সুন্দরবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, বিশ্রাম করবে–অর্থাৎ বাঁশি বাজাবে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। বাঁশি বাজিয়েই আমি বিশ্রাম করি, আর মানিক বিশ্রাম করে আমার বাঁশি বাজানো শুনতে-শুনতে। এটা আমাদের অনেকদিনের অভ্যাস। না মানিক?
মানিক হাসতে-হাসতে ঘাড় নেড়ে সায় দিলে।
সুন্দরবাবু বললেন, হুম! তোমরা রাগ কোরো না, কিন্তু মাঝে-মাঝে তোমাদের দুজনেরই মাথা দস্তুরমতো খারাপ হয়ে যায় বলেই তিনি প্রস্থান করলেন।
.
দুদিন পরে এক সন্ধ্যাবেলা। জয়ন্ত ও মানিক চা-পান শেষ করে বসে-বসে পরামর্শ করছিল, আজ রাত্রে বায়স্কোপ দেখতে গেলে কেমন হয়,–এমনসময় নীচের তলা থেকে সুন্দরবাবুর হাঁক-ডাক শোনা গেল।
মানিক হতাশ ভাবে ইজিচেয়ারের উপরে আড় হয়ে পড়ে বললে, ব্যাস, বিদায় গ্রেটা গার্বোর মায়া-লীলা! ওই শোনো, তোমার সুন্দরবাবু এলেন মুরুব্বিয়ানার ঠেলায় প্রাণ ওষ্ঠাগত করতে।
জয়ন্ত চেঁচিয়ে বললে, আসুন সুন্দরবাবু, ওপরে উঠে আসুন।
সুন্দরবাবু ঘরের ভিতরে ঢুকেই উত্তেজিত স্বরে বললেন, জয়ন্ত, জয়ন্ত, তুমি কি মন্তর টন্তর কিছু জানো?
জয়ন্ত বললে, কেন বলুন দেখি?
সুন্দরবাবু বললেন, তাহলে সেই মন্তরটা আমাকে শিখিয়ে দাও…গেলাসে যার হাতের ছাপ আছে, সত্যিই তার ডান হাতের বুড়ো-আঙুল নেই। কিন্তু পুলিশের কাছে তার বাঁ হাতের ছাপ আছে।
জয়ন্ত দুই টিপ নস্য নিয়ে বললে, তাহলে সে পুরোনো পাপী?
হ্যাঁ। সে ভয়ানক লোক। তার নাম বলরাম চৌধুরী। পঁচিশ বছর আগে সে একটা খুনের মামলার আসামি হয়। কিন্তু বিচারে প্রমাণ-অভাবে খালাস পায়। বিশ বছর আগে একটা ডাকাতির মামলায়ও সে আসামি হয়েছিল। কিন্তু সেবারও সে শাস্তি পায়নি। উনিশ বছর আগে বড়বাজারে রাহাজানি করে সে ধরা পড়ে। এবার সে আইনকে ফাঁকি দিতে পারেনি, বিচারে তার তিন বছর জেল হয়। জেলে থাকতে থাকতেই এক হাবসির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়–
মানিকের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জয়ন্ত বাধা দিয়ে বললে, এক হাবসির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়?
হ্যাঁ। তার সঙ্গে বলরাম জেল ভেঙে পালিয়ে যায়। তারপরও এক বছরের ভেতরে তারা যে দুটো খুন আর ডাকাতি করেছে, পুলিশের কাছে এমন প্রমাণ আছে। কিন্তু আমরা কিছুতেই তাদের ধরতে পারিনি। কেবল তাই নয়, তারা যেন পৃথিবী থেকে উবে গিয়েছিল। খুন আর ডাকাতি যাদের জীবিকা, তারা বেশিদিন চুপ করে থাকতে পারে না। কিন্তু আজ ষোলো বৎসরের মধ্যে দেশ-বিদেশের কোথাও তাদের আর কোনও সন্ধানই পাওয়া যায়নি। আমরা ভেবেছিলুম, তাদের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু আজ এতকাল পরে বলরাম যে কোথা থেকে আবার দেখা দিলে, ভগবান জানেন!
জয়ন্ত বললে, বলরাম যখন এমন গুণী ব্যক্তি, তখন পুলিশ নিশ্চয়ই তার ফটো নিতে ভোলেনি!
সুন্দরবাবু একখানা মোটা বইয়ের পাতা উলটে বললেন, এই দেখো বলরামের ফোটো আর ইতিহাস। এর চেহারা দেখলেই তোমাদের ভয় হবে।
সত্যই তার চেহারা ভয়ঙ্কর, শয়তানের চেহারাও বোধহয় এত ভয়ানক নয়। চোখদুটো সাপের মতো ক্রুর ও তীক্ষ্ণ, নাক বুলডগের মতো থ্যাবড়া, চোয়াল হচ্ছে হাঙরের মতো।
জয়ন্ত অনেকক্ষণ ধরে বলরামের ইতিহাস পড়ে যেন নিজের মনেই বললে, দেখছি এই ফোটোখানা তোলা হয়েছে পঁচিশ বছর আগেই,বলরামের বয়স যখন পঁয়তাল্লিশ বৎসর। না, না, এ অসম্ভব!
সুন্দরবাবু শুধোলেন, কী অসম্ভব?
একথা সত্য হলে বলতে হয়, বলরামের বয়স এখন সত্তর বৎসর।
অসম্ভব নয়। আমরা এমন সব পাপীকেও জানি, সত্তর বছর বয়সেও যাদের স্বভাব শোধরায়নি!
জয়ন্ত ঘাড় নেড়ে বললে, না সুন্দরবাবু, আমি সেকথা বলছি না। চোরেদের দলে যে বুড়ো আঙুল কাটা লোক আছে তাকে স্বচক্ষে দেখেছে আমরা এমন একজনকে জানি। মানিক, কুমোরটুলির চায়ের দোকানে কাজ করে, আমি সেই বেশি-খুশি লোকটির কথাই বলছি। সে তো সেই বুড়ো আঙুল কাটা লোকটিকে বুড়ো বলেনি!
সুন্দরবাবু দৃঢ়স্বরে বললেন, আঙুলের ছাপ মিথ্যা হতে পারে না।
জয়ন্ত বললে, আমার তাই বিশ্বাস। সেইজন্যই তো আমি আশ্চর্য হচ্ছি। তবে কি চোরেদের দলে দুজন বুড়ো আঙুল কাটা লোক আছে? না, তাই বা বিশ্বাস করি কেমন করে? কিন্তু এ ব্যাপারের মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু গোলমাল আছে?
হঠাৎ মানিক সভয়ে চিৎকার করে উঠল, সাপ, সাপ! অজগর সাপ! সুন্দরবাবু, সাবধান!
জয়ন্ত সচকিতে ফিরে দেখলে, বিপুল এক অজগর সাপ জানালার দুটো গরাদের মধ্যেকার শুন্য পরিপূর্ণ করে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করছে, এবং তার দুটো ক্ষুধিত চক্ষু দিয়ে ঠিকরে পড়ছে যেন হিংসার আগুন।
অজগরটা বিষম গর্জন করে সুন্দরবাবুকে লক্ষ করে এক ছোবল মারলে, কিন্তু তিনি তার আগেই বাপ বলে বিরাট এক লম্ফত্যাগ করে সরে গেলেন এবং লক্ষ্যচ্যুত অজগরের মাথাটা মাটির উপরে এসে সশব্দে আছড়ে পড়ল।
সেই ভয়াবহ অজগরের দেহের সাত-আট হাত অংশ ঘরের ভিতরে এসে পড়েছে, কিন্তু তখনও তার দেহের অপর অংশ জানলার বাইরেই অদৃশ্য হয়ে আছে! এমন প্রকাণ্ড অজগর তারা কেউ কখনও দেখেনি!
অজগরটা আবার এক প্রচণ্ড গর্জন করে বিদ্যুৎবেগে মাথা তুললে–এবারে তার জ্বলন্ত দৃষ্টি জয়ন্তের দিকে।
অসম্ভব মৃত্যু যেন মূর্তিমান হয়ে আজ এই ঘরের ভিতরে আচম্বিতে আবির্ভূত হয়েছে।
.
প্রতিশোধ চাই
অজগর আবার মাথা তুলেছে, তার ক্রুর ও তীব্র দৃষ্টি জয়ন্তের দিকে আকৃষ্ট!
