দুজনে সিঁড়ি দিয়ে উপরে গিয়ে ওঠবার আগেই শুনলেন, একটা ঘরের ভিতর থেকে ঝনঝন করে সার্সি-ভাঙার আওয়াজ এল!
দুজনে সে ঘরে গিয়ে ঢুকতে-না-ঢুকতেই আরও দুখানা সার্সির কাচ ভেঙে পড়ল!
পূর্ণবাবু বিবর্ণ মুখে বললেন, বিধু তার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেছে। আমার বাড়ি অবরোধ শুরু হল!
দারোগা বললেন, বাড়ির বাইরে থেকে কোনও কিছু ধরে কেউ উপরে উঠতে পারবে না তো?
টিকটিকি আর পাখি ছাড়া আর কেউ পারবে না।
দুমদাম, ঝনঝনাঝন, ঠকঠকাঠক! বড় বড় ঢিল বৃষ্টি হচ্ছে, কতকগুলো সার্সি ভাঙল, গুণে বলা দায়! অদৃশ্য মানুষকে দেখা যাচ্ছে না, বাড়ির ভিতরে ঢুকতে না পেরে সে ঢিল ছুঁড়েই মনের আক্রোশ মিটিয়ে নিচ্ছে!
পূর্ণবাবু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, এখন কি করা যায় বলুন দেখি?
দারোগা বললেন, একটা উপায় আমার মনে হচ্ছে। আপনি কাল বললেন না যে, কুকুররা অদৃশ্য মানুষের গন্ধ পায়?
হ্যাঁ।
আমার তিনটে ডালকুত্তা আছে। বলেন তো নিয়ে আসি। তারা চোখে দেখতে না পেলেও ঠিক ওই দুরাত্মাকে ধরে ফেলবে!
কিন্তু বাইরে যাবেন কেমন করে? বিধু যে পথ আগলে আছে!
আপনার রিভলভারটা যদি দেন, তাহলে ঠিক আমি যেতে পারব। রিভলভারটা দেখলে ও বদমাইশ নিশ্চয়ই আমার কাছে আসবে না।
পূর্ণবাবু অত্যন্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও রিভলভারটা দারোগার হাতে সমর্পণ করলেন। তারপর নীচে নেমে আচমকা সদর-দরজাটা খুলে দারোগাকে বার করে দিয়েই তখনি আবার দরজা বন্ধ করে দিলেন।
দারোগা পূর্ণবাবু বাড়ির ডানদিকের মাঠ দিয়ে সাবধানে চারিদিকে চোখ রেখে অগ্রসর হলেন।
হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর বললে, তুমি দাঁড়াও!
দারোগা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে রিভলভারটা মুঠোর ভিতরে চেপে ধরলেন।
কণ্ঠস্বর বললে, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
বুকের ধুকপুকুনি সামলে নিয়ে দারোগা মুখসাবাসি দেখিয়ে বললেন, সে খবরে তোমার দরকার কী?
পরমুহূর্তেই দারোগার নাকের উপরে যেন একটা পাঁচ সের ওজনের ঘুষি এসে পড়ল। ধপাস করে মাটির উপরে বসে পড়ে যখন তিনি চোখের সামনে রাশি রাশি সর্ষেফুল ফোঁটা দেখতে লাগলেন, তখন হঠাৎ কার অদৃশ্য হস্ত এসে তার হাত থেকে রিভলভারটা ছিনিয়ে নিলে!
কণ্ঠস্বর বললে, যাও, বাড়ির ভেতরে ফিরে যাও! নইলে–
দারোগা হতাশ ভাবে মুখ তুলে দেখলেন, যেন কোনও জাদুবিদ্যার বলেই শূন্যে একটা রিভলভার স্থির হয়ে আছে–তার নলচেটা তাঁরই দিকে ফেরানো!
কণ্ঠস্বর বললে, উঠে দাঁড়াও! আমার সঙ্গে কোনওরকম চালাকি খেলতে এসো না! মনে রেখো, তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ না, কিন্তু আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি। সুড়সুড় করে ভালোমানুষটির মতন বাড়ির ভেতরে ফিরে যাও!
দারোগা বললেন, পূর্ণবাবু আর আমাকে দরজা খুলে দেবেন না।
কণ্ঠস্বর বললে, কিন্তু তোমাকে ফিরে যেতেই হবে! নইলে তুমি লোকজন ডেকে নিয়ে আসবে! তোমার সঙ্গে আমার কোনও ঝগড়া নেই, কিন্তু আমার কথা না শুনলে তোমাকে আমি বধ করতে বাধ্য হব।
দারোগা আচমকা এক লাফ মেরে রিভলভারটা অদৃশ্য হাত থেকে কেড়ে নিতে গেলেন– সঙ্গে সঙ্গে রিভলভারের মুখ থেকে দপ করে বিদ্যুৎশিখা জ্বলে উঠল এবং পর মুহূর্তে দারোগার দেহ ঘুরে মাটির উপরে আছাড় খেয়ে পড়ে আড়ষ্ট হয়ে রইল।
দোতালার একটা জানলার পাল্লা ফাঁক করে পূর্ণবাবু সমস্ত দৃশ্যই দেখছিলেন। এবং ইতিমধ্যেই টেলিফোনে সাহায্যের জন্যে তিনি থানায় খবর দিয়েছিলেন। দারোগার পতনের পর রিভলভারটা সেখানেই শূন্যে দুলতে লাগল, এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে পূর্ণবাবু তাড়াতাড়ি নীচে নেমে গিয়ে দেখলেন, থানা থেকে চারজন পাহারাওয়ালা এসে হাজির হয়েছে। তিনি চট করে তাদের ভিতরে এনে আবার দরজা বন্ধ করে দিয়ে বললেন, তোমাদের দারোগা আর বেঁচে নেই। অদৃশ্য মানুষের হাতে রিভলভার আছে। খুব সাবধান!
বাড়ির পিছন দিকের একটা দরজার উপরে দুমদুম করে পদাঘাতের শব্দ হতে লাগল। খিড়কির সে দরজাটা তেমন মজবুত ছিল না–অদৃশ্য মানুষ বোধ হয় সেটা আবিষ্কার করে ফেলেছে।
পাহারাওয়ালাদের নিয়ে পূর্ণবাবু সেই দিকে ছুটলেন কিন্তু তার আগেই খিড়কির দরজার পলকা খিলটা সশব্দে ভেঙে গেল!
পূর্ণবাবু চিৎকার করে বললেন, অদৃশ্য মানুষ বাড়ির ভেতরে ঢুকল! মনে রেখো, তার হাতে রিভলভার আছে!
পাহারাওয়ালারা দুহাতে লাঠি ধরে এদিকে-ওদিকে লুকিয়ে একেবারে প্রস্তুত হয়ে রইল। উপর উপরি দু-বার রিভলভারের গর্জন শোনা গেল! কিন্তু তার আগেই পূর্ণবাবু তড়াক করে মস্ত লাফ মেরে একটা ঘরে ঢুকে পড়ে সে-যাত্রা প্রাণ রক্ষা করলেন।
অদৃশ্য মানুষকে দেখা গেল না বটে কিন্তু এটা দেখা গেল যে একটা চকচকে রিভলভার শূন্যপথে থেকে থেকে ক্রমেই এগিয়ে আসছে!
হঠাৎ একটা পাহারাওয়ালা গুপ্ত স্থান থেকে বেরিয়ে রিভলভারের পিছনদিকে প্রচণ্ড এক লগুড়াঘাত করলে। একটা যন্ত্রণাময় চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে রিভলভারটা ছিটকে তফাতে গিয়ে পড়ল! অদৃশ্য মানুষের হাতে আর রিভলভার নেই দেখে পূর্ণবাবু ও অন্য তিনজন পাহারাওয়ালাও আবার বাইরে বেরিয়ে এল।
যতক্ষণ অদৃশ্য মানুষের হাতে রিভলভারটা ছিল ততক্ষণ তবু তার একটা ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু এখন সে যে কোথায় আছে সে-রহস্য কিছুই বোঝা গেল না।
কিন্তু যে পাহারাওয়ালা তার হাতে লাঠি মেরেছিল, তাকে সে ক্ষমা করলে না। উঠানে এক কোণে একটা টুল ছিল, হঠাৎ সেখানা শূন্যে উঠে ঘুরতে ঘুরতে প্রথম পাহারাওয়ালার মাথার উপরে এসে পড়ল! বিকট চিৎকার করে সে প্রপাত ধরণীতলে হল!
