ওইসব ঝোপঝাপের পাশ দিয়ে, বড় বড় গাছের ছায়ার ভিতর দিয়ে, নিবিড়তর ছায়ার মতো লোকগুলো একে-একে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল! কেবল একজন লোক একটা মস্ত আমগাছের তলায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল পাথরের প্রতিমূর্তির মতো। বোধহয় সে পাহারা দিতে লাগল।
অতগুলো লোক বাড়ির ভিতরে গিয়ে ঢুকেছে, কিন্তু তবু সেখানে খুব অস্পষ্ট কোনও শব্দও জেগে উঠল না। বাগানও গোরস্থানের মতো নিস্তব্ধ।
হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতাকে চমকিত করে পাশের ঝোপের ভিতর থেকে কে হেঁচে উঠল– হচ্চো! হাচ্চো!
গাছের তলায় যে পাহারা দিচ্ছিল, সে আঁতকে লাফিয়ে উঠল এবং পরমুহূর্তেই ডান হাতের রিভলভার ধরে ঝোপ লক্ষ করে গুলিবৃষ্টি করতে ও বাঁ হাতে একটা বাঁশি বার করে খুব জোরে বাজাতে লাগল।
ঝোপের ভিতর থেকে অমনি কে চেঁচিয়ে বলে উঠল, হুম! জমাদার, সেপাই, জয়ন্ত!
সারা বাগানখানার ভিতরে চারিদিকে দুদ্দাড় পায়ের শব্দ জেগে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে নানা কণ্ঠের চিৎকার ও ঘন ঘন রিভলভারের শব্দ। রাত্রের সমস্ত তন্দ্রা-স্তব্ধতা ছুটে গেল এক সেকেন্ডে।
যে ঝোপে হাঁচির জন্ম, তার ভিতর থেকে আবিভূর্ত হল সুন্দরবাবুর বিশাল ভুড়ি। কিন্তু বাড়ির দিক থেকে সাত-আটজন লোক রিভলভার ছুঁড়তে ছুঁড়তে তিরের মতো বোঁ-বোঁ করে ছুটে আসছে দেখে সুন্দরবাবু হুম!–বলে আবার ভুড়িসুদ্ধ ঝোপের ভিতর ঝম্পপ্রদান করলেন।
আরও নানা ঝোপের ভিতর থেকে পাহারাওয়ালার পর পাহারাওয়ালা বেরিয়ে আসতে লাগল–এখানকার সমস্ত ঝোপঝাঁপই যেন কেবল পাহারাওয়ালায় ভরা!
খানিক তফাত থেকে জয়ন্তের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল–জমাদার, ওইদিকে। মানিক এইদিকে। আরে-আরে–শিগগির।
সুন্দরবাবু ঝোপের ভিতর থেকে খুব সাবধানে মুখ বাড়িয়ে দেখলেন, আর কেউ এদিকে ছুটে আসছে না। তখন তিনি আর একবার বাইরে লাফিয়ে এসে চেঁচাতে শুরু করলেন–সেপাই, সেপাই। জলদি। ডাকু-লোক ভাগতা হ্যায়। পাকড়ো, পাকড়ো।
জয়ন্ত বেগে ছুটে সেইখানে এসে দাঁড়িয়ে দেখলে, চোরেরা সকলেই অদৃশ্য হয়েছে, কেবল একজনকে তখনও দেখা যাচ্ছে–পরমুহূর্তে সেও মোড় ফিরে অদৃশ্য হয়ে যাবে।
সে আর ইতস্তত করলে না, পলাতকের পায়ের দিকে লক্ষ করে রিভলভার ছুঁড়লে এবং সে-লোকটাও টক্কর খেয়ে মাটির উপরে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।
সুন্দরবাবু মহা আনন্দে নৃত্য করতে করতে বলে উঠলেন, এক ব্যাটা কুপোকাৎ! এক ব্যাটা কুপোকাৎ! উল্লুক, শুয়োর। আমাকে টিপ করে গুলি ছোঁড়া! এখন কেমন জব্দ। বাহাদুর জয়ন্ত।
কিন্তু জয়ন্ত তার কথা কানেও তুললে না, সে আহত লোকটার দিকে ছুটে এগিয়ে গেল– তার পিছনে পিছনে মানিকলাল।
আহত ব্যক্তি মাটির উপরে উঠে বসে দুই হাতে ভর দিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু আচম্বিতে আবার একবার রিভলবারের শব্দ হল এবং সে-ও আর্তনাদ করে আবার ঘুরে পড়ে গেল।
তারপরেই ট্রাঙ্ক রোডের উপর দুখানা মোটরগাড়ি গর্জন করে ছুটতে লাগল।
জয়ন্ত যখন সেই ভূপাতিত লোকটার কাছে এসে পড়ল, তখন সে আর নড়ছে না। তাড়াতাড়ি তার বুকে হাত দিয়ে দেখে বললে, মানিক, এ আর এ জীবনে চুরি করবে না!
মানিক বললে, কিন্তু জয়, সবশেষে রিভলভার ছুঁড়লে কে?
চোরেরা। আমি একে মারতে চাইনি, তাই এর পায়ে গুলি করেছিলুম। কিন্তু একে বধ করলে এর দলের লোকেরাই।
সে কী?
হ্যাঁ। পাছে ওদের আহত সঙ্গী সমস্ত গুপ্তকথা ফাঁস করে দেয়, সেই ভয়ে। আমি একে জ্যান্ত ধরবার চেষ্টা করেছিলুম, ওরা আমার সে আশায় ছাই দিয়ে গেল।
এমন সময়ে সুন্দরবাবু সেখানে হাঁসফাঁস করতে করতে এসে হাজির! চিৎকার করে বললেন, কোথায় সেই ডাকাত-ব্যাটা? এইবারে মজাটা দেখিয়ে দিচ্ছি!
জয়ন্ত তিক্তস্বরে বললে, সুন্দরবাবু, আজ পনেরো দিন ধরে যে ফঁদ পাতলুম-নকল নবাব-সাহেব, ঐতিহাসিক জাল রত্নহার, খবরে কাগজে কাগজে অমূলক আন্দোলন, চোরেদের মিথ্যে লোভ দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা, কিন্তু সমস্ত পণ্ড করে দিলে আপনার ওই বিদকুটে হাঁচি! আটাশ বছর পুলিশে চাকরি করছেন, দুটো হাঁচি চাপতেও পারলেন না? ঘাটে এনে নৌকো ডোবালেন? ছিঃ!
কিছুমাত্র দমে না গিয়ে সুন্দরবাবু বললেন, হুম। যেরকম হাঁচি আমার এসেছিল, কোনও ভদ্রলোকই সেরকম বিশ্রী হাঁচি সামলাতে পারে না। আমি অন্যমনস্ক হলুম, মাথা-ঝকানি দিলুম, দু-হাতে মুখ চাপলুম, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না–সে ভয়ঙ্কর ভণ্ডুলে হাঁচি মুখ ঠেলে বেরিয়ে এল একেবারে তেড়েফুঁড়ে! আমার দোষ কি?
জয়ন্ত বললে, আমারই ভাগ্যের দোষ! আর পাঁচ মিনিট পরে হাঁচলে পালের গোদা ভবতোষের সঙ্গে সমস্ত দলটাকেই আমরা গ্রেপ্তার করতে পারতুম।
জয়ন্তের পিঠ চাপড়ে সুন্দরবাবু বললেন, এত সহজে মুষড়ে পোড়ো না ভায়া, ভয় কি? ইস্কুলের কেতাবে পড়ো নি–ট্রাই ট্রাই ট্রাই এগেন? চেষ্টা করো, চেষ্টা করো আবার চেষ্টা করো। চেষ্টায় কী না হয়?
মানিক বললে, কিন্তু জয়, তুমি তো সুন্দরবাবুর বাহাদুরিটা দেখছ না! ওঁর দুটি মাত্র। তুচ্ছ হাঁচির ভয়ে বারো-বারোজন জোয়ান ও জ্যান্ত ডাকাত এক দৌড়ে পালিয়ে গেল! একেই। বলি বীরত্ব!
সুন্দরবাবু ভুরু কুঁচকে বললে, ঠাট্টা কোরো না মানিক, ও-রকম ঠাট্টা আমি পছন্দ করি না।…হুম! এইবারে দেখা যাক, এ ডাকাতটা কি বলে।
