জয়ন্ত বললে, আমারও কেমিস্ট্রি শিখতে ইচ্ছে হয়। আপনি যদি দয়া করে ও-সম্বন্ধে দু-চারখানা বইয়ের নাম লিখে দেন, তাহলে বাধিত হই।
লোকটি বললে, এ আর শক্ত কথা কি, এখনই দিচ্ছি।–বলেই টেবিলের টানার ভিতর থেকে কাগজ ও কলম বার করে খানকয় বইয়ের নাম লিখে কাগজখানা জয়ন্তের হাতে থেকে কাগজ, এ আর শক্ত
জয়ন্ত বললে, ধন্যবাদ! আপনার সঙ্গে এতক্ষণ আলাপ করলুম, কিন্তু মহাশয়ের নাম আমরা জানি না।
আমার নাম ভবতোষ মজুমদার। কলকাতায় বাগবাজারে থাকি।
এমনসময় নীচে থেকে পানসির মাঝির চিৎকার শোনা গেল–বাবুজি, আকাশে মেঘ জমেছে, এখনি ঝড় উঠবে, শিগগির আসুন।
জয়ন্ত তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বললে, আপনার বজরা দেখে বড় খুশি হলুম, আজ তাহলে আসি, নমস্কার।
কামরা থেকে বাইরে বেরিয়েই তারা দেখলে, সন্ধ্যার অন্ধকারের ভিতরে আধখানা আকাশ জুড়ে মেঘের কালিমা ঘন হয়ে উঠেছে। কষ্টিপাথরের উপরে ক্ষণস্থায়ী সুবর্ণরেখার মতো থেকে থেকে বিদ্যুতের দীপ্ত লীলা দৃষ্টিকে ঝলসে দিচ্ছে।
মাঝি বললে, বাবুজি, ঝড় এল বলে। আপনারা এখন পানসিতে আসবেন কি?
জয়ন্ত পানসিতে নেমে পড়ে বললে, ঝড়কে আমরা ভয় করি না, পানসি চালাও।
মানিক বললে, জয়, কাজটা বুদ্ধিমানের মতো হল না, মেঘগুলো কীরকম হু-হু করে এগিয়ে আসছে তা দেখেছ?
দেখেছি। কিন্তু মানিক, ঝড়ের সময়ে এই গঙ্গার চেয়ে ওই বজরা যে আরও ভয়ানক হয়ে উঠত না, তাই-বা কে বলতে পারে?
মানিক সচমকে বললে, তোমার এমন সন্দেহের কারণ?
সকালে আমরা যে দুখানা চিঠি পেয়েছি, তার কথা তুমি ভেলোনি বোধহয়?
না।
সেই চিঠি দুখানা ওই বজরার ভিতরে বসেই লেখা হয়েছে।
মানিক বললে, তোমার বিশ্বাস, সেই চিঠি দুখানার লেখক, কেমিস্ট্রি নিয়ে চর্চা করে। ভবতোষ যে কেমিস্ট্রি নিয়ে আলোচনা করে তাও স্বকর্ণেই শুনলুম বটে। এইটুকু প্রমাণই যথেষ্ট নয়।
জয়ন্ত বললে, সে কথা আমিও জানি। কিন্তু আমি তার চেয়েও বেশি কিছু জানতে পেরেছি। এই কাগজখানা দেখছ? ভবতোষ তোমার সামনেই এই কাগজে কতকগুলো বইয়ের নাম লিখে দিয়েছে। আর এই দেখো সেই চিঠি দুখানা!–এই বলে সে পকেটে হাত দিয়ে সকালের সেই চিঠি দুখানা বার করলে।
মানিক কাগজ দুখানা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পরীক্ষা করতে করতে বললে, ভবতোষ লিখেছে কালো কালিতে ইংরেজি হরফে, আর চিঠির লেখা বাংলায় সবুজ কালিতে। তোমার মতে, চিঠির লেখা– বাঁ-হাতের। কিন্তু ভবতোষ তো আমার সামনেই ডানহাতে লিখলে! এই কাগজের লেখার সঙ্গে চিঠি লেখার কোনও মিলই আমি দেখতে পাচ্ছি না।
জয়ন্ত বলল, আরও ভালো করে দেখো মানিক, আরও ভালো করে দেখো!
মানিক হঠাৎ সবিস্ময়ে বলে উঠল, এ কী ব্যাপার! চিঠিখানার কাগজ আর ভবতোষের কাগজ যে একেবারে এক।
জয়ন্ত কাগজখানা আর চিঠি আবার পকেটের ভিতরে পুরে ফেলে সহাস্যে বললে, ভায়া, তোমার চোখ একটু দেরিতে ফোটে দেখছি! ভবতোষের কাগজ আর চিঠির কাগজ যে এক, আমি তো সেটা মিলিয়ে দেখবার আগেই টের পেয়েছিলুম। এই চিঠি দুখানা ভবতোষ নিজে লেখেনি বটে, কিন্তু চিঠির কাগজ সরবরাহ করেছে সে নিজের হাতেই! খুব সম্ভব, চিঠি দুখানা লেখা হয়েছে তার হুকুমেই। মানিক, ও-বজরা আমাদের পক্ষে নিরাপদ নয়।
মানিক বললে, ওই ঝড় উঠল।
হাঁ, ঝড় উঠল–আর সে বড় সহজ ঝড় নয়। ভীষণ কালো মেঘের দল সারা আকাশকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করবার আগেই আচম্বিতে উন্মত্ত ঝটিকা গোঁ-গোঁ শব্দে চিৎকার করে উঠল। এবং তার পরেই ছুটে এল চোখ কানাকরা রাশি রাশি ধুলোর কণা–সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গার জল খেপে উঠে খলখল-খল অট্টহাস্যে প্রলয় নাচ শুরু করে দিলে। এক মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ বাতাস-পৃথিবীর রূপ গেল একেবারে বদলে। সন্ধ্যার অন্ধকারে, মেঘের অন্ধকারে, ধুলোর অন্ধকারে–চোখে কিছু দেখা যায় না; বজ্রের গর্জনে, ঝড়ের হুঙ্কারে, তরঙ্গের কোলাহলে– কানে কিছু শোনা যায় না। বাতাসের ও জলের টানে পানসিখানা কোনদিকে ছুটে চলেছে তিরবেগে, তা কেউ বুঝতেও পারলে না।
সেই হট্টগোলের ভিতরেও জয়ন্তের তীক্ষ্ণ কান আর একটা শব্দ আবিষ্কার করলে। হঠাৎ চোখ তুলেই সে দেখলে, একখানা মোটর বোট একেবারে পানসির উপর এসে পড়েছে। আর রক্ষা নেই।
মানিক, মানিক! লাফিয়ে পড়ো–জলে লাফিয়ে পড়ো।–প্রাণপণে চেঁচিয়ে এই কথা বলেই মানিককে টেনে নিয়ে জয়ন্ত গঙ্গার সেই মৃত্যু-স্রোতের ভিতরে আঁপিয়ে পড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে মোটরবোটখানা ভীষণ শব্দে পানসির উপরে বিষম এক ধাক্কা মারলে। দাড়ি মাঝিরা তীক্ষ্ণস্বরে আর্তনাদ করে উঠল, এবং পানসিখানাও চোখের নিমেষে উলটে গেল।
জয়ন্ত ও মানিক জলের উপরে ভেসে উঠেই দেখলে, মোটরবোটখানা আবার তাদের দিকে বেগে ছুটে আসছে।
জয়ন্ত, আবার চেঁচিয়ে বললে, মানিক, ও মোটরবোট আমাদেরই বধ করতে চায়। আবার ডুব দাও,–ডুব সাঁতারে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করো।
দপ করে বিদ্যুৎ জ্বলে উঠল, এবং ডুব দেবার পূর্বমুহূর্তে জয়ন্ত ও মানিক দুজনেই সচমকে দেখলে, মোটরবোট চালিয়ে আসছে মূর্তিমান যমের মতন কালো একটা কাফ্রি!
.
গরম খিচুড়ি
ডুব দিয়ে তারা সেই উন্মত্ত জলরাশি ঠেলে খানিকদূর এগিয়ে গেল। কিন্তু জলের ভিতরে দম বন্ধ করে মানুষ আর কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে? মিনিটখানেক পরেই আবার তাদের উপরে ভেসে উঠতে হল, হাঁপ ছাড়বার জন্যে।
