আছে। তবে চোরেদের কারুর কিনা জানি না। গেলাসটা আপনি নিয়ে যান, আঙুলের ছাপের ফোটো তুলে দেখবেন, কিছু আবিষ্কার করতে পারেন কিনা!..চলো হে মানিক, আমরা বিদায় হই। হ্যাঁ, ভালো কথা! সুন্দরবাবু, দয়া করে যদি একবার আমার বাড়িতে আসেন, তাহলে আপনাকে একটা খুব দরকারি নতুন কথা শোনাতে পারি।
সুন্দরবাবু বললেন, তোমার কথা যদি নভেলের রূপকথা না হয়, তাহলে আমি যেতে পারি। মনে রেখো, আমরা পুলিশের লোক, রূপকথা শোনবার সময় নেই।
জয়ন্ত হেসে বললে, বেশ বেশ, আপনি যে পুলিশের একজন ছোটখাটো কর্তা, সে কথা আমি ভুলব না। আসতে আজ্ঞা হোক।
.
সকলে যখন জয়ন্তের বাড়িতে গিয়ে হাজির হল, তখনও বৃষ্টি থামেনি। সুন্দরবাবুকে বৈঠকখানায় বসিয়ে জয়ন্ত বললে, মানিক, তুমি সুন্দরবাবুদের সঙ্গে মিনিটকয়েক গল্প করো। আমি একবার পরীক্ষাগারের ভিতরে যেতে চাই।
সুন্দরবাবু অত্যন্ত ছটফটে লোক, চুপ করে বসে থাকা তার পক্ষে মস্ত শাস্তি। তিনি টেবিলের উপর থেকে একবার খবরের কাগজ তুলে নিলেন, দু-এক লাইন পড়েই আবার কাগজখানা ফেলে দিলেন। একবার একটা জানালা খুললেন, তারপর জলের ছাঁট আসছে দেখে জানালাটা আবার বন্ধ করে দিয়ে বললেন, হুম! মানিক ভায়া, আমার প্রতিমুহূর্ত মূল্যবান। আর আমি অপেক্ষা করতে পারব না!
মানিক বললে, ওই যে, চা আর টোস্ট নিয়ে এসেছে, একটু খেয়ে দেখুন না।
সুন্দরবাবু তৎক্ষণাৎ বসে পড়ে বললেন, হ্যাঁ, এ প্রস্তাব আমি সমর্থন করি। আরও খান দুই টোস্ট পেলেও আমি আপত্তি করব না।
মানিক হেসে বললে, খালি টোস্ট কেন, আপনি ডিম খান? মুরগির ডিম?
সুন্দরবাবু বললেন, হুম! মুরগির ডিম হচ্ছে উপাদেয় খাদ্য।
বেয়ারা তখনি আরও টোস্ট ও মুরগির ডিম দিয়ে গেল।
সুন্দরবাবু চা ও খাবার নিঃশেষ করে অত্যন্ত খোশমেজাজে মুখ পুঁছতে-পুঁছতে বললেন, এরপরে জয়ন্ত ভায়া যদি গোটাদুই রূপকথা বলেন, তাহলে পুলিশের লোক হয়েও আমি রাগ করব না!
এমনসময় জয়ন্ত ঘরের ভিতরে এসে ঢুকল–তার হাতে সেই কাগজের মোড়কটা। সে বললে, সুন্দরবাবু, এগুলো কি জানেন? কাচের বালবে-র ভাঙা টুকরো! এর ভেতরে কি ছিল জানেন? হাইড্রোজেন আর্সেনাইড..ও কী, ও কী!
হঠৎ একটা খড়খড়ির পাখি খোলার শব্দ হল–তার পরেই আরও তিন-চারটে অদ্ভুত শব্দ।
চোখের পলক না ফেলতেই জয়ন্ত দুটো প্রবল ধাক্কায় সুন্দরবাবু ও মানিককে ঘরের দ্বারপথ দিয়ে বাইরে ঠেলে দিলে এবং সেইসঙ্গে নিজেও একলাফে বাইরে গিয়ে পড়ল।
ঠেলা সামলাতে না পেরে মানিকের সঙ্গে সুন্দরবাবু ঠিকরে একেবারে উঠানে গিয়ে চিৎপাত হয়ে পড়লেন। কোনওরকমে উঠে বসে যন্ত্রণাবিকৃত ক্রুদ্ধস্বরে সুন্দরবাবু বললেন, জয়ন্ত! এর অর্থ কী?
জয়ন্ত শান্তস্বরে বললে, এর অর্থ আর কিছুই নয়, ও-ঘরে আর এক সেকেন্ড থাকলে হয়তো আমরা প্রাণে মারা পড়তুম!
বিস্ময়ে দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে সুন্দরবাবু বললেন, প্রাণে মারা পড়তুম?
হ্যাঁ। হাইড্রোজেন আর্সেনাইড।
.
স্বপ্নের অগোচর বিভীষিকা
সুন্দরবাবু হতভম্বের মতো বললেন, কি বললে? হাইড্রোজেন আর্সেনাইড?
হ্যাঁ।
সে আবার কি?
একরকম মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস। সদানন্দবাবুর ঘরে যে কাচের টুকরোগুলো পেয়েছি, সেগুলো যে খুব ছোট কাচের বালবে-র অংশ, একথা আগেই বলেছি। সেইরকম বালবের ভিতরে হাইড্রোজেন আর্সেনাইড ভরে কেউ এইমাত্র আমাদেরও ঘরে ফেলে দিয়ে গেছে।
সুন্দরবাবু বললেন, হুম! তোমার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। নভেল পড়ে পড়ে তোমার মাথা একেবারে খারাপ হয়ে গেছে।
জয়ন্ত মুখ টিপে হেসে বললে, সুন্দরবাবু, আমার মাথা নিয়ে আপাতত আপনি আর মাথা ঘামাবেন না। ব্যাপারটার গুরুত্ব এখনও আপনি আন্দাজ করতে পারেননি। আমরা যখন সদানন্দা বাবুর বাড়ি থেকে আসি, চোরেদের কেউ নিশ্চয় আমাদের পিছু নিয়েছিল। হঠাৎ আমি দেখলুম, জানালার খড়খড়ি তুলে ঘরের ভিতরে কে কি ছুঁড়ে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে বালব ফাটার শব্দ! তখন সবে আমি পরীক্ষা করে আন্দাজ করেছি সদানন্দবাবুর কাল রাতে ঘরে ঢুকে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন কেন! কাজেই চোখের পলক ফেলবার আগেই আসল ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমি আপনাদের নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে–অর্থাৎ পালিয়ে এলুম। একটু দেরি হলে আর রক্ষে ছিল না!
সুন্দরবাবু অবিশ্বাসের স্বরে বললেন, হুম! একটু দেরি হলে কি হত শুনি?
হয়তো আমরা প্রাণে বাঁচতুম না।
হুম! কিন্তু সদানন্দবাবু তো কেবল অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন!
সদানন্দবাবু ঘরে ঢুকেই খোলা দরজার কাছে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। চোরেরা ঠিক সময়ে বালব ছুঁড়তে পারেনি। বদ্ধঘরে হাইড্রোজেন আর্সেনাইড গ্যাস অব্যর্থ। সদানন্দবাবু খোলা দরজার কাছে ছিলেন বলেই গ্যাসটা তাকে ভালো করে কাবু করতে পারেনি।
মানিক বললে, কিন্তু ঘরের ভিতরে চোরেরা তো ছিল?
জয়ন্ত বললে, যে-সব চোরের এত বেশি বৈজ্ঞানিক শিক্ষা থাকে, তারা আগে থাকতেই প্রস্তুত হয়ে যায়। নিশ্চয়ই তারা গ্যাস-মুখোশ ব্যবহার করেছিল।
সুন্দরবাবু কষ্টেসৃষ্টে এতক্ষণে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বিকৃত মুখভঙ্গি করে বললেন, দেখো জয়ন্ত, তোমার রূপকথা বরং সহ্য করতে পারি, কিন্তু ভবিষ্যতে আমার ভুঁড়ির ওপরে তুমি আজকের মতো এতজোরে ধাক্কা মেরো না। ভুড়ির ওপরে ধাক্কা আমি পছন্দ করি না।
