নবমীর চাঁদ এখন মড়ার মতন হলদে-মুখে যেন মিশিয়ে যেতে চাইছে পশ্চিম আকাশে। পৃথিবীর উপরে থমথম করছে না আলো, না অন্ধকার! দেখাও যায়, দেখাও যায় না!
এমন আলো-আঁধারির চেয়ে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার ঢের ভালো লাগে। সমুদ্রের নীল জলের মতো, শূন্যের কালো অন্ধকার তার ভিতরের সমস্ত বিভীষিকাকে একেবারে ঢেকে রাখে। কিন্তু খানেক তফাতে যদি একটা গাছের ডাল-পাতা নড়ে, এই আলোমাখা অন্ধকারে তাও স্পষ্ট নজরে আসে না সন্দেহ হয় বুঝি কোনও অপার্থিব ছায়া দেখলুম! দূর দিয়ে হয়তো একটা ভীতু শিয়াল ছুটে পালায়, আর আমাদের চোখে ধাঁধা লাগে–বুঝি কোনও ভৌতিক দেহ দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।
রাতের সভায় আজ জনমানবের সাড়া নেই। কেবল ঝিঁঝিপোকা আর কোলাব্যাঙের দল যেন পরস্পরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটানা চেঁচিয়ে চলেছে। আর এ-পাড়া ও-পাড়ার কুকুরগুলো থেকে থেকে অকারণেই খাপ্পা হয়ে গলাবাজি করে এ-ওকে দমিয়ে দেওয়ার জন্যে। ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
বারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড। দুই ধারে সারি সারি বাগানবাড়ি রাত্রের গভীর নির্জনতায় ঘুমিয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে গরিবদের দু-একখানা মেটে ঘর আর ছোট ছোট বস্তি–সেখানেও অনিদ্রার কোনও লক্ষণই নেই। পথের দুধারে তেলের আলোগুলো নাচার হয়ে অত্যন্ত মিটমিট করে জ্বলছে, যেন ঘুমিয়ে পড়তে পারলে তারাও বাঁচে। আশেপাশে ঝাঁকে ঝাকে সজাগ জোনাকিরা কেবল ব্যস্ত হয়ে শূন্যপথে আনাগোনা ওঠা-নামা ছুটোছুটি করছে–তারা যেন স্বপ্নপরিদের ছোট্ট হাতে উড়িয়ে দেওয়া অগুন্তি খেলার ফানুস।
দুখানা বড় বড় মোটরগাড়ি যথাসম্ভব নীরবে বারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের জানালার জানালার পরদা তোলা, আরোহীদের দেখবার উপায় নেই।
দুখানা গাড়িই একখানা মস্তবড় বাগানবাড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে-বাড়িখানার চারিদিক লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। তার কোনও জানালার আলোর আভাসটুকু পর্যন্ত নেই। ফটকও বন্ধ।
সম্প্রতি দক্ষিণ ভারতের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি এই প্রকাণ্ড বাগানবাড়িখানা ভাড়া নিয়েছেন। তিনি মাসখানেকের জন্য কলকাতায় বেড়াতে এসেছেন। তার নাম নবাব মহম্মদ আলি খাঁ বাহাদুর।
আজ দিন পনেরো ধরে নবাব সাহেবকে নিয়ে কলকাতার লোকদের কৌতূহলের অন্ত নেই। কারণ নবাব-সাহেব হচ্ছেন একজন ধনকুবের। তাঁর হিরা-জহরতের ভাণ্ডার নাকি অফুরন্ত।
এই ভাণ্ডারের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়জনক হচ্ছে একছড়া হিরার হার। অনেক খবরের কাগজে এই অমূল্য রত্নহারের ছবি ও ইতিহাস প্রকাশিত হয়েছে।
সম্রাট জাহাঙ্গির নাকি এই রত্নহারটি নুরজাহানকে উপহার দিয়েছিলেন। তারপরে এই হারছড়া মোগল রাজবংশের ভিতরেই থাকে। নাদির শা দিল্লি লুটে ময়ুর-সিংহাসন পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু কোহিনূর ও এই রত্নহারের কোনও সন্ধান পাননি। তারপর ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে আহম্মদ শা এসে কোহিনুরের সঙ্গে ওই রত্নহারও কেড়ে নিয়ে যান। পাঞ্জাবের রণজিৎ সিংহ যখন আহম্মদের বংশধরকে হারিয়ে কোহিনুর পুনরাধিকার করেন, তখন রত্নহারটিও তার হস্তগত হয়। তারপর কোহিনুর যায় ইংরেজদের হাতে, কিন্তু কেমন করে ওই হারছড়া যে নবাবসাহেবের পূর্বপুরুষের অধিকারে আসে, সে ইতিহাস কেউ জানে না। সম্প্রতি একজন বড় জহুরি হারছড়া পরীক্ষা করে বলে গেছেন, তার এখনকার বাজারদর এককোটি টাকার কম নয়।
ওই ঐতিহাসিক হারছড়া একবার খালি চোখে দেখে ধন্য হবার জন্যে নবাব-সাহেবের বাড়িতে প্রতিদিন দলে দলে দর্শক এসে ভিড় করেছে। দর্শকদের আগ্রহে বাধ্য হয়ে নবাবসাহেব রত্নহারছড়াকে তার বৈঠকখানার নামিয়ে এনে একটি গ্লাস-কেসের ভিতরে রেখে দিয়েছেন। বৈঠকখানার দরজার দিবারাত্র সর্বদাই একজন সশস্ত্র সেপাই পাহারা দেয়।
এইবারে সেই রহস্যময় মোটরগাড়ি দুখানা কী করে দেখা যাক।
একখানা গাড়ির ভিতর থেকে দুজন লোক নিঃশব্দে বেরিয়ে এল। তারপর চোরের মতো সন্তর্পণে এগিয়ে নবাব-সাহেবের বাড়ির এপাশে ওপাশে উঁকিঝুঁকি মেরে আবার মোটরের কাছে ফিরে এসে দাঁড়াল।
গাড়ির ভিতর থেকে খুব মৃদুস্বরে কে বললে, পথ সাফ?
আজ্ঞে হ্যাঁ। বাড়ির সবাই ঘুমোচ্ছে।
তার সঙ্গী বললে, কিন্তু ভিতরে বৈঠকখানার সেই সেপাই ঘুমোচ্ছে কিনা জানি না।
গাড়ির লোকটি বললে, তা জানবার দরকার নেই। সেই সেপাইব্যাটা আমার কাছ থেকে অনেক টাকা ঘুষ খেয়েছে। সে আমাদের বাধা দেবে না। বাড়ির ডানদিকের ওই গলিতে যাও। রেলিং টপকে ফটকটা খুলে দাও। সাবধান, যদি কোনও দারোয়ান জেগে ওঠে, তখনই তার মুখ বন্ধ করবার ব্যবস্থা করবে বুঝেছ? যাও।
অল্পক্ষণ পরেই একে একে বারোজন লোক ঠিক ছায়ামূর্তির মতো নিঃশব্দেই নবাব সাহেবের বাড়ির ফটক পার হল। মোটর দুখানা দূরেই দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু তাদের কল সমানে চলতে লাগল।
নূরজাহানের রত্নহার আজ আবার বুঝি আর একজনের হাতছাড়া হয়।
অনেককালের পুরোনো বাগান–চারিদিকে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বৃক্ষ মাটির উপরে মস্ত মস্ত অন্ধকার সৃষ্টি করে দাঁড়িয়ে আছে। আসল মালিকের যে বাগানের সৌন্দর্য-রক্ষার দিকে তেমন দৃষ্টি নেই, তাও বেশ বোঝা যায়। কারণ সর্বত্রই সাজানো ফুলগাছের চেয়ে এলোমেলো ঝোপঝাঁপই বেশি। নবাব-সাহেবের মতো ধনী ও শৌখিন লোকের পক্ষে এরকম বাগানবাড়ি ভাড়া নেওয়া উচিত হয়নি।
