আর তোমরা?
আমরা এখন নৌকোয় চড়ে গঙ্গায় বেড়াতে যাব। আমি বাঁশি বাজাব আর মানিক গান গাইবে। এসো মানিক!
জয়ন্ত ও মানিক তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল।
সুন্দরবাবু নিজের মনেই বললেন, হুম! বরাবরই জানি, ছোকরাদের মাথা খারাপ! ওরা কি যে বলে আর কি যে করে, কিছুই বোঝবার যো-নেই। আবার বলে গেল, হুকুম করলেই চা পাবেন! বাব্বাঃ! এ-বাড়িতে একলা খানিকক্ষণ থাকলে আর রক্ষে আছে!
.
আবার সেই আঙুল-কাটা বলরাম চৌধুরী
জয়ন্ত ও মানিক আজকেও একখানা পানসিতে চড়ে ওপারে ঘুষুড়ির দিকে চলল। দুর থেকেই দেখা গেল, সেই পরিচিত বাহারি বজরাখানা গঙ্গার উপরে ভাসছে এবং তার সঙ্গে রয়েছে একখানা মোটরবোট।
মানিক জিজ্ঞাসা করলে, সেদিন এই বজরা দেখতে এসেই আমরা বিপদে পড়েছিলুম। আবার আজ
জয়ন্ত তার মুখের কথা কেড়ে নিয়েই বললে, আবার আজ এই বজরা দেখতে গিয়েও আমরা বিপদে পড়তে পারি। তবু আমি ওখানে যাব।
কেন?
সেদিন ওই বজরাতে উঠেছিলুম বলেই আসল অপরাধীকে চেনবার উপায় হয়েছিল। আবার দেখতে চাই নতুন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় কি না!
কোন অছিলায় বজরায় গিয়ে উঠবে?
বলব, বজরাখানা খুব ভালো লেগেছে, তাই আবার দেখতে এসেছি। কিংবা অন্য কোনও ছুতো!
ভবতোষ বিশ্বাস করবে কেন?
বিশ্বাস না করুক, বাইরে মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারবে না। খুব সম্ভব, আমাদের সন্দেহ দূর করবার জন্যে এবারে সে আর কোনও গোলমাল করবে না। আর গোলমাল যদি করেই, বিপদে যদি পড়ি, তাহলে আমরাও প্রস্তুত। এসব কাজে সিদ্ধি লাভ হয় কেবল বিপদ আপদের মাঝখান দিয়েই।…এই যে, আমরা বজরার কাছে এসে পড়েছি! মানিক, হুঁশিয়ার থাকো, চোখ-কান সজাগ রাখো।
বজরার উপরে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক। সে একদৃষ্টিতে পানসির গতিবিধি লক্ষ করছিল।
পানসিখানা বজরার গায়ে গিয়ে লাগল। জয়ন্ত শুধোলে, ভবতোষবাবু আছেন?
আছেন।
আমরা তার সঙ্গে একবার দেখা করব।
ওপরে আসুন।
জয়ন্ত ও মানিক বজরার উপরে গিয়ে উঠল।
ভবতোষবাবু কোথায়?
লোকটা হাত তুলে একটা দিক দেখিয়ে দিলে।
তারা সেইদিকে এগুলো।…হঠাৎ ছাদে ওঠার সিঁড়ির পাশ থেকে দুজন লোক বেরিয়ে তাদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল! তারাও সতর্ক ছিল, পাশ কাটিয়ে এক লাফে পাশের ঘরের ভিতরে গিয়ে ঢুকে পড়ল। কিন্তু সেখানেও জনচারেক লোক যেন তৈরি হয়েই দাঁড়িয়েছিল। তারাও এত তাড়াতাড়ি আক্রমণ করলে যে, জয়ন্ত ও মানিক আত্মরক্ষা করবার অবসর পর্যন্ত পেলে না। তারা সকলে মিলে তাদের দুজনের হাত-পা শক্ত করে বেঁধে ফেললে। তারপর তাদের সেই অবস্থায় সেইখানেই ফেলে রেখে সকলে বাইরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলে।
শোনা গেল, দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে একজন বলছে, হতভাগারা যে এমন বোকার মতো সাধ করে মরতে আসবে, তা আমি জানতুম না! এখন বোটে করে কেউ গিয়ে বড়বাবুকে এই সুখবরটা দিয়ে আসগে যা! তিনি এসে ওদের ব্যবস্থা করুন।
আর-একজন বললে, কিন্তু পানসির লোকগুলো যদি ওদের খোঁজে?
মাঝির ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে বল যে, বাবুরা এখন যাবেন না।
আর একজনকে বললে, ওদের এ-ঘরে রাখা হয়েছে দেখলে বড়বাবু বোধ হয় রাগ। করবেন।
ওরা নিজেরাই যে ও-ঘরে ঢুকে পড়ল। তা, আজ ওরা ওখানে যা দেখবে, সে কথা । কি পরে আর কারুকে বলবার দিন পাবে? এখন যা, যা–দেরি করিস নে।
তারপর কতকগুলো পায়ের শব্দ এবং তার ওপর সব স্তব্ধ।
বিপদ যে এমন অভাবিতভাবে অতর্কিতে তাদের ঘাড়ের উপরে এসে পড়বে, জয়ন্ত সেটা কল্পনা করতে পারেনি মোটেই। সে ভেবেছিল, এমন পরিষ্কার দিনের বেলায় এরা তাদের সাদর অভ্যর্থনা না করলেও এতটা বেপরোয়ার মতো কাজ করবে না, অন্তত খানিকক্ষণ ভাববে এবং তারা যথাসময়েই সাবধান হতে পারবে। সে নিজের সৌভাগ্যের উপর বড় বেশি নির্ভর করে একরকম নির্বোধের মতোই এখানে এসেছিল, ভাগ্যদেবী কিন্তু তার পানে মুখ তুলে চাইলেন না।
মানিকেরও রাগ হচ্ছিল তার বন্ধুর উপরে। মুখ বাঁধা, ভাষায় রাগ প্রকাশ করবার উপায় নেই, তাই অত্যন্ত ভৎর্সনা ভরা চোখে সে জয়ন্তের দিকে মুখ ফেরালে।
কিন্তু জয়ন্তের মুখ-চোখের অদ্ভুত ভাব দেখে সে আশ্চর্য হয়ে গেল এবং তার দৃষ্টির অনুসরণ করে সেও ঘরের একদিকে তাকিয়ে একেবারে অভিভূত হয়ে পড়ল!
পরে পরে দুটো কফিনের মতো গ্লাস কেস সাজানো রয়েছে এবং তাদের ভিতরে শোয়ানো রয়েছে কী ও দুটো? মোমের মূর্তি নানা, মৃতদেহ! মানুষের মৃতদেহ!
একটা হচ্ছে অত্যন্ত ঢ্যাঙা এক হাবসির মড়া, তার দেহ যেন কষ্টিপাথরে খোদা!
আর একটা হচ্ছে বাঙালির মড়া। সে-ও খুব লম্বা-চওড়া জোয়ান, কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর ও কুৎসিত তার মুখ যে, দেখলে শয়তানও যেন ভয়ে আঁতকে উঠবে।
আর–আর তার ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা নেই।
এই কি সেই বলরাম চৌধুরী? কিন্তু তার বয়স তো সত্তর বছর। আর, এক মাথার চুল কালো কুচকুচে, দেহও যুবকের মতোই জোয়ান।
আর, ওই কি সেই হাসিটা,–মোটরবোটে চড়ে সেদিন যে তাদের আক্রমণ করেছিল? কিন্তু তারা মরল কেমন করে? আর তাদের দেহ এমন কাচের কেসেই বা রাখা হয়েছে কেন?
.
বড়বাবুর আগমন
এ কী অসম্ভব রহস্য। পুলিশের রেকর্ড মানলে বলতে হয়, এই বলরাম চৌধুরী ও হাবসি ভূতটার মৃত্যু হয়েছে বহু বৎসর আগে এবং বেঁচে থাকলেও আজ তারা থুথুড়ো বুড়ো হয়ে পড়ত। কিন্তু এরা এতদিনে মরেওনি, বুড়োও হয়নি! আজ তারা সত্য-সত্যই মরেছে বটে, কিন্তু তাদের দেহে বার্ধক্যের আভাসটুকু পর্যন্ত নেই। তবে কি ওই যৌবনের ভাবটা মিথ্যা, নকল! ওদের দেহের উপরে কি ছদ্মবেশ আছে? এমন নিখুঁত ছদ্মবেশ, যা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতেও ধরা পড়ে না?
