জয়ন্তও তার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে যথাসময়ে লাফ মারবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে রইল। তখন নিজেকে তার কী অসহায় বলে মনে হচ্ছিল! হাতে এমন কোনও অস্ত্র নেই যে, কোনওরকমে আত্মরক্ষা করে। এখন তার আত্মরক্ষা করবার একমাত্র উপায় হচ্ছে ক্ষিপ্রগতিতে ডাইনে বা বামে অজগরের নাগালের বাইরে সরে যাওয়া। কিন্তু তারপর? তারপর কি হবে? এইটুকু ঘরে এমন ভাবে একটা এত বড় অজগরের আক্রমণ বার বার ঠেকানো তো সম্ভবপর। নয়! এক মুহূর্তের মধ্যে এইসব চিন্তা বিদ্যুতের মতন তার মাথার ভিতর দিয়ে খেলে গেল। সঙিন মুহূর্তে মানুষ কত তাড়াতাড়ি ভাবতে পারে।
এবং ঠিক সেই মুহূর্তে সুন্দবাবু ভাবছিলেন, এই অজগরটা এখনি তাঁর দেহ জড়িয়ে ধরে হাড়গোড় ছাতু করে ফেলে তারপর তাকে গিলে হজম করবে। দুনিয়ায় আজ তার শেষ দিন! তিনি এমন নেতিয়ে পড়লেন যে, সাপটা এখন আবার যদি তাকে ছোবল মারে, তাহলে তিনি আগের বারের মতো আর লম্বা লম্ফত্যাগ করে সরে যেতেও পারবেন না।
এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই মানিক তিরবেগে হাত বাড়িয়ে সুন্দরবাবুর পকেট থেকে রিভলভারটা একটানে বার করে নিলে। সুন্দরবাবু যখন প্রথম ঘরে এসেছিলেন মানিক তখনই তাঁর পকেটের এই বিশেষত্বটি লক্ষ্য করেছিল।
অজগর আবার সোঁ করে এগিয়ে ছোবল মারতে এল এবং জয়ন্ত সাঁৎ করে একপাশে সরে গেল!
লক্ষ্যচ্যুত হয়ে অবলম্বন না পেয়ে সাপটা আবার মাটির উপরে মুখ থুবড়ে পড়ল। ততক্ষণে তার দেহের প্রায় তিনভাগ ঘরের ভিতর এসে পড়েছে।
অজগর তৃতীয়বার আক্রমণ করবার জন্যে মাথা তোলবার আগেই মানিক তার মাথা টিপ করে উপরি-উপরি দুবার রিভলভারের গুলিবৃষ্টি করল এবং তারপর যে কাণ্ড হল ভাষায় তা ভালো করে বুঝানো যাবে না।
অজগরের ভীষণ গর্জনে চারিদিক পরিপূর্ণ হয়ে গেল এবং তার সেই বিপুল দেহটা পাকস্লট খেয়ে ঘরের মেঝের উপরে আছড়া-আছড়ি করতে লাগল–তারই বা শব্দ কি! ঘরের গোল মার্বেলের টেবিলটা ও একখানা সোফা ঠিকরে উলটে পড়ল এবং অজগরের কুণ্ডলীর মধ্যে পড়ে একখানা চেয়ার পলকা দেশলাইয়ের বাক্সের মতোই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অজগরটা রাগে অন্ধ হয়ে সেই ভাঙা চেয়ার লক্ষ করেই উপরি-উপরি দুবার ছোবল মারলে!
ততক্ষণে এই বিষম ধুমধাড়াক্কা শুনে বাড়ির অন্যান্য লোকজন ছুটে এসে ঘরের বাইরে দরজার কাছেই স্তম্ভিত বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে, এবং জয়ন্ত, মানিক ও সুন্দরবাবু লাফিয়ে উঠে পড়েছে ঘরের উঁচু খাটের উপরে! সেইখান থেকে মানিক আরও দুবার রিভলভার ছুড়লে। কিন্তু সেই অতিকায় অজগর তবু কাবু হয়েছে বলে মনে হল না।
জয়ন্ত চিৎকার করে বললে, বন্দুক, বন্দুক! আমার বন্দুক এনে ছোড়ো!
অজগরের ল্যাজটা একবার উঁচু হয়ে খাটের উপরে আছড়ে পড়ল–মজবুত খাটখানা। ও মড়মড় আর্তনাদ করে উঠল। সে ল্যাজের একটা আঘাত যদি জয়ন্তদের কারুর গায়ে লাগে, তাহলে তখনি তার নিশ্চিত মৃত্যু। অজগরের ল্যাজ সিংহ, ব্যাঘ্র ও বড় বড় মোষকে কাত করে দেয়।
এর মধ্যে কে ছুটে গিয়ে বন্দুক নিয়ে এল। কিন্তু সে ঘরের ভেতরে ঢুকতে সাহস করলে না; দরজার কাছ থেকেই পরে পরে দুবার গুলিবৃষ্টি করলে! মানিকও সাপের মাথা লক্ষ্য করে আর একবার রিভলভার ছুড়লে!
অজগর মারাত্মক আক্রোশে খাটের একটা পায়াকে জড়িয়ে ধরলে, পায়াটা তখনি মড়াত করে ভেঙে গেল এবং খাটখানাও একদিকে নীচু হয়ে পড়ল! টাল সামলাতে না পেরে সুন্দরবাবু খাটের নিচে পড়ে যাচ্ছিলেন, জয়ন্ত তাড়াতাড়ি তাকে টেনে নিয়ে অন্যপাশে সরে গেল।
এই হল অজগরের শেষ-প্রচেষ্টা! তার মাথা তখন গুলির চোটে ঘেঁতলে গুঁড়িয়ে গেছে! কিন্তু সে মরলেও তার দেহ দেখলে সেটা বুঝবার উপায় নেই, তা তখনও পাকসাট খাচ্ছে এবং কুণ্ডলী রচনা করছে–এ কুণ্ডলীর মধ্যে এখনও কোনও জীবজন্তু গিয়ে পড়লে আর তার রক্ষা নেই!
এই প্রাণহীন ভীম অজগরের দেহ তারপর অনেকক্ষণ পর্যন্ত জীবন্ত হয়ে ছিল।
সুন্দরবাবু তখন একেবারে মূৰ্ছিত হয়ে পড়েছেন এবং মানিক খাটের উপরে দুই পা ছড়িয়ে বসে পড়ে গভীর উত্তেজনায় কাতর হয়ে ক্রমাগত হাঁপাচ্ছে।
জয়ন্ত কৃতজ্ঞ স্বরে বললে, মানিক, আজ তুমি না থাকলে আমরা কেউ বাঁচতুম না!
মানিক হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, সে কথা এখন থাক। দেখো, সুন্দবাবু হার্ট ফেল করল কিনা!
.
সুন্দরবাবুর যখন জ্ঞান হল তখন তিনি প্রথমেই বলে উঠলেন, আমি বেঁচে আছি তো?
জয়ন্ত বললে, সে বিষয়ে একটুও সন্দেহ নেই।
হুম! সে অজগর ব্যাটা কোথায়?
পরলোকে। তার দেহটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে এখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
হুম! আমি আর তোমাদের বাড়িতে আসব না–এই নাক কান মলছি।
কেন সুন্দরবাবু?
কেন? তাও আবার জিগ্যেস করছ! তোমার বাড়ি বিপজ্জনক। সেদিন শুনলুম, হাইড্রোজেন আর্সেনাইডভগবান জানেন, সে কি জিনিস! আজ আবার দেখছি হ্যারিসন রোডের মতো লম্বা অজগর? কাল আবার এসে হয়তো দেখব আফ্রিকার সিঙ্গি, হিপো, গন্ডার, হাতি। বাপ, এখানে কোনও ভদ্রলোক আসে? হুম, তোমার বাড়িকে নমস্কার, আর আমি এমুখো হচ্ছি না!
মানিক হেসে ফেলে বললে, কিন্তু আপনি তো রিভলভার নিয়ে আসতে পারেন, আপনার ভয়টা কীসের?
সুন্দরবাবু মুখ ভার করে বললেন, ঠাট্টা কোরো না মানিক! ওরকম ঠাট্টা আমি পছন্দ করি না। কলকাতায় ঘরের ভেতরে অজগর দেখলে রিভলভারের কথা কারুর মনে থাকে?…কিন্তু অজগরটা এল কোত্থেকে? বাড়ির ওদিকে বাগানের মতো আছে দেখছি! জয়ন্ত, তুমি কি অজগর পোষো?
