জয়ন্ত শুকনো হাসি হেসে বললে, ও আর এ-জীবনে আপনার সঙ্গে কথা কইবে না।
সুন্দরবাবু হতাশভাবে বললেন, তাহলে ও মরে গিয়েছে?… দেখছি, আজকের যাত্রাই খারাপ! যাক, তবে ওর মুখখানাই দেখি! মানিক, তোমার টর্চটা ওর মুখের ওপর ধরো তো একবার।…ও বাবা, ও কী! ও কি মানুষের মুখ? তিনি চমকে দু-পা পিছিয়ে এলেন।
জয়ন্ত বললে, ভয় নেই সুন্দরবাবু, ও ভূত-টুত নয়। ওর মুখে বিষাক্ত গ্যাস থেকে। বাঁচবার মুখোশ আছে, গ্যাসের মুখোশ দেখতে এমনি বেয়াড়াই হয়!
গ্যাসের মুখোশ? কেন?
আপনি কি এর মধ্যেই হাইড্রোজেন আর্সেনাইডে-র কথা ভুলে গেলেন? এখানেও ওই গ্যাস ব্যবহার করবার জন্যে ওরা প্রস্তুত হয়ে এসেছিল। এই বলে জয়ন্ত মৃতদেহের মুখোশ খুলে দিলে।
লোকটির দেহ অত্যন্ত বলিষ্ঠ, গায়ের ডুমো ডুমো মাংসপেশিগুলো যেন চামড়া ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মুখখানা ভয়ানক, দেখলেই দুর্গা-প্রতিমার অসুরের মুখ মনে পড়ে। কপালের বাঁ দিকে, ভুরুর উপর থেকে মাথার চুল পর্যন্ত বিস্তৃত প্রচণ্ড একটা পুরোনো ক্ষতচিহ্ন,–এমন মারাত্মক চোট খেয়েও কেউ যে বেঁচে থাকতে পারে, স্বচক্ষে না দেখলে তা বিশ্বাস হয় না!
মানিক শিউরে উঠে বললে, কী ভয়ানক!
সুন্দরবাবু তার মুখ দেখে এমন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন যে, খানিকক্ষণ একটাও কথা কইতে পারলেন না। তারপর তিনি অত্যন্ত বিস্মিত স্বরে ধীরে ধীরে বললেন, না, না–এ অসম্ভব! আমি কি স্বপ্ন দেখছি? আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে…মানিক, টর্চের আলোটা আরও ভালো করে এর মুখের ওপর ফেলো তো!…না, না, এ যে একেবারে সেই মুখ! কপালের সেই বিষম কাটা দাগটা পর্যন্ত যে মিলে যাচ্ছে! জয়ন্ত, আমার মাথা ঘুরছে, তুমি একবার এর বুকটা খুলে দেখো তো, ডানদিকে একটা এক বিঘৎ লম্বা লাল জডুলের দাগ আছে কিনা! আমার ভয় করছে, আমি পারব না।
জয়ন্ত লাশের জামার বোতামগুলো খুলে ফেললে। তার বুকের ডানদিকে সত্যসত্যই একটা এক-বিঘৎ লম্বা লাল জডুলের দাগ রয়েছে। সে বললে, সুন্দরবাবু, আপনি একে চেনেন নাকি?
সুন্দরবাবু বললেন, চিনি বললে বলতে হয়, চোখের সামনে আমি একটা ভূতের মড়া দেখছি!…হ্যাঁ, ঠিক হয়েছে। মহম্মদ একবার এদিকে এগিয়ে এসো তো! এ কদিন তো নকল নবাবসাহেব সেজে খুব আয়েস করে নিলে, এখন একটা কাজ করো দেখি! তুমি হচ্ছ আমারই মতো পুলিশের পুরোনো লোক। এই লাশটা কি সনাক্ত করতে পারো?
মহম্মদ এগিয়ে এসে মৃত ব্যক্তিকে দেখেই সভয়ে ও সবিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল।
সুন্দরবাবু সাগ্রহে বললেন, কে এ মহম্মদ? তুমি চিনতে পেরেছ?
হা হুজুর! এ মহাদেও কাহার।
সুন্দরবাবু চিৎকার করে বললেন, তাহলে আমার সন্দেহ মিথ্যা নয়,–এ মহাদেও কাহার!
জয়ন্ত বললে, মহাদেও কাহার! কে সে?
সুন্দরবাবু হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আমি যখন সবে পুলিশে চাকরি নিয়েছি, মহাদেও কাহার ছিল তখন এক নামজাদা ডাকাত। সে নিজের হাতে কত মানুষ খুন করেছে, তা আর গুনে বলা যায় না। অনেক কষ্টে তাকে আমরা গ্রেপ্তার করি। তার ওপরে ফাঁসির হুকুম হয়। ফাঁসির আগেই সে জেল ভেঙে পালায়। কিন্তু হাওড়ার পোলের কাছে পুলিশ তাকে আবার ধরে ফেলে। তবু কোনওগতিকে পুলিশের হাত ছাড়িয়ে মহাদেও গঙ্গায় ঝাঁপ দেয়। তারপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আর তাকে বা তার লাশকে পাওয়া যায় না। আমরা সবাই জানি সে মরে গিয়েছে। কারণ আজ সাতাশ বৎসরের মধ্যে মহাদেওকে কেউ চোখে দেখেনি। সাতাশ বৎসর আগে যে গঙ্গাজলে ডুবে মরেছে, আজ সেই মহাদেওর লাশ আবার আমরা খুঁজে পেলুম!
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বললে, না, না সম্পূর্ণ অসম্ভব!
মানিক বললে, এ লোকটার বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বৎসরের বেশি হতে পারে না। এ অসম্ভব কথা।
সুন্দরবাবু বললেন, আমিও বলি, এ অসম্ভব কথা! কিন্তু তার চেয়েও অসম্ভব কি জানো? সাতাশ বছর আগে মহাদেও যখন পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তার বয়স ছিল ঠিক পঁয়ত্রিশ বৎসর। তাহলে আজ তার বয়স হত বাষট্টি বৎসর! কিন্তু এই কি বাষট্টি বৎসরের বৃদ্ধের দেহ? অথচ এ যে সেই মহাদেও, সে বিষয়ে একটুও সন্দেহ নেই। সেই মুখ-চোখ, কপালের বাঁদিকে সেই কাটা দাগ, বুকের ডানদিকে সেই জডুলের চিহ্ন!
জয়ন্ত অস্ফুট কণ্ঠে বললে, বলরাম চৌধুরী। পঁয়তাল্লিশ বৎসর বয়সের পরে অদৃশ্য হয়ে সত্তর বৎসর বয়সে আবার দেখা দিয়ে চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি করছে। তার ওপরে আবার মহাদেও কাহার! পঁয়ত্রিশ বৎসর বয়সে জলে ডুবেছে, বাষট্টি বৎসর বয়সে ডাঙায় উঠে আবার মরল, কিন্তু এই সাতাশ বৎসরে তার চেহারা একটুও বদলায়নি। আমাদের সকলের মাথাই কি একসঙ্গে বিগড়ে গিয়েছে? যা নয় তাই!
.
সুন্দরবাবুর তৈরি রিভলভার
জয়ন্ত ও মানিক দুজনে দুখানা ইজিচেয়ারে হাত-পা ছড়িয়ে লম্বা হয়ে শুয়েছিল। জয়ন্তের চোখ মোদা–বোধহয় কিছু ভাবছে; মানিকের চোখ খোলা বোধহয় কড়িকাঠ গুনছে।
হঠাৎ মানিক বলে উঠল, জয়, আজকের কাগজ পড়েছ?
জয়ন্ত চোখ বন্ধ রেখেই বললে, না। আজকালকার খবরের কাগজে খবর থাকে না– অর্থাৎ আমি যেরকম খবর চাই।
মানিক বললে, আজকের কাগজ ও কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ তোমার মনের মতো খবর দিয়েছে।
জয়ন্ত বললে, আচ্ছা, আগে খবরটা তোমার মুখে শুনি, তারপর আমি চোখ খোলবার চেষ্টা করব।
