আবার মানিকের মনে সেই প্রশ্ন জাগল কিন্তু এরা হঠাৎ মরল কেন এবং কেমন করে? আর, এদের দেহ কফিনে কাচের কফিনে রাখা হয়েছে কেন? যদি ধরে নেওয়া যায়, নতুন কোনও জায়গায় ডাকাতি করতে গিয়ে বা হঠাৎ কোনও অসুখে এরা মারা পড়েছে। এবং ওই হাসিটা হয়তো মুসলমান বা ক্রিশ্চান বলেই তার দেহ কফিনে পোরা হয়েছে, কিন্তু বলরাম চৌধুরী? সে তো হিন্দু! তার দেহও কফিনে কেন? আবার যে সে কফিন নয়, কাচের কফিন! কাচের কফিনের কথা কেউ কি কখনও শুনেছে?
নিজেদের মারাত্মক বিপদের কথা ভুলে এই অদ্ভুত রহস্যের কথা ভাবতে-ভাবতে মানিকের মাথাটা যেন গুলিয়ে গেল! মৃতের মৃত্যু! চিরযুবক মানুষ! কাচের কফিন! এর পরেও পৃথিবীর কোনও মাথা না গুলিয়ে থাকতে পারে?
একটা শব্দে চমকে ফিরে মানিক সবিস্ময়ে দেখলে, বন্ধন, রজালের ভিতর থেকে জয়ন্ত ইতিমধ্যেই তার ডান-হাতখানা বার করে নিয়ে নিজের মুখের বাঁধনও খুলে ফেলেছে।
সে হতভম্বের মতো তাকিয়ে আছে দেখে, দড়ির ভিতর থেকে বাঁ-হাতখানা বার করতে করতে জয়ন্ত সহাস্যে বললে, মানিক, আমার এ বিদ্যার কথা জানো না বলে তুমি বোধ হয় অবাক হয়ে যাচ্ছ? কিন্তু এর মধ্যে অবাক হবার কিছু নেই। যারা মাসল-কন্ট্রোল করতে পারে, তাদের কাছে এটা ছেলেখেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। ওরা যখন আমাকে দড়ি দিয়ে বাঁধে, তখন আমি দেহের সমস্ত মাংসপেশি দ্বিগুণ ফুলিয়ে রেখেছিলুম। দেহ এখন আবার আলগা করে দিয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত বাঁধনও শিথিল হয়ে পড়েছে।..ব্যস, আমি এখন স্বাধীন। এসো, তোমার বাঁধনও খুলে দি।
জয়ন্ত মানিকের হাত-পা মুখ আবার খুলে দিলে এবং তারপর তাড়াতাড়ি উঠে কফিনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
মানিক বললে, জয়, এসব কি ভূতুড়ে ব্যাপার?
জয়ন্ত তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে কফিনদুটো পরীক্ষা করতে করতে বললে, চুপ, এখন বাজে কথা বোলো না! আমাকে একটু ভালো করে দেখতে আর ভাবতে দাও! আমাদের হাতে বেশি সময় নেই।
মিনিট পাঁচেক দেহদুটোর দিকে তাকিয়ে থেকে জয়ন্ত যেন নিজের মনেই অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল, হু, তুমি হচ্ছ সেই হাবসি বন্ধু, আর তুমি হচ্ছ আঙুল কাটা বলরাম চৌধুরী। তোমরা সেকেলে লোক, কিন্তু এখনও বুড়ো হওনি–যৌবন তোমাদের হাতে ধরা, তাই না? কিন্তু তোমরা আজ কুপোকাত কেন? তোমাদের দেহে কোনও অসুখ-বিসুখের চিহ্ন নেই, কোনও আঘাতেরও দাগ নেই, তবে তোমরা মরলে কেমন করে? কিন্তু তোমাদের দেহ দেখলে তো মনে হয় না যে, তোমরা পটল তুলেছ? মড়ার দেহ তো রক্তহীন হলদে হয়ে যায়, তোমাদের দেহ তো হয়নি? অথচ তোমাদের নিশ্বাস-প্রশ্বাসও বন্ধ। আর এই কাচের কফিনেই বা শুয়ে আছ কেন?…হঁ, জানি তোমরা কোনও জবাব দেবে না! তা জবাব যদি না দাও তো কী আর করা যাবে! হে বন্ধু, ভেবো না, তোমরা জবাব না দিলে আমি কিছুই বুঝতে পারব না। তোমাদের প্রভু ভবতোষ খুব বুদ্ধিমান ভীষণ ধড়িবাজ আর অসাধারণ মানুষই বটে, সৎপথে থাকলে সে আজ অমর হতে পারত। কিন্তু ভবতোষের সব রহস্য আমি বুঝে নিয়েছি–বুঝেছ হাবসি বন্ধু? বুঝেছ বলরাম চৌধুরী? আর কেউ আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না। ওঃ, মানিক, কি সুক্ষণেই আমরা আজ এই ঘরে বন্দি হয়েছিলুম। আনন্দে আমার অট্টহাস্য করতে সাধ হচ্ছে।
মানিক ব্যস্ত হয়ে বললে, না, না, তুমি অট্টহাস্য কোরো না জয়! এখনও আমরা বন্দি।…কিন্তু হঠাৎ তুমি আবার কি রহস্য আবিষ্কার করলে?
জয়ন্ত বললে, রহস্য বলে রহস্য? এমন রহস্যের কথা পৃথিবীর কেউ কখনও শোনেনি। এ হচ্ছে বৈজ্ঞানিক রহস্য। বিজ্ঞান যে স্বপ্ন দেখেছে, ভবতোষ তাকে সত্যে পরিণত করেছে। কিন্তু সে কথা এখানে গুছিয়ে বলবার সময় হবে না–ওই শোনো, গঙ্গার বুকে দূরে একখানা মোটরবোটের গর্জন শোনা যাচ্ছে!
মানিক কান পেতে শুনে বললে, হা! আমরা বন্দি হয়েছি খবর পেয়ে মোটরববাটে চড়ে ভবতোষ বোধ হয় আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসছে!
জয়ন্ত চারিদিকে তাকাতে-তাকাতে তাড়াতাড়ি বললে, দেখা করতে নয় মানিক, আমাদের জবাই করতে! যে রহস্য আমরা জানতে পেরেছি, ভবতোষ এর পরে আর এক মুহূর্তও আমাদের বাঁচতে দেবে না। আর এখন আমাদের মরাও অসম্ভব। ভবতোষ হচ্ছে শয়তান–মানুষ-দেহে শয়তান! আমাদের জীবনের উপরে এখন বাংলাদেশের মঙ্গল নির্ভর করছে–মানিক, তুমি জানো না, আমি কি সাংঘাতিক গুপ্তকথা জানতে পেরেছি।
মোটরবোটের শব্দ আরও কাছে এগিয়ে এল।
বজরার বন্ধ-দরজার বাইরে ব্যস্ত পায়ের শব্দ শোনা গেল।
কে একজন বললে, ওরে রামচরণ, শিগগির নেমে আয়। বড়বাবুর বোট আসছে!
জয়ন্ত বললে, হয়েছে! মানিক, ওইদিকের জানলাটা খুলে ফেলো! তারপর এসো, আমরা গঙ্গায় ঝাঁপ দি। এ ছাড়া আর উপায় নেই। কেউ বাধা দিলেই গুলি ছুঁড়বে! তারপর ডুবসাঁতার! কিন্তু ওরা নিশ্চিন্ত হয়ে আছে, বোধ হয় আমাদের পালানো দেখতে পাবে না!
জানালা খুলে আগে মানিক ও পরে জয়ন্ত প্রায়-নিঃশব্দে গঙ্গার জলে গিয়ে ডুব দিলে। বজরার সবাই বড়বাবুর মোটরবোটেরই অপেক্ষা করছে বন্দিদের বন্ধন-মুক্তি তারা কল্পনাও করতে পারেনি।
বড়বাবু যখন বজরার এসে উঠলেন, জয়ন্ত ও মানিক তখন অনেকদূরে।
.
ক্যারেল সাহেব বাজে লোক নন*
[*পাঠকরা যেন শুষ্ক ও নীরস বলে জয়ন্তের বক্তৃতার অংশ বাদ দিয়ে না যান। এই অংশে যা আছে, তা প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য, ওর প্রত্যেক লাইনটি মন দিয়ে না পড়লে এই উপন্যাসের কোনও সার্থকতাই থাকবে না। ইতি–লেখক।]
