মানিকও অত্যন্ত উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, বলো কি জয়! এত বড় প্রমাণ তুমি পেয়েছ?
প্রমাণটা এতক্ষণ খুব বড় ছিল না, বরং এই চুলগুলো ব্যাপারটাকে আরও বেশি রহস্যময় করে তুলেছিল। বাংলাদেশে বাঙালির গদিতে হাবসির মাথার চুল অস্বাভাবিক নয় কি? এই চুলগুলোর জন্যে সমস্ত ব্যাপারটা গুলিয়ে যাচ্ছিল, মাঝিদের কথায় এতক্ষণে সব স্পষ্ট হয়ে গেল।বলতে বলতে গঙ্গাতীরের দিকে চেয়ে জয়ন্ত হঠাৎ চমকে উঠে থেমে পড়ল।
মানিকও সেইদিকে তাকিয়ে দেখলে, গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে একজন লোক একটা লাল নিশান নিয়ে ঘন ঘন নাড়ছে।
জয়ন্ত বললে, মানিক, ও-লোকটা বজরার লোকদের সঙ্কেতে কিছু জানাচ্ছে!
মানিক বললে, বোধ হয় আমরা ওদিকে যাচ্ছি সেই খবরই দিচ্ছে!
জয়ন্ত বললে, খুব সম্ভব তাই। মানিক, এবার যদি ওই বজরার গিয়ে উঠতে পারি!
পানসি তখন বজরার খুব কাছে এসে পড়েছে। জয়ন্ত ও মানিক দেখলে, বজরার ছাদের উপর প্রকাণ্ড আকারের একটা লোক মস্তবড় এক পাথরের মূর্তির মতো স্থির ভাবে বসে আছে– তার লক্ষ্য স্থির হয়ে আছে যে পানসি এগিয়ে আসছে তার দিকে।
জয়ন্ত চুপিচুপি বললে, মানিক, রিভলভারটা আনতে ভোলেনি তো?
মানিক বললে, না।
.
কালো আঁধারে, কালো ঝড়ে, কালো গঙ্গায়
সূর্য তখন অস্ত গেছে,–পশ্চিমের ভাঙা ভাঙা মেঘের গায়ে আলোময় আলতার ছোপ মাখিয়ে। আকাশ থেকে আলতা-আলো ঝরে পড়ে গঙ্গাজলকেও রঙিন করে তুলেছে–সে জল যেন পিচকারিতে ভরে নিলে অনায়াসেই হোলিখেলা করা চলে।
বজরাখানা ভালো করে দেখবার মতোই বটে। দোতলা বজরা–তাকে ছোটখাটো একখানা ভাসন্ত বাড়ি বলাও চলে। দেওয়ালগুলো লাল রঙের ও জানলা-দরজাগুলোর রং সবুজ। ছাদগুলো চকচকে পিতলের রেলিং দিয়ে ঘেরা। মাঝে-মাঝে রঙিন টবে চারা বসিয়ে বাগান রচনারও চেষ্টা করা হয়েছে। সেইসব চারার থোলো থোলো নানারঙা ফুল ফুটে বজরাখানাকে দেখতে আরও সুন্দর করে তুলেছে।
বজরার একতলায় ছাদের উপরে বসে সেই পাথরের মতো স্থির মস্ত মূর্তিটা তখনও নিষ্পলক চোখে পানসির গতিবিধি লক্ষ্য করছিল। বজরার আর কোথাও জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই।
পানসি এগিয়ে যাচ্ছিল, জয়ন্ত হঠাৎ চেঁচিয়ে বললে, মাঝি, নৌকোখানা বজরার চারদিকে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে চলো। চমৎকার বজরা। আমি আরও ভালো করে দেখতে চাই।
জয়ন্তের কথা বজরার উপরকার সেই মূর্তিটা শুনতে পেলে। আস্তে আস্তে সে উঠে দাঁড়াল। একেবারে ধারে এসে, পিতলের রেলিঙের উপরে ভর দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে পড়ে বললে, আপনারা আমার বজরা দেখতে চান? বেশ তো, বজরার উপরেই আসুন না, বাইরে থেকে দেখবেন কেন?
লোকটার গলার আওয়াজ কি গম্ভীর! এমন অস্বাভাবিক গম্ভীর স্বর শোনাই যায় না।
জয়ন্তের দিকে ফিরে মানিক চুপিচুপি বললে, ওহে, লোকটা আবার আমাদের ডাকে যে, এখন কি করবে?
জয়ন্ত চেঁচিয়ে বললে, আমরা বজরার উঠলে আপনি তাহলে রাগ করবেন না?
রাগ? রাগ করব কেন? আপনাদের মতো আরও অনেকেই আমার বজরা দেখতে আসেন, এ আমার পরম সৌভাগ্য!–বলেই সে ফিরে ডাকলে, ওরে, কে আছিস রে!
একটা জোয়ান পশ্চিমী লোক ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে সেলাম করলে।
লোকটা বললে, বাবুদের ওপরে তুলে নে! সব ঘর ভালো করে দ্যাখা।
বজরার উপরে উঠে জয়ন্ত ও মানিক বুঝলে, এ একটা দ্রষ্টব্য ব্যাপার বটে! বজরার মালিকের শখও আছে, টাকাও আছে। এর কামরার যেসব ছবি, পোর্সিলেনের আসবাব, সোফা, কৌচ, ডাইনিং টেবিল ও কার্পেট প্রভৃতি চোখে পড়ে, অনেক নামজাদা ধনীর বাড়িতেও তার তুলনা মেলে না।
একতলার একটা ঘরে বসে কয়েকজন পশ্চিমী লোক গল্পগুজব করছিল। জয়ন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাদের কারুর ভিতর থেকে সন্দেহজনক কোনও কিছু আবিষ্কার করতে পারলে না।
দোতলার একটা ঘরে ঢুকে দেখা গেল, যার আমন্ত্রণে তারা বজরায় এসেছে, সেই লোকটি টেবিলের সামনে একখানা চেয়ারে চুপ করে বসে আছে।
এই যে, আসুন! সব কামরা দেখা হল? কেমন দেখলেন!
জয়ন্ত বললে, চমৎকার! আজকাল এরকম বজরা চোখেই পড়ে না। বজরার মালিক বোধ হয় আপনিই?
হ্যাঁ। এখনকার বাবুদের শখ হচ্ছে লঞ্চ আর মোটরবোট কেনা। আমি ওসব কল কবজার জিনিস দু-চক্ষে দেখতে পারি না। একটা কল বিগড়োলেই সব অচল!
জয়ন্ত লোকটাকে ভালো করে দেখতে লাগল। লোকটির বয়স হবে বছর চল্লিশ। রং উজ্জ্বল শ্যাম, দেহ যেমন লম্বা তেমনি চওড়া, দেখলেই শক্তিমান বলে বোঝা যায়। দুই চোখের দৃষ্টি এমন তীব্র যে, বেশিক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না।
আপনারা দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? বসুন, বসুন।
জয়ন্ত ও মানিক এক-একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল।
মানিক দেখলে, জয়ন্ত একদৃষ্টিতে একটা শেলফের দিকে চেয়ে আছে। সেও সেইদিকে চেয়ে দেখলে, শেলফে-র উপর কতকগুলো ইংরেজি বই সাজানো রয়েছে–সব বই-ই রসায়ন তত্ত্ব বিষয়ক। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ল, যে-ব্যক্তি তাদের ভয় দেখিয়ে চিঠি লিখেছে, জয়ন্তের বিশ্বাস সেও কেমিস্ট্রি নিয়ে আলোচনা করে। মানিক বুঝতে পারল, জয়ন্ত অমন করে বইগুলো লক্ষ করছে কেন!
টেবিলের এককোণে রয়েছে একটা বক-যন্ত্র। জয়ন্ত হাত দিয়ে অন্যমনস্কভাবে সেটা নাড়তে নাড়তে বললে, এখানে এ জিনিসটা কেন?
লোকটি হেসে বললে, আমার একটি বাতিক আছে। আমি কেমিস্ট্রি নিয়ে অল্প স্বল্প নাড়াচাড়া করি।
