তার পরেই পূর্ণবাবু সভয়ে দেখলেন, রিভলভারটা মাটির উপর থেকে আবার শূন্যে লাফিয়ে উঠল। চোখের নিমেষে বাকি পাহারাওয়ালারা আবার অদৃশ্য হল এবং পূর্ণবাবু এবারে খিড়কির দরজা দিয়ে একেবারে বাড়ির বাইরের দিকে দৌড় দিলেন! দুম করে রিভলভারের একটা শব্দ হল–কিন্তু সে গুলিও তাকে স্পর্শ করতে পারলে না!
পঞ্চদশ । অদৃশ্য মানুষ দৃশ্যমান হল
পূর্ণবাবু মাঠের উপর দিয়ে ছুটছেন ঝড়ের মতন বেগে! রিভলভারের লক্ষ্যকে ব্যর্থ করবার জন্যে তিনি সাপের মতন এঁকেবেঁকে ছুটতে লাগলেন। খানিক দূর গিয়ে মুখ ফিরিয়েই তিনি দেখতে পেলেন, সেই নাছোড়বান্দা রিভলভারটা তখনও বেগে তার অনুসরণ করছে।
সে এক অদ্ভুত দৃশ্য! ছুটন্ত মানুষ ও তার পিছনে শূন্যপথে উড়ন্ত রিভলভার! বাজারের একখানা ছবিতে দেখা যায়, ভীত পরশুরামের পিছনে বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র শূন্য-পথে তেড়ে আসছে। এ-দৃশ্যও অনেকটা সেইরকম!
রিভলভার আরও দুবার অগ্নিময় ধমক দিলে, কিন্তু তাও ব্যর্থ হল! অদৃশ্য মানুষ নিশ্চয়ই রিভলভার ছোঁড়ায় অভ্যস্ত ছিল না, তাই এবারের মতো পূর্ণবাবু কোনও গতিকে প্রাণে বেঁচে গেলেন! কিন্তু তবু সে পূর্ণবাবুর পিছু ছাড়লে, খালি-রিভলভারটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তাঁকে ধরবার জন্যে আরও জোরে অদৃশ্য পা দুটো চালিয়ে দিলে।
.
আমাদের ডাক্তার মানিকবাবু সেদিন পথের ধারে একটা পুকুর-ঘাটে বসে নিজের মনে মাছ ধরছিলেন। মানিকবাবুর জীবনে এই একটি মাত্র শখ আছে। আর তার এশখ এমন দুর্দান্ত যে, তিনি শীত গ্রীষ্ম মানতেন না, যে-কোনও পুকুর-ঘাটে গিয়ে ছিপ নিয়ে বসে পড়তেন। কিন্তু এমন একজন অকৃত্রিম মাছ-শিকারির উপরে মাছের দল মোটেই সদয় ছিল না–ঘাটের উপরে তাকে দেখলেই তারা যেন তার ছিপকে বয়কট করত। কিন্তু সেজন্যে মানিকবাবুর উৎসাহ কিছুমাত্র কমে না! কেউ ঠাট্টা করলে উলটে বলেন, ওহে, মাছ ধরতে গেলেই যে মাছ ধরতে হবে, এর কিছু মনে আছে? তোমরা তো রোজ কতরকম মন্ত্র পড়ে ভগবানকে ডাকো, কিন্তু ভগবান তোমাদের দেখা দেন কি? এমন অকাট্য যুক্তির উপরে কারুর আর কোনও কথা বলবার থাকত না।
মানিকবাবু একমনে মাছ ধরছেন–অর্থাৎ ধরবার চেষ্টা করছেন, এমন সময়ে দ্রুত পদশব্দ শুনে মানিকবাবু মুখ তুলে দেখলেন, ভয়-ব্যাকুল পূর্ণবাবু পথের উপর দিয়ে তিরবেগে ছুটে চলেছেন এবং ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে বলছেন, অদৃশ্য মানুষ! অদৃশ্য মানুষ!
পুকুর-ঘাটে বসে মানিকবাবুর আর বেশি কিছু শোনবার দরকার হল না। তখন জলের মাছ ডাঙায় না তুলে, অদ্ভুত একটা ডিগবাজি খেয়ে ডাঙার মানুষ মানিকবাবু ঝপ করে একেবারে জলের ভিতরে প্রবেশ করলেন।
মাছেরা সেদিন কি ভাবলে জানি না। হয়তো তারা ভাবলে, ডাঙায় বসে রোজ বিফল হয়ে মানিকবাবু রাগ করে আজ তাদের ধরবার জন্যেই জলের ভিতরে ঝাঁপ দিয়েছেন!
মাছেরা কি ভাবলে আর না ভাবলে সেটা ভাববার অবসর মানিকবাবুর মোটেই রইল না। কারণ তিনি সাঁতার জানতেন না। জলের ভিতরে প্রবেশ করেই সে কথাটা তার মনে পড়ল। ভুড়ি ভরে জল খেতে খেতে একখানা নিরেট জগদ্দল পাথরের মতো ক্রমেই তিনি নীচের দিকে নামতে লাগলেন। তারপরেই হঠাৎ তার মনে হল, জলের ভিতরে এত নীচে নামা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। পাগলের মতন দুবার হাত-পা ছুঁড়তেই তার দেহটা আবার উপর দিকে উঠতে লাগল।
পুকুরের ধারে একটা মস্ত বটগাছ জলের ভিতরে অনেকগুলো ঝুরি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়েছিল– জলে ঝুরি ঝুলিয়ে সেও যেন মাছ ধরবার চেষ্টা করছে! ভাগ্যে মানিকবাবুর দেহটা ঠিক সেইখানেই ভস করে ভেসে উঠল, তাই বটের ঝুরি ধরে সে-যাত্রা মানে মানে তিনি তার পৈতৃক প্রাণটি রক্ষা করলেন।
মানিকবাবু নিজের মনে বললেন, বাপ! যে জলটা, আজ খেয়েছি, এ জীবনে বোধ হয় আর জল-তেষ্টা পাবে না! অদৃশ্য মানুষের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে শেষটা আজ আত্মহত্যা করেছিলুম আর কি!…কিন্তু পূর্ণবাবুর কি হল?
মানিকবাবু ভয়েভয়ে চারিদিক তাকিয়ে দেখলেন, কিন্তু পূর্ণবাবুর কোনও পাত্তাই পাওয়া গেল না!
কিন্তু ওদিকে ইতিমধ্যেই পাশা উলটে গেছে!
পূর্ণবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাহারাওয়ালারা থানায় গিয়ে খবর দিয়েছে এবং সেখান থেকে দলে-দলে সেপাই পূর্ণর্বাবুকে রক্ষা করবার জন্যে ছুটে এসেছে।
এখন পালাবার পালা হচ্ছে অদৃশ্য মানুষের।
কিন্তু পাছে সে আবার ফাঁকি দেয় সেই ভয়ে পূর্ণবাবু সেপাইদের ডেকে চেঁচিয়ে বললেন, শিগগির! হাতধরাধরি করে সবাই গোল হয়ে দাঁড়াও! অদৃশ্য মানুষ এর মধ্যেই আছে!
সকলে তাড়াতাড়ি পূর্ণবাবুর কথামতো কাজ করলে।
পূর্ণবাবু আবার বললেন, সবাই ধীরে-ধীরে এগিয়ে এসে চক্রটাকে ছোট করে আনন। তাহলে অদৃশ্য মানুষ আর পালাতে পারবে না! তার কথা শেষ হতে না হতেই বিপুল বিক্রমে অদৃশ্য মানুষ আগে তাকেই আক্রমণ করলে! এবারে পূর্ণর্বাবুও তাকে ছাড়লেন না, তার অদৃশ্য দেহটাকে তিনি দুই হাতে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলেন! তার পর দুজনে জড়াজড়ি করে পথের উপরে গিয়ে পড়লেন।
সেপাইরা সবাই ছুটে এল হাত দিয়ে অনুভব করে সকলে মিলে অদৃশ্য মানুষের মাথা, গলা, বুক, বাহু, কোমর, জানু ও পা সজোরে চেপে ধরলে!
অদৃশ্য মানুষ একবার যন্ত্রণা-বিকৃত বদ্ধ স্বরে চিৎকার করে উঠল, উঃ! গেলুম!– তারপরে তার সমস্ত দেহ একেবারে স্থির হয়ে গেল।
