বানরের বিধানতন্তু নিয়ে বুড়ো মানুষের দেহে ঢুকিয়ে তাকে আবার সরস ও তরুণ করে তুলতে চেয়েছেন এবং যথেষ্ট সুফলও পেয়েছেন। এই উপায়েই একেবারে শক্তিহীন, নুয়েপড়া বুড়ো ষাঁড়কে আবার তেজীয়ান যুবক করে তুলতে পারা গিয়েছে।
এইসব দৃষ্টান্ত দেখে বেশ বোঝা যায়, পৃথিবী থেকে মৃত্যুকে তাড়াতে না পারলেও, এবং একেবারে অমর হতে না পারলেও, যৌবন বজায় রেখে মানুষের পক্ষে কয়েক শত বৎসর বেঁচে থাকা হয়তো অসম্ভব নয়!
সুন্দরবাবু হাই তুলে বললেন, ওরে বাবা, আমরা কি মেডিকেল কলেজের মাস্টারমশায়ের লেকচার শুনছি? জয়ন্ত কত ঢং-ই জানে!
তাঁর কথায় কর্ণপাত না করেই জয়ন্ত বলতে লাগল–সুন্দরবাবু, আপনি রজনীগন্ধা গাছ দেখেছেন? জানেন তো তার মূলগুলো তুলে নিয়ে রোদে শুকিয়ে রাখলে তারা মরে? একরকম লিলিজাতের মূলও এইভাবে গুদামজাত করা চলে। পরের বৎসরে যথাসময়ে সেই মূলগুলো আবার মাটিতে পুঁতলে নতুন গাছে নতুন ফল দেখা যায়। এই জাতের আরও অনেকরকম গাছ আছে। তাদের জীবনীশক্তি অমর।
কিছুদিন আগে বিলাতের টাইমস পত্রে এই খবরটি বেরিয়েছে।
রুশিয়ায় লেনা নদীর মুখে লিরাখোব দ্বীপ। কেপটারেফ সাহেব সেখানে বরফের তলায় আদিম যুগের এমন একটি অরণ্য আবিষ্কার করেছেন, যা শিলীকৃত fossilized হয়নি। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, fossil বা শিলক বলতে বোঝায়, যা প্রায় পাথরে পরিণত হয়েছে। তার মধ্যে আর কোনও প্রাণশক্তি থাকে না। কিন্তু ওই অরণ্যের গাছপালা হাজার হাজার বছর পরেও তেমন জড়পদার্থ হয়ে পড়েনি। এইটুকুই লক্ষ্য করবার বিষয়।
গত ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে ওই কেপটারেফ সাহেব রুশিয়ার আর এক জায়গায় আর একটি নতুন আবিষ্কার করেছেন। কয়েকজন লোক সোনার খনি বার করবার জন্যে এক স্থানে ষোলো ফুট গভীর করে বরফ কেটেছিল। সেখানেও হাজার হাজার বৎসর আগেকার যেসব গাছপালা ও ঘাস পাওয়া গিয়েছে, তা শিলীকৃত হয়নি। ঘাসগুলো টাটকা ঘাসের মতোই নোয়াতে পারা গিয়েছে।
রুশিয়ার স্কোভেরোডিনো নামক স্থানে কেপটারেফ সাহেব তৃতীয় যে আবিষ্কার করেছেন, তা আরও আশ্চর্য। বারো ফুট গভীর তুষারস্থূপের তলায় পাওয়া গিয়েছে ঘাসের মতন একরকম উদ্ভিদ। নিশ্চয় সেখানে অনেক আগে বোদমাটির জলাভূমি ছিল, উদ্ভিদ হচ্ছে তারই অংশবিশেষ, কিন্তু শিলীকৃত হয়নি। পনেরো দিন পরে ওই কালো উদ্ভিদে ক্রমে সবুজ রং ধরতে লাগল। মাসকয়েক পরে তা শৈবালের আকার ধারণ করলে সামুদ্রিক শৈবাল! বরফের তলায় সুরক্ষিত ছিল বলে হাজার হাজার বৎসর পরেও উদ্ভিদের জীবনী শক্তি নষ্ট হয়ে যায়নি।
সুন্দরবাবু প্রায় আর্তনাদ করে বলে উঠলেন, হুম! থামো জয়ন্ত, থামো! আর আমার সহ্য হচ্ছে না! তুমি কি আমাকেও তোমাদের মতন পাগলা বলে ধরে নিয়েছ? হাজার হাজার বৎসর আগেকার শৈবালের গল্প আমি আর শুনতে চাই না। আসামির কথা কিছু জানো তো বলো, নইলে আমি থানায় চললুম।
