শ্যামবাজারের মস্ত ধনী তারিণী বিশ্বাসের বাড়িতে কাল রাত্রে একটা বড় চুরি হয়ে গেছে। প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার জড়োয়া গয়না অদৃশ্য হয়েছে।
হ্যাঁ, এমন খবর শুনে চোখ খুলতে পারা যায় বটে! তারপর?
ঘটনাস্থলে বাড়ির একজন দ্বারবানের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু কী করে তার মৃত্যু হয়েছে এখনও জানা যায়নি। তার দেহের কোথাও কোনও আঘাতের চিহ্ন পর্যন্ত নেই।
জয়ন্ত বললে, হাইড্রোজেন আর্সেনাইড!
মানিক বললে, সে কী! তুমি কি এটাও ভবতোষের কীর্তি বলে মনে করো?
খুব সম্ভব তাই। কারণ হাইড্রোজেন আর্সেনাইড যাদের মারে, তাদের মৃত্যুর কারণ ধরা বড় কঠিন। ডাক্তাররা হয়তো ওই দ্বারবানের দেহ পরীক্ষা করে বলবেন, হঠাৎ হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হওয়াতে তার মৃত্যু হয়েছে।
মানিক বললে, জয়,ভবতোষের অপরাধ সম্বন্ধে যখন কোনওই সন্দেহ নেই, তখন এমন ভয়ানক লোককে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন?
মানিক, তুমি ছেলেমানুষের মতো কথা বলছ! হ্যাঁ, আমরা জানি বটে এসব কাণ্ডের মূলে আছে ভবতোষই। কিন্তু আদালত তা শুনবে কেন? চাক্ষুষ প্রমাণ কোথায়?
মানিক খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে, আচ্ছা জয়, সেই যে মোটরবোট নিয়ে কাফ্রিটা আমাদের আক্রমণ করেছিল, পোর্টপুলিশ তার কোনও পাত্তা পেলে?
জয়ন্ত বললে, ও সে খবরটা তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছি। সে মোটরবোটখানা যে ভবতোষের এটুকু জানতে পারা গিয়েছে।
মানিক চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে বললে, তবে? অন্তত আমাদের আক্রমণ করার জন্যে তো মূল চক্রী বলে ভবতোষকে গ্রেপ্তার করা যায়?
জয়ন্ত হেসে বললে, বোসো মানিক, বোসো,–এত ব্যস্ত হোয়ো না। তুমি কি ভবতোষকে এমনই কাঁচাছেলেই মনে করেছ? ভবতোষ এই মর্মে বিজ্ঞাপন দিয়েছে…আমার ত্রিবেণীর বাগানের ঘাট থেকে একখানা মোটরবোট আজ দুই দিন হল চুরি গিয়েছে। যিনি তার খোঁজ দিতে পারবেন তাঁকে একশো টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে–প্রভৃতি।
মানিক বললে, তারপর?
তারপর আর কি, পোর্ট-পুলিশ সেই মোটরবোটখানাকে বাগবাজারের খালের ভিতরে আবিষ্কার করেছে। কিন্তু বোটে তখন কেউ ছিল না।
মানিক বললে, বুঝেছি। এখন ভবতোষকে প্রশ্ন করলে সে বলবে, বোট যে চুরি করেছে সমস্ত দোষ তার, আর চোর যখন পলাতক, তখন কেউ তাকে ছুঁতেও পারবে না।
জয়ন্ত বললে, হ্যাঁ, ব্যাপারটা সেইরকমই দাঁড়িয়েছে বটে। মানিক, সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হচ্ছে! খুব ভারী ভারী পায়ের শব্দ। নিশ্চয় সুন্দরবাবু আসছেন–ওঁর ভুড়ির ভারেই পায়ের শব্দ অত ভারী!
সুন্দরবাবু ঘরের ভিতরে ঢুকেই বলে উঠলেন, জয়ন্ত, আমার মান আর চাকরি– দুই-ই বুঝি যায়! আমার এলাকায় উপরি-উপরি এতগুলো চুরি, ডাকাতি, খুন, জখম–অথচ একটারও কিনারা হল না। কেন বাবা, শহরে তো আরও ঢের থানা আছে, তাদের এলাকায় যা না। একলা আমার ওপরেই এত অত্যাচার কেন?–বলেই তিনি ধপাস করে একখানা চেয়ারে বসে পড়লেন।
মানিক বললে, আপনার সেই দুটো মারাত্মক হাঁচির কথা…সেই বারোজন ডাকাত তাড়ানো বলিষ্ঠ হাঁচির কথা স্মরণ করুন। আপনার মান আর চাকরি যদি যায়, তবে সেই দুটো হাঁচির জন্যেই যাবে!
সুন্দরবাবু বললেন, ঠাট্টা করো না মানিক। মরছি নিজের জ্বালায়, কাটা ঘায়ে আর নুনের ছিটে দিও না!
জয়ন্ত বললে, আচ্ছা সুন্দরবাবু, তারিণী বিশ্বাসদের দ্বারবানের লাশ যেখানে পেয়েছেন, সেখানেও নিশ্চয় খুব মিহি কাচের গুঁড়ো ছড়ানো ছিল?
সুন্দরবাবু সচমকে বলে উঠলেন, হুম! এ কথা তুমি জানলে কেমন করে? হা, কাচের গুঁড়ো ছিল বইকী!
জয়ন্ত বললে, যা ভেবেছি তাই! আবার হাইড্রোজেন আর্সেনাইড। আবার সেই ভবতোষ মজুমদার।
সুন্দরবাবু হতাশভাবে বললেন, তোমার ওই হাইড্রোজেন না মাথামুণ্ডু আর ভবতোষই আমাকে হত্যা না করুক, পাগল না করে ছাড়বে না! এ কী পাচে পড়লুম রে বাবা, কোনও হদিসই পাওয়া যায় না।
এমন সময়ে ঘরে আর-এক ব্যক্তির আবির্ভাব হল। তার পরনে তালিমারা ময়লা কাপড়, গায়ে ধুলোমাখা ছেঁড়াখোঁড়া চাদর আর মাথার চুলগুলো রুক্ষ উশকোখুশকো।
তাকে দেখেই সুন্দরবাবু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পকেট থেকে রিভলভার বার করলেন, এবং ষাঁড়ের মতো গর্জন করে বললেন, চুপ করে ওইখানে দাঁড়াও! আর এক পা এগিয়েছ কি গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দিয়েছি!
জয়ন্ত বললে, ভয় নেই সুন্দরবাবু, ভয় নেই! ও শত্রু নয়, আমারই চর!
মানিক বললে, ওঃ, সুন্দরবাবু কি চটপটে! রিভলভার একেবারে তৈরি!
সুন্দরবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, ঠাট্টা কোরো না মানিক। তুমি কি জানো না, তোমাদের বাসাটা বাঘের খাঁচার চেয়েও বিপজ্জনক? হাইড্রোজেন না কি আছেন, অজগর সাপ আছেন, আরও যে কত কি আছেন না আছেন, কেমন করে বুঝব বাবা? হুম! ভদ্রলোকের বাড়ির ভেতরে এমন দুশমন চেহারা দেখলে কার না ভয় হয়?
জয়ন্ত হাস্যমুখে বললে, সে কথা ঠিক! কিন্তু আমার এই চরটি যে এখন ছদ্মবেশে আছে! ও আমারই একটা কাজে গিয়েছিল।…তারপর শিবলাল, ব্যাপার কী? কোনও খবর আছে!
আগন্তুক জয়ন্তের কাছে এসে চুপিচুপি বললে, সেই বজরাখানা ঘুষুড়ির কাছে এসে নঙ্গর করেছে। তার সঙ্গে একখানা মোটরবোটও আছে।
আচ্ছা, তুমি এখন যাও।
শিবলাল অদৃশ্য হল। জয়ন্ত ফিরে বললে, এসো মানিক, আমাদের এখনই বেরুতে হবে। সুন্দরবাবু, আপনি আপাততঃ এখানে বসে বিশ্রাম করুন, চা-টা যা দরকার হবে, হুকুম করলেই আসবে।
