পূর্ণবাবু বলে উঠলেন, ওকে ছেড়ে সরে দাঁড়াও! ও আহত হয়েছে–আর পালাতে পারবে না!
সেপাইরা কেউ কেউ বললে, বদমাইশটা দুষ্টুমি করে চুপ করে আছে, ছেড়ে দিলেই পালাবে!
পূর্ণবাবুর ঠোঁট কেটে রক্ত ঝরছিল, তার শরীরেও নানা জায়গায় কাটাকুটির দাগ! সেই অবস্থাতে তিনি উঠে অদৃশ্য মানুষের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আন্দাজে তার বুকের উপরে হাত দিয়ে বললেন, না, বিধু আর পালাতে পারবে না! এর হৃৎপিণ্ড স্থির হয়ে গেছে! এ আর বেঁচে নেই!
তখন শ্রীপুর শহরের সমস্ত লোক সেইখানে এসে জড়ো হয়েছিল। সকলেরই মুখে বিস্ময় ও আতঙ্ক! সকলেই নানারকম কথা বলে চ্যাঁচামেচি করছে!
একটা বুড়ি ভিড়ের ভিতর হুমড়ি খেয়ে পড়ে অদৃশ্য মানুষকে দেখবার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ সে ভীত স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, আমি ওকে দেখতে পেয়েছি, আমি ওকে দেখতে পেয়েছি!
বুড়ির কথা শুনে পূর্ণর্বাবুও সচকিত দৃষ্টিতে দেখলেন, পথের ধুলোর উপরে কাচের মতন স্বচ্ছ একখানা মানুষের হাত ক্রমেই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেখতে দেখতে তার স্বচ্ছতা দূর হয়ে গেল, তখন তাকে দেখাতে লাগল ঠিক যেন ঘষা কাচের একখানা হাতের মতো।
একটা সেপাই বলে উঠল, আরে, আরে ওর পা-দুটোও যে দেখা যাচ্ছে!
দেখতে-দেখতে সকলের স্তম্ভিত চক্ষের সামনে অদৃশ্য মানুষের সমস্ত দেহটাই মায়াময় ছায়ার মতন ফুটে উঠল! তারপর ধীরে ধীরে সেই ছায়াটা ক্রমেই ঘন ও নিরেট হয়ে উঠল। তারপর অদৃশ্য মানুষ যখন স্পষ্ট রূপে দৃশ্যমান হল, তখন সে রক্তমাংসের সম্পূর্ণ গঠন ফিরে পেয়েছে।
যে ওষধির প্রক্রিয়ায় তার জীবন্ত দেহ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, মরণ সেই ওষধির গুণ নষ্ট করে তার রক্ত-মাংসে গড়া দেহকে পৃথিবীর ধূলায় আবার ফিরিয়ে দিয়ে গেল!
পথের উপরে শুয়ে আছে একটি তিরিশ বছর বয়সের যুবা পুরুষ–তার সমস্ত দেহে আঘাতের দাগ এবং তার মুখে-চোখে নিরাশা ও ক্রোধের চিহ্ন!
পূর্ণবাবু দুই হাতে মুখ ঢাকা দিয়ে বলে উঠলেন, ওর মুখে কাপড় ঢাকা দাও–দোহাই তোমাদের! ওর মুখে কাপড় ঢাকা দাও!
পৃথিবীতে প্রথম যে মানুষ অপূর্ব বুদ্ধি ও জ্ঞানের প্রসাদে রক্ত-মাংসে গড়া নিরেট দেহকে অদৃশ্য করবার অদ্ভুত উপায় আবিষ্কার করেছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে এমনি শোচনীয় ভাবে সে তার ভারবহ, ভীষণ জীবন সমাপ্ত করলে।
ষোড়শ । উপসংহার
বাবু বংশীবদন বসুকে তোমরা নিশ্চয়ই কেউ ভোলেনি।
তোমাদের কারুর যদি তার সঙ্গে দেখা করবার সাধ হয়, তাহলে চুপিচুপি পা টিপে টিপে আমার সঙ্গে এসো। গোলমাল করলে তার দেখা পাবে না, কারণ তোমরা যে তাকে আগে থাকতে চেনেনা একথা টের পেলেই তিনি তাড়াতাড়ি পালিয়ে যেতে পারেন।
শ্রীপুরের পান্থনিবাস হোটেলে আমার সঙ্গে এসো। ওই দেখো, হোটেলের হল-ঘরের মাঝখানে, একখানা ইজিচেয়ারের উপরে পরম আয়েসে বসে বংশীবাবু কেমন মিষ্টি মিষ্টি হাসি হাসছেন! বংশীবাবু এখন দাঁতব্য জুতো ও ময়লা জামা-কাপড়কে অত্যন্ত ঘৃণা করেন। তাঁর মাথায় এখন চমৎকার টেরি কাটা গায়ে ইস্ত্রি করা সিল্কের পাঞ্জাবি পরনে কেঁচানো শান্তিপুরি ধুতি ও পায়ে বার্নিশ করা চকচকে জুতো! আর, তোমরা শুনলে বোধ হয় অবাক হয়ে যাবে যে, এতবড় পান্থনিবাস হোটেলটির একমাত্র মালিক হচ্ছেন, এখন কেবল তিনিই! পান্থনিবাসের এখন এমন পসার যে, শ্রীপুরের কোনও লোক স্বাস্থ্যনিবাসের নাম আর মুখেও আনে না।
এজন্যে বংশীবাবু বড়ই খুশি। যখন-তখন একগাল হেসে মাথা নেড়ে বলেন, হুঁ হুঁ বাবা, ঘুঘু দেখেছ ফঁদ তো দেখোনি! আমার ময়লা জামাকাপড় আর ছেঁড়া জুতো দেখে মিস্টার দাস ভারি তাচ্ছিল্য করেছিলেন। এখন বোধ হয় তিনি বংশীবদনের মহিমা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন!
তার হোটেলে বসে কেউ অদৃশ্য মানুষের নিন্দা করলে তিনি মুখভার করে বলেন, ওগো, তোমরা সবাই থামো! আমি গুরু-নিন্দা শুনব না! তোমরা যাঁকে অদৃশ্য মানুষ বলছ, তিনি ছিলেন আমার গুরুদেব! তার আশীর্বাদেই আজ আমার এত বাড়-বাড়ন্ত! বংশীবাবুর গুরুভক্তি দেখে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নাই। অদৃশ্য মানুষের হুকুমে শ্রীপুর ব্যাঙ্ক থেকে নোটপ্রজাপতিগুলো ফরফর করে উড়ে গিয়ে বংশীবাবুর পকেটে যে বাসা বেঁধেছিল, একথা কেউ না জানুক, তোমরা সকলে নিশ্চয় জানেনা। অতএব এসো, আমরাও সবাই মিলে বংশীবাবুর গুরুজির জয় দিয়ে পালা সাঙ্গ করি!
অমানুষিক মানুষ (উপন্যাস)
প্রথম। শিকারির স্বর্গে
কলের গাড়ি, কলের জাহাজ, উড়োজাহাজ আর হাওয়াগাড়ির দৌলতে দুনিয়ার কোনও দেশই আজ আর অজানা নয়। ভূগোল সারা পৃথিবীর কোনও দেশের কথাই বলতে বাকি রাখেনি। পৃথিবীর বাইরে মঙ্গল প্রভৃতি গ্রহেরও মানুষ জীব আবিষ্কার করেছে। পণ্ডিতদের বিশ্বাস, ত্রিভুবন আজ তাদের নখদর্পণে।
পণ্ডিতদের বিশ্বাসকে অবহেলা করছি না। কিন্তু তবু আমি বিশ্বাস করি যে, পণ্ডিতদের জ্ঞানরাজ্যের বাইরে এমনও এমন সব অজানা, অচেনা দেশ আছে, ভূগোলে যার কথা লেখা হয়নি। এ কথার উত্তরে ইস্কুলের মাস্টারমশাইরা হয়তো আমাকে রুখে বকতে আসবেন কিন্তু তার আগেই তারা যদি দয়া করে আমার এই আশ্চর্য ইতিহাস শোনেন, তাহলে অত্যন্ত বাধিত হব। মুখের কথায় সত্যকে অস্বীকার করলেও, উড়িয়ে দেওয়া চলে না।
লোকে বাঙালিকে কুনো বলে। আমার মতে, বাঙালি সাধ করে কুনো হয়নি, কুনো হয়েছে বাধ্য হয়ে। ভারতবর্ষের আর সব জাতি পেটের ধান্দায় যত সহজে দেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে, বাঙালিরা তা পারে না কেন? বাঙালির আত্মসম্মান জ্ঞান বেশি বলে। উড়িয়ারা বিদেশে গিয়ে পালকি বইতে বা মালি কি বেয়ারা হতে একটুও দ্বিধাবোধ করে না। মাড়োয়ারিরা কলকাতায় এসে মাথায় ঘিয়ের মটকা, খাবারের থালা বা কাপড়ের মোট নিয়ে পথে-পথে ফিরি করতে লজ্জা পায় না। ভারতের আরও অনেক বড় জাতির লোকেরা ফিজি দ্বীপে, আফ্রিকায় বা দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়ে অম্লানবদলে কুলিগিরি করে। এইখানে বাঙালির বাধে। ছোট কাজে সে নারাজ। অন্য জাতের লোকেরা পরে বড় হবার জন্যে আগে ছোট হতে অস্বীকার করে না, কিন্তু বাঙালি বড় হবার লোভেও বিদেশিদের কাছে সহজে মাথা নীচু করতে চায় না। ফিরিওয়ালা হব? কুলিগিরি করব? রামচন্দ্র! এই হল বাঙালিজাতের মনের ভাব। মান বাঁচিয়ে বাঙালি কুনো অপবাদও সইতে রাজি।
