প্রায় অন্ধকারে ঢেউয়ের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে করতে তারা এস্ত নেত্রে দেখলে, আকাশে চিলেরা যেমন ছোঁ মারবার আগে মণ্ডলাকারে ঘোরে, সেই মোটরবোটখানা গঙ্গার অস্থির ও ফুটন্ত জলে তেমনি চক্র কেটে আবার বেগে ঘুরে আসছে। প্রথম আক্রমণ ব্যর্থ হওয়াতে এবারে তার আরও রোখ বেড়ে উঠেছে।
মেঘ আর ঝড়–আর গঙ্গা তেমনি প্রলয়ের চিৎকারে করছে, পৃথিবীর সর্বাঙ্গে অন্ধকারে তেমনি কয়লার রং মাখিয়ে দিচ্ছে এবং চারিদিকে ফেনা ছড়াতে-ছড়াতে ও মরণ নাচ নাচতে নাচতে তরঙ্গের পর তরঙ্গ তেমনি নিষ্ঠুর কৌতুকে ছুটে তেড়ে আসছে।
মানিক হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, জয়, আবার ডুব দাও!
জয়ন্ত বললে, এমন বারবার ডুব দিয়ে কতক্ষণ চলবে?
তা ছাড়া আর উপায় কি? ওই দেখো, মোটরবোটখানা আবার এসে পড়ল।
মানিক, আমাদের রিভলবার আছে। শিগগির বার করো!
পরমুহূর্তে অন্ধকারের বুক বিদীর্ণ করে দুটো রিভলবার উপর উপর গর্জন করে উঠল। মোটরবোটখানা ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো বেগে আসতে-আসতে হঠাৎ মোড় ফিরে আঁধারের ভিতরে গোঁৎ খেয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
জয়ন্ত বললে, মানিক, রিভলভারের গুণ দেখো। আমাদের কাছে রিভলভার আছে জানলে শত্রু বোধ হয় এতটা বীরত্ব দেখাতে আসত না।
দু-হাতে জল ঠেলতে ঠেলতে মানিক বললে, জয়, তোমার এ অনুমানও সত্য,–ওদের দলে কাফ্রি জাতের লোক আছে।
জয়ন্ত বললে, আমার অনুমান মিথ্যা হওয়ার কোনও কারণ নেই। কিন্তু ও-সব কথা এখন থাক। এখনও আমরা নিরাপদ নই। চলো, আগে ডাঙার দিকে চলো।
ঝড় আজ গঙ্গাকে যেভাবে খেপিয়ে তুলেছিল, স্রোতের টান যেরকম প্রখর, তাতে ডাঙার দিকে অগ্রসর হওয়া বড় সহজ কাজ নয়। তারা গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েছিল বাগবাজারের কাছে, কিন্তু পায়ের তলায় মাটি পেলে নিমতলার ঘাটের কাছে গিয়ে।
তারা যখন পথ দিয়ে বাড়িমুখো হল তখন ঝড়ের আক্রোশ একেবারে কমে গেছে। শূন্য থেকে কালো মেঘের পর্দাও সরে গেল বটে, কিন্তু আকাশ পরিষ্কার হল না, খুব জোরে বৃষ্টি ঝরতে লাগল।
জয়ন্ত বললে, দেবতা দেখছি আজ আমাদের ওপরে মোটেই খুশি নন। ভেবেছিলুম, ঝড়ের পর আকাশ পরিষ্কার হবে, আর আমিও সেই কাফ্রি-বন্ধুর মোটর-বোটখানা আর একবার খোঁজবার চেষ্টা করব। কিন্তু আজ আর খোঁজাখুঁজি করে কোনও লাভ নেই–চারিদিকে যে অন্ধকার! তবে মোটর-বোটখানা পরেও বোধ হয় আমরা খুঁজে বার করতে পারব।
কেমন করে?
পোর্ট-পুলিশে খবর দিয়ে। মোটরবোট এখানে বেশি নেই। যে কখানা আছে, পোর্ট পুলিশের কাছেই তাদের সন্ধান মিলবে।
মানিক বললে, কিন্তু কোন মোটরবোট আমাদের আক্রমণ করেছিল, কেমন করে তা বুঝতে পারবে?
জয়ন্ত বললে, আমার রিভলভারের গুলিগুলো যে ব্যর্থ হয়নি, আমি তা জানি। তোমারও টিপ খারাপ নয়। আমাদের খুঁজে দেখতে হবে, কোন মোটরবোটের গায়ে গুলির দাগ আছে। এটুকু আবিষ্কার করা বিশেষ কঠিন হবে না, কি বলো হে?
মানিক বললে, আপাতত ও-সব কথা আমার আর ভালো লাগছে না। আমার গায়ের হাড়গুলো পর্যন্ত বোধ হয় ভিজে গেছে। ডাঙায় উঠেও এখনও ভিজতে হচ্ছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো। আগে দু-পেয়ালা গরম চা
তারপর গরম খিচুড়ি। ঠিক বলেছ মানিক, খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে আমার চেয়ে তোমার বুদ্ধিই বেশি খোলে। চলো বন্ধু, ঘরমুখো বলদের মতো ঘরের দিকেই দৌড় দেওয়া যাক।
.
হাইড্রোজেন আর্সেনাইড
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙবার পর মানিক ঘরের জানালা খুলে বাইরেটা একবার দেখেই নিজের মনে অপ্রসন্ন স্বরে বললে, উঃ, কী একগুঁয়ে বৃষ্টি! কাল থেকে শুরু হয়েছে, এখনও থামবার নাম নেই!
সঙ্গে-সঙ্গে রাস্তা থেকে জয়ন্তের ডাক শুনলে, মানিক, ওহে মানিক।
তাড়াতাড়ি আবার জানালা খুলে মানিক বললে, কিহে, এত সকালে এই বৃষ্টিতে তুমি কোত্থেকে আসছ?
মানিক, জামা-কাপড় পরে শিগগির নীচে নেমে এসো।
কথামতো কাজ করে মানিক নীচে নেমে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ব্যাপার কী জয়, আবার কোনও নতুন বিপদ হয়েছে নাকি?
বিপদ? হ্যাঁ। তবে আমাদের বিপদ নয়।
তার মানে?
আমাদের পাড়ার–অর্থাৎ বাগবাজারের, সদানন্দ বসুর নাম শুনেছ বোধহয়? তিনি খুব ধনী হলেও খুব কৃপণ বলেই বিখ্যাত। লোকের বিশ্বাস, সকালে তার নাম করলে ভাতের হাঁড়ি ফেটে যায়। তাই সবাই তাঁকে হাঁড়ি-ফাটা বসু বলে ডাকে। এই সদানন্দ বসুর বাড়িতে কাল রাত্রে মস্ত চুরি হয়ে গেছে।
মস্ত চুরি!
হ্যাঁ! ঘটনাটা আমি লোকের মুখে যতটা জানতে পেরেছি, তা হচ্ছে এই : সদানন্দবাবু তার বাড়িতে একলাই বাস করেন; কারণ, সংসারে তার আর কেউ নেই। একমাত্র মেয়ে, সেও শ্বশুরবাড়িতে। বাড়িতে থাকে কেবল একজন চাকর ও একজন দ্বারবান। ঠিকে-পাঁচক রান্না সেরে বাসায় চলে যায়। সদানন্দবাবুও শখ করে থিয়েটার দেখতে গিয়েছিলেন। এমন শখ তার হয় না, বোধ করি পাস পেয়েছিলেন। থিয়েটারে বড় বড় দুটো পালা ছিল– সারা রাত তার অভিনয় দেখবার কথা। কিন্তু একটা পালা দেখবার পর আর তাঁর ভালো লাগেনি, তাই তিনি রাত সাড়ে বারোটার সময়েই বাড়িতে ফিরে আসেন। দ্বারবান সদর দরজা খুলে দেয়। তিনি সোজা উপরে গিয়ে দেখেন, তার শয়ন-ঘরের দরজা খোলা। অথচ দরজায় তিনি নিজের হাতেই চাবি বন্ধ করে গিয়েছিলেন। তাড়াতাড়ি তিনি ঘরের ভিতরে গিয়ে ঢোকেন, কিন্তু সঙ্গেসঙ্গেই অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান হলে পর দেখলেন, তার লোহার সিন্দুক ভাঙা, টাকাকড়ি আর মূল্যবান যা-কিছু ছিল, সব অদৃশ্য!
