জয়ন্ত বললে, না! ও-শখ এখনও আমার হয়নি। আমি বাগানে গিয়ে চারিদিকে দেখে এসেছি। খিড়কির দরজা খোলা থাকে না, কিন্তু আজ খোলা রয়েছে। খালের ধারে আমাদের বাড়ির কাছে রাতে লোকচলাচল খুব কম। আমাদের খিড়কির পিছনে একটা সরু কানা গলি আছে–অত্যন্ত নোংরা গলি। সেখান দিয়ে কেউ হাঁটে না। ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না; কিন্তু আমার বিশ্বাস, রাত-আঁধারে কেউ বা কারা এসে কোনওরকমে এই অজগরকে নিয়ে বাগানে ঢুকে আমার ঘরের জানালার তুলে দিয়েছে। অজগরটা নিশ্চয়ই তাদের পোষা।
বলো কি! কাদের এ কাজ?
আমাদের শত্রুদের–যাদের কাছে হাইড্রোজেন আর্সেনাইড আছে, যারা মুকুন্দ নন্দীর গদিতে আর সদানন্দবাবুর বাড়িতে চুরি করেছে, যারা চায় না আমরা এব্যাপারের মধ্যে থাকি!
সুন্দরবাবু এতক্ষণে ধাতস্থ হয়ে বললেন, হুম! তাহলে তোমার ধারণা, একই দল মুকুন্দ নন্দীর গদিতে আর সদানন্দের বাড়িতে চুরি করেছে?
ধারণা নয় সুন্দরবাবু, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। যেদিন মুকুন্দ নন্দীর গদির ব্যাপারটা হাতে নিই, সেই দিনই কারা আমাদের শাসিয়ে চিঠি লিখেছিল। তারপর সদানন্দবাবুর বাড়ির চুরির পর থেকে আমাদের ওপরে তাদের রাগ যেন আরও বেড়ে উঠেছে। এবার নিয়ে তিন তিনবার আমাদের হত্যা করবার চেষ্টা হল। কিন্তু আর নয়, এইবারে আসল অপরাধীকে অন্ধকার থেকে টেনে বার করতে হবে!
সুন্দরবাবু বললেন, তুমি কি বলরাম চৌধুরীর ওপরে সন্দেহ করো?
জয়ন্ত যেন আপন মনেই বললে, বলরাম চৌধুরী! পঁয়তাল্লিশ বৎসর বয়সে যে প্রথমে ধরা পড়ে, বহু বৎসর অজ্ঞাতবাসের পরে সত্তর বৎসর বয়সে আবার সে আবির্ভূত হয়েছে। না, না, এ অসম্ভব সুন্দরবাবু, অসম্ভব! নিশ্চয়ই এর মধ্যে গভীর কোনও রহস্য আছে! তাহলে ভবতোষ মজুমদার কে? মানিক, এর মধ্যে ভবতোষকে তুমি নিশ্চয়ই ভোলেনি বিশেষ করে তার চোখ দুটো?
সুন্দরবাবু হতাশজনক মুখভঙ্গি করে বললেন, এই রে, আবার হেঁয়ালি! আচ্ছা জয়ন্ত, থাকো থাকো আর এমন হয়ে যাও কেন বলো দেখি তুমি? হচ্ছিল বলরাম চৌধুরীর কথা, কোত্থেকে এল আবার ভবতোষ মজুমদার আর তার দুটো চোখ। বলি, তার দুটো চোখ নিয়ে আমরা করব কি? ধুয়ে খাব? হুম, যত অনাসৃষ্টি!
জয়ন্ত বললে, চোখ নিয়ে অনেক কিছু হয় সুন্দরবাবু, অনেক কিছুই হয়! চোখ হচ্ছে মনের আরশি,–সে আরশিতে ভেসে ওঠে লুকানো স্বভাবের আসল ছবি! অসাধুর সমস্ত ছদ্মবেশের ভিতর থেকেই ওই চোখদুটোই তাকে আগে ধরিয়ে দেয়। ভবতোষ মজুমদার হচ্ছে মানুষের নাম, কিন্তু তার চোখ দুটো হচ্ছে শয়তানের চোখ। সে চোখের আসল ভাব ঢাকবার চেষ্টা করছিল বটে, কিন্তু মাঝে মাঝে তার সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে! যাবেই তো! চোখের আসল ভাব বেশিক্ষণ কেউ লুকিয়ে রাখতে পারে না। ভবতোষও তা পারেনি। তার চোখ দুটো ভীষণ নয়, রহস্যময়!
সুন্দরবাবু বললেন, কী আপদ! কে ভবতোষ? তার চোখের এত ব্যাখ্যানা কেন?
জয়ন্ত বললে, বলব সুন্দরবাবু, তার কথা সব আপনাকে বলব। কিন্তু আপাতত আপনি একটু চুপ করুন–আমার মাথায় একটা ফন্দি আসছে, বোধহয় খুব ভালো ফন্দি!..সুন্দরবাবু, আর একবার চা খেতে আপনার আপত্তি আছে? নেই? ওরে, আমাদের জন্যে তিন পেয়ালা চা দিয়ে যা!..সুন্দরবাবু, একটু ঠান্ডা হয়ে বসুন, সব কথাই আপনাকে বলব!–এই বলে সে জানালার ধারে গিয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে রইল এবং মাঝে মাঝে এক এক টিপ নস্য নিতে লাগল।
সুন্দরবাবু একখানা চেয়ারের উপরে বসে পড়ে বিরক্তভাবে আপন মনে বললেন, আমি তোমার ভবতোষের চোখের ইতিহাস শুনতে চাই না! চা খেয়েই আমি পাগলা গারদ থেকে পালাব।
খানিক পরেই চাকর চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকল।
জয়ন্ত ফিরে বললে, সুন্দরবাবু, এই চোরদের ধরবার এক চমৎকার উপায় আমি আবিষ্কার করেছি। চা খেতে-খেতে সব কথা আপনাকে বলছি।
আচম্বিতে বাইরে থেকে গুডুম করে একটা বন্দুকের আওয়াজ হল এবং ঘরের দেওয়ালের উপরের একখানা বড় ছবির কাচ ঝনঝন করে ভেঙে গেল ও সঙ্গে সঙ্গে জয়ন্ত ধুপ করে মেঝের উপর বসে পড়ল!
মানিক তাড়াতাড়ি তার কাছে ছুটে গিয়ে আর্তস্বরে বলে উঠল, জয়জয়! কী হল? সে সভয়ে দেখলে, জয়ন্তের গাল বেয়ে ঝরঝর করে রক্ত ঝরছে।
সুন্দরবাবু একলাফে উঠে তাড়াতাড়ি ঘরের জানালাগুলো বন্ধ করে দিলেন।
জয়ন্ত গালের উপরে রুমাল চেপে ধরে বললে, ভয় নেই মানিক, ভয় নেই! এ যাত্রাও বেঁচে গেলুম,–গুলি আমার গালের মাংস ঘেঁষে চলে গেছে! জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ানোই আমার ভুল হয়েছিল। আমি ভাবতে পারিনি যে, অজগর লেলিয়ে দেওয়ার পরেও আমাদের স্যাঙাতরা বাইরে কোথাও লুকিয়ে থাকতে ভরসা করবে।
মানিক বললে, আমরা একী ভয়ানক লোকের পাল্লায় পড়েছি।
সুন্দরবাবু বললেন, হুম! আমি আর চা খাব না। এখান থেকে কোনওরকমে প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলেই বাঁচি!
জয়ন্ত বললে, মুখের চা ফেলে গেলে নরকে পচতে হয়। আসুন, পেয়ালা নিন, আমিও চা খাব। সুন্দরবাবু, যে ফন্দি আমি করেছি, দু-চার দিনের ভেতরেই এই চোর আর খুনির দল। আমাদের হাতের মুঠোয় ধরা পড়বে। তারা আমাদের রক্তপাত করেছে–আমি প্রতিশোধ চাই।
.
দুটি হাঁচি ও দ্বাদশ দস্যু
যাকে বলে, রাত ঝাঁ ঝাঁ!
