আশ্চর্য! কিন্তু ঘরে ঢুকেই তিনি অজ্ঞান হয়ে যান কেন?
এখনও সেটা জানতে পারিনি।…সদানন্দবাবুর জুয়েলারি ব্যবসা আছে, সুতরাং তার লোহার সিন্দুকে যে হীরে-মুক্তা-চুনি-পান্নার অভাব ছিল না, এটুকু অনায়াসেই কল্পনা করতে পারি। চোর এসেছিল খিড়কির দরজা দিয়ে। আপাতত এর বেশি আর কিছু জানি না। সদানন্দবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ আছে, তিনি আমাকেও ডেকে পাঠিয়েছেন, পুলিশেও খবর দিয়েছেন।
আরও খানিক পথ চলেই দুজনে ঘটনাস্থলে এসে হাজির হল। তখনও পুলিশ আসেনি, উপরে খবর দিয়ে জয়ন্ত বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল।
শয়ন-ঘরে একখানা ইজিচেয়ারের উপরে সদানন্দবাবুর শুকনো মুখে হতাশভাবে শুয়ে ছিলেন, জয়ন্তকে দেখেই মাথা নেড়ে হাহাকার করে উঠলেন।
সে হাহাকার জয়ন্তের কানে ঢুকল বলে মনে হল না, সে নস্যদানি থেকে নস্য নিতে নিতে ঘরের চারিদিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পরীক্ষা করতে লাগল।
ঘরখানি খুব ছোটখাটো, একটা লোহার সিন্দুক ও টুলের উপরে একটা কুঁজো ছাড়া আসবাব-পত্তর আর কিছুখাটো, একটা লেহ করতে লাগল
লোহার সিন্দুকটা ভালো করে দেখে জয়ন্ত মৃদুস্বরে বললে, মানিক, কলকাতায় বৈজ্ঞানিক চোরের দল ক্রমেই পুরু হয়ে উঠছে। এই লোহার সিন্দুক খোলবার জন্যে oxy-acetylene torch ব্যবহার করা হয়েছে। মুকুন্দ নন্দীর গদিতেও চোরেরা ঠিক এই উপায়ই অবলম্বন করেছিল।
মানিক চমকে উঠে জয়ন্তের মুখের পানে তাকিয়ে রইল।
এমন সময় নীচে একটা গোলমাল উঠল, তার পরেই সিঁড়ির উপরে একাধিক লোকের পায়ের শব্দ শোনা গেল।
জয়ন্ত বললে, পুলিশ এসেছে। এখনি আমাদের পুরোনো বন্ধু ইন্সপেক্টর সুন্দরবাবুর আবির্ভাব হবে।
ইন্সপেক্টার সুন্দরবাবু সদলবলে উপরে এসে হাজির হলেন। সম্ভবত তাঁর পিতৃদেব ঠাট্টা করেই ছেলের নাম রেখেছিলেন–সুন্দর। কারণ, তার দেহ যেমন বেঁটে তেমনি মোটা এবং গায়ের রং নিগ্রোদের চেয়ে বেশি ফরসা নয়। চোখ আর নাক প্রায় চিনেম্যানদের মতো এবং শোনা যায়, জন্মগ্রহণের পরে তার মাথায় কেউ কোনওদিন একগাছি চুলও দেখতে পায়নি।
জয়ন্তকে দেখেই সুন্দরবাবু একগাল হেসে বললেন, এই যে শখের টিকটিকি ভায়ারা যে! চোরের ঠিকুজি বোধহয় জানতে পেরেছ?
জয়ন্ত বললে, আজ্ঞে না, আপনার আগে চোর ধরব, এমন সাধ্য আমাদের নেই।
সুন্দরবাবু খুশি হয়ে বললেন, তা সত্যিকথা ভায়া। শখের গোয়েন্দাগিরি আর শার্লক হোমসের বাহাদুরি নভেলেই ভালো লাগে, আসলে তার কোনও দামই নেই। যাক সে কথা। কই, কোন সিন্দুক ভেঙে চুরি হয়েছে দেখি!
সিন্দুকটার দিকে তাকিয়েই সুন্দরবাবু বললেন, হুম! ওর ভেতরে কত টাকা ছিল?
সদানন্দবাবু বিহুলের মতো হাহাকার করতে লাগলেন।
সুন্দুরবাবু ধমক দিয়ে বললেন, ওসব কান্না-টান্না এখন রাখুন মশাই। কাজের কথা বলুন। কী চুরি গেছে?
সদানন্দবাবু অনেক কষ্টে হাহাকার থামিয়ে জানালেন, চোরেরা চারখানা হাজার টাকার নোট ও প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার জড়োয়া গয়না নিয়ে গেছে।
সুন্দরবাবু বললেন, বেশ করেছে। অত টাকার জিনিস এখানে রেখেছিলেন কেন? চোরকে লোভ দেখিয়ে পুলিশের কাজ বাড়াবার জন্যে?…আপনি আর যা জানেন বলুন।
সদানন্দবাবু যা বললেন, জয়ন্তের কাছ থেকে মানিক আগেই তা শুনেছিল।
সুন্দরবাবু বললেন, হুম! কিন্তু ঘরে ঢুকেই আপনি কচিখোকার মতো অজ্ঞান হয়ে গেলেন কেন?
জানি না। কীসের একটা শব্দ হল, আর অমনি আমার সর্বাঙ্গ কীরকম করে উঠল। তারপর কি হল, আমার মনে নেই!
হুম! তাহলে কোনও লোককে আপনি দেখতে পাননি?
কী করে দেখব, ঘরে আলো ছিল না।
তারপর চাকর-দ্বারবানের ডাক পড়ল। তারা কিছুই জানে না।
সুন্দরবাবু বললেন, হুম! সেপাই, এ দুই বেটাকে বেঁধে থানায় নিয়ে চলো৷…ওকী, জয়ন্ত ভায়া, ঘরের মেঝেয় তুমি হামাগুড়ি দিচ্ছ কেন? তোমার আবার কি হল?
জয়ন্ত ঘরের মেঝে থেকে সযত্নে কিকতকগুলো তুলে একটা কাগজে মুড়ে রেখে বললেন, এখানে অনেক কাচের টুকরো পড়ে রয়েছে। সেগুলো কুড়িয়ে তুলে রাখলুম।
সদানন্দবাবু সবিস্ময়ে বললেন, আমার ঘরে কাচের টুকরো কেমন করে এল?
সুন্দরবাবু বললেন, কই, দেখি একবার টুকরোগুলো!
জয়ন্ত দেখালে। সেগুলো এত ছোট যে, কাচের টুকরো না বলে কাচচূর্ণ বলাই উচিত, খুব পাতলা ও হালকা কাচের গুঁড়ো।
সুন্দরবাবু হা হা করে হেসে উঠে বললেন, ফেলে দাও ভায়া, ফেলে দাও! ওগুলো হীরকচূর্ণ নয় যে এত যত্ন করে নিয়ে যাচ্ছ।
জয়ন্ত বললে, এগুলো হীরকচূর্ণ হলে এত যত্ন করে নিয়ে যেতুম না।
সুন্দরবাবু হতাশভাবে একটা মুখভঙ্গি করে এবং সদানন্দবাবুকে আরও গোটাকয়েক প্রশ্ন করে উঠে দাঁড়ালেন।
জয়ন্ত বললে, সদানন্দবাবু, আপনার জলের কুঁজোর পাশে একটা কাচের গেলাসে আধগ্লাস জল রয়েছে। ও জল কি আপনি পান করেছিলেন।
সদানন্দবাবু বললেন, না। কাল থেকে আজ পর্যন্ত আমি ও-গেলাসটা হাতে করিনি। গেলাসটা তো বরাবর কুঁজোর মুখে ঢাকা দেওয়াই থাকে, ওটাকে নামিয়ে রাখলে কে, তাও জানি না।
জয়ন্ত এক টিপ নস্য নিলে। তারপর সাবধানে গেলাসের তলাটা ধরে জানালার কাছে। গিয়ে দাঁড়াল এবং ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে গেলাসটা পরীক্ষা করতে লাগল।
সুন্দরবাবু একটি ছোটখাটো লাফ মেরে তাড়াতাড়ি বললেন, হুম! সাধু শার্লক হোমস! ও বুদ্ধি তো আমার মাথায় ঢোকেনি। ওতে আঙুলের ছাপ আছে নাকি?
