জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু, আপনি এখনও আমার কথা রূপকথা বলে মনে করছেন? বেশ, আসুন আমার সঙ্গে ঘরের ভেতরে!
সকলে আবার বৈঠকখানার দিকে অগ্রসর হল। কিন্তু ঘরের দরজার কাছে গিয়েই সুন্দরবাবু হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সন্দিগ্ধস্বরে বললেন, হুম! জয়ন্ত, যদি তোমার কথাই সত্যি হয়? ঘরের ভেতরে এখনও–ওই যে কি বললে–সেই গ্যাসটা যদি থাকে?
জয়ন্ত সহাস্যে বললে, না, সে গ্যাস এতক্ষণ থাকবার কথা নয়।
সুন্দরবাবু মাথা নেড়ে বললেন, না ভায়া, মনে তুমি খটকা লাগিয়ে দিয়েছ! প্রাণ বড় মূল্যবান জিনিস হে! ঘরের ভেতরে তুমিই আগে ঢোকো!
জয়ন্ত ও মানিক ঘরের ভিতরে প্রবেশ করল। সুন্দরবাবু দরজার ভিতর দিয়ে আগে ভয়ে ভয়ে মাথাটি গলিয়ে দিলেন, ভয়ে ভয়ে তিন-চারবার নিশ্বাস টেনে দেখলেন, তারপর অতি সন্তর্পণে পায়ে-পায়ে ঘরের ভিতরে গিয়েই ব্যস্ত স্বরে বললে, জানলা খুলে দাও–ঘরের ভেতরে বাইরের হাওয়া আসতে দাও।
মানিক জানালাগুলো খুলে দিলে।
জয়ন্ত ঘরের মেঝের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললে, দেখুন!
সুন্দরবাবু অবাক হয়ে দেখলেন, সদানন্দবাবুর ঘর থেকে জয়ন্ত যেরকম অতিসূক্ষ্ম কাচের টুকরো বা গুঁড়ো সংগ্রহ করেছিল, এখানেও ঘরময় তেমনি টুকরো ছড়িয়ে রয়েছে।
জয়ন্ত বললে, দেখুন সুন্দরবাবু, আর এক চোরের শাস্তি দেখুন!
সুন্দরবাবু ফিরে দেখলেন, চৌকির তলায় একটা বিড়াল চার পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে!
জয়ন্ত বললে, ও বিড়ালটা নিশ্চয় কিছু খাবারের লোভে এই ঘরে ঢুকেছিল। তারপর চৌকির তলায় গা-ঢাকা দিয়েছিল আমাদের সাড়া পেয়ে। হাইড্রোজেন আর্সেনাইডে-র মহিমায় এখন ওর অবস্থা কি হয়েছে দেখুন!
সুন্দরবাবু কপালে দুই চোখ তুলে আড়ষ্টভাবে বললেন, ও কি একেবারে মরে গিয়েছে?
একেবারে। ঘরের ভেতরে থাকলে আমাদেরও ওই অবস্থা হত।
সুন্দরবাবু খানিকক্ষণ স্তম্ভিত ও স্তব্ধ হয়ে রইলেন; এবং তারপর অভিভূত স্বরে বললেন, হুম! জয়ন্ত, আজ তুমি আমার প্রাণরক্ষা করলে! এখন আমার মনে হচ্ছে, তুমি সব সময়ে রূপকথা বলো না!
জয়ন্ত আহত স্বরে বললে, সুন্দরবাবু, রূপকথা বলবার বা শোনবার বয়স আমাদের কারুরই নেই। আমি যে রূপকথা বলি না, এর প্রমাণ আগেই আপনি পেয়েছেন। সেই শ্যামপুকুরের চুরির ব্যাপারটা নিশ্চয়ই আপনি ভুলে যাননি?
সুন্দরবাবু বললেন, না, না, ভুলিনি। সে ব্যাপারে তুমি যথার্থই বাহাদুরি দেখিয়েছিলে বটে! বর্ষার রাত্রে চোর চুরি করে পালিয়েছিল। বাগানের ভিজে মাটির একটা জায়গা দেখে তুমি বললে, চোর এইখানে পা হড়কে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছে। আমরা তোমার কথা গ্রাহ্য করলুম না। কিন্তু তুমি সেইখান থেকে চোরের দুটো হাতের, আর মুখের খানিকটার এমন সুন্দর প্লাস্টারের ছাঁচ তুললে যে, আমরা অবাক হয়ে গেলুম। পরে তোমার সেই ছাঁচের সাহায্যেই চোর ধরা পড়ে শাস্তি পায়! তোমার সে কেরামতির কথা কখনও আমি ভুলব না!
জয়ন্ত বললে, ভবিষ্যতেও আমার কথায় নির্ভর করলে আপনার ক্ষতি হবে না।
সুন্দরবাবু বললেন, কিন্তু ভায়া, আজ যে বড় ভয়ানক কথা শোনা গেল! ইউরোপে আমেরিকায় বৈজ্ঞানিক চোর আছে বলে শুনেছি, কিন্তু বাংলাদেশেও যে তারা দেখা দিতে পারে, এটা তো কখনও কল্পনাও করিনি। আর, এরা কেবল চোর নয়, দরকার হলে এরা মানুষ খুন করতেও ভয় পায় না!
জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু, আমার বিশ্বাস, কলকাতায় ভীষণ একটা দল গড়ে উঠেছে; সে দলের লোকেরা চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বা খুন-জখম করতে সর্বদাই প্রস্তুত। এদের যে দলপতি, সে হচ্ছে একজন শিক্ষিত লোক। মুকুন্দ নন্দীর গদিতে আর সদানন্দা বাবুর বাড়িতে যে চুরি হয়েছে, তা একই দলের কীর্তি!
সুন্দরবাবু চমকে উঠে বললেন, তোমার এমন আশ্চর্য বিশ্বাসের কারণ কি জয়ন্ত!
জয়ন্ত বললে, কারণ নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু আপাতত আপনাকে একটি কাজ করতে হবে। সদানন্দা বাবুর ঘরে যে কাচের গেলাস পাওয়া গেছে, তার উপরে কার আঙুলের ছাপ আছে, সেটা আপনি আবিষ্কার করবার চেষ্টা করুন। সেটা যদি কোনও পুরাতন পাপীর হাতের ছাপ হয়, তাহলে আমাদের অনেক পরিশ্রম বেঁচে যাবে। যদিও ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে একটা বিষয় আমি এর মধ্যেই আবিষ্কার করে ফেলেছি।
মানিক কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞাসা করলে, তুমি কি আবিষ্কার করেছ?
জয়ন্ত বললে, লোকে সাধারণত গেলাস ধরে ডান-হাতে। কিন্তু এ গেলাসের ওপর ছাপ আছে বাঁ-হাতের আঙুলের।
মানিক চকিত স্বরে বললে, বাঁ-হাতের আঙুলের! যে আমাদের চিঠি লিখে শাসিয়েছিল, সেও চিঠি লিখেছিল বাঁ-হাতে!
জয়ন্ত বললে, তার কারণও পরে আমরা জানতে পেরেছি। তার ডান-হাতের বুড়ো আঙুল নেই। এখন এটাও আমাদের জানা দরকার, এই গেলাসটা যে ব্যবহার করেছে, তারও ডান হাতের বুড়ো আঙুল আছে কিনা। অবশ্য, আমার এ সন্দেহ অমূলক হতেও পারে। কারণ সময়ে সময়ে আমরা সকলেই ডান-হাত থাকতেও বাঁ-হাতে গেলাস ধরে থাকি।
সুন্দরবাবু এতক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দুই চোখ অত্যন্ত বিস্ফারিত করে জয়ন্ত ও মানিকের কথাবার্তা শুনেছিলেন। এখন বললেন, হুম! তোমরা আবার হেঁয়ালির কথা কইতে শুরু করলে। কেন? ডান-হাত বাঁ-হাত,–এসবের অর্থ কি?
জয়ন্ত হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত ছড়িয়ে হাই তুলে বললে, বড্ড পরিশ্রম হয়েছে। সুন্দরবাবু! আজ আর কোনও কথা নয়। এখন আমি ওপরে গিয়ে একটু বিশ্রাম করব–অর্থাৎ বাঁশি বাজাব!
