.
ধুলো-হাওয়া-ভক্ষণ
বৈকালবেলায় মানিক যখন আবার জয়ন্তের কাছে ফিরে এল তখন দেখলে, সে ইজিচেয়ারে চোখ মুদে পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে।
মানিক শুধোলে, এখনও তোমার ঘুম ভাঙেনি নাকি? বেলা যে পড়ে এল!
চোখ না খুলেই জয়ন্ত বললে, বীরপুরুষ, তুমি সজাগ আছ দেখে আমার সাহস বাড়ল। চোখ মুদলেই মানুষ যে ঘুমোয়, তোমাকে এ শিক্ষা কে দিলে?
মানিক বললে, মানুষ ঘুমোলেই চোখ মোদে।
জয়ন্ত বললে, মানুষ যখন দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সে বসে থাকে না। কিন্তু মানুষ যখন দাঁড়িয়ে থাকে না, তখন সে বসতেও পারে, শুতেও পারে, দৌড়োতেও পারে। মানুষ যখন চোখ মুদে থাকে, তখন সে ঘুমোতেও পারে কিংবা জেগে চিন্তা করতেও পারে।
তাহলে তুমি চিন্তা করছিলে?
জয়ন্ত চোখ খুলে বললে, হ্যাঁ, গভীর চিন্তা। মুকুন্দ নন্দীর গদির চোরেরা যে পথ দিয়ে শুভাগমন করেছে, আমার মন সেই পথে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছিল।
তাহলে পথ চিনতে পেরেছ?
হয়তো পেরেছি, হয়তো পারিনি। চল, একটু গঙ্গার ধারে গিয়ে জোলো হাওয়া আর পথের ধুলো খেয়ে আসি। বলেই জয়ন্ত জামা পরতে লাগল।
জয়ন্তের জোলো হাওয়া আর পথের ধুলো খাবার আগ্রহ মানিক আর কোনওদিন দেখেনি। সুতরাং সে আন্দাজ করে নিলে তার অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে।
দুজনে মিনিট-পনেরো গঙ্গার ধারে এদিক-ওদিক করে বেড়ালে। তারপর অন্নপূর্ণা ঘাটের কাছে এসে জয়ন্ত বললে, ধুলো আর হাওয়া খেয়ে পেট ভরে গিয়েছে। এখন এইখানে একটু বসে-বসে গঙ্গার ঢেউ গোনা যাক!
দুজনে গঙ্গার ধারে বসে পড়ল। সেখানটায় পাশাপাশি খড়ের নৌকোর পরে খড়ের নৌকো সাজানো রয়েছে, খড়বোঝাই প্রত্যেক নৌকোকে এক একখানা কুঁড়েঘরের মতন দেখাচ্ছে– হঠাৎ তাকালে মনে হয়, গঙ্গার বুকে যেন এক ভাসন্ত পল্লীগ্রাম বিরাজ করছে। এ-জায়গাটা খালি অন্নপূর্ণা ঘাট নয়, খোঁড়া ঘাট বা বিচিলি ঘাট নামেও পরিচিত–প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত খড়ের দালাল, মুটে-মজুর, গরুর গাড়ির গাড়োয়ান ও মাঝি-মাল্লাদের হইচই আর গণ্ডগোলে এখানে কেউ কান পাততে পারে না।
এখন সে-সব গোলমাল আর নেই। বাঁধানো পাড়ের উপরে বসে পাঁচ-ছজন দাঁড়ি ও মাঝি গল্পগুজব করছিল, জয়ন্ত খুব সহজেই তাদের ভিতর গিয়ে আলাপ জমিয়ে ফেললে।
কথায় কথায় জয়ন্ত জিজ্ঞাসা করলে, আচ্ছা ভাই, ঘাটের ঠিক গায়েই ওই যে খড়ের নৌকোখানা রয়েছে, ওখানা কার?
একজন বললে, আমার, বাবু।
খানিকক্ষণ জয়ন্ত তাদের আর কিছু জিজ্ঞাসা করলে না। মানিকের দিকে ফিরে বললে, মানিক, বয়ার কাছে একখানা বড় বজরা বাঁধা রয়েছে, দেখেছ?
বজরাখানা ইতিমধ্যেই মানিকেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল; এবং দৃষ্টি আকর্ষণ করবার কারণ হচ্ছে, এত বড় ও এমন সুন্দর চিত্রবিচিত্র শৌখিন বজরা গঙ্গার বুকে আজকাল বড় একটা দেখা যায় না।
বজরাখানা তারা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে দেখে একজন মাঝি বললে, বাবু, ও বজরাখানা কাল বিকাল থেকে এই ঘাটেই বাঁধা ছিল। আজ দুপুরে ওখানাকে বয়ার কাছে নিয়ে গেছে।
জয়ন্ত বললে, চমৎকার বজরা! ওখানা কার তা জানো?
না বাবু। ওরকম বজরা আমি এখানে আর কখনও দেখিনি। তবে বজরার ভিতরে তিন-চারজন বাঙালিবাবু আর একজন হাবসি লোককে আমি দেখেছি।
জয়ন্ত অকারণেই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, ঠিক দেখেছ? হাবসি?
আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবু, হাবসি! মাথায় বেজায় উঁচু, দেহ যেন লোহা দিয়ে তৈরি, গায়ের রং কয়লার মতো, উঃ, দেখলেই ভয় হয়।
জয়ন্ত নস্যদানি বার করে ঘন ঘন নস্য নিতে লাগল।
মাঝিদের দলের একটা লোক আর একজনকে ডেকে বললে, দ্যাখ ভাই ছিদু! ওই বজরার লোকগুলো বোধহয় কাল সারা রাত ঘুমোয়নি।
ছিদু বললে, কেমন করে জানলি তুই?
আমারও যে কাল রাতে ঘুম হয়নি! ওই বজরার লোকগুলো কাল রাতে তিন-চারবার ডাঙায় নেমেছিল।
জয়ন্ত বললে, ওঠো মানিক, এইবারে আরও দু-চার পা বেড়িয়ে বাড়ি ফেরা যাক।
দুজনে কাশি মিত্তিরের ঘাটের দিকে অগ্রসর হল।
জয়ন্ত হঠাৎ মাঝের আর-একটা ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে বললে, একখানা পানসি নিয়ে জলবিহারে রাজি আছো?
মানিক হেসে ফেলে বললে, বুঝেছি হে, বুঝেছি। ওই বজরার কাছে না গিয়ে তুমি আর থাকতে পারছ না।
জয়ন্তও হেসে বললে, তুমি দেখছি অন্তর্যামী হয়ে উঠেছ!
তখনই একখানা পানসি ভাড়া করা হল, মাঝি শুধোলে, কোন দিকে যাব বাবুজি?
ওই বজরার কাছ দিয়ে এগিয়ে চলো।
দুজনে প্রথমটা বজরার দিকে তাকিয়ে নীরবে বসে রইল। তারপর মানিক বললে, মাঝিদের মুখে যা শুনলুম, বজরার লোকগুলোর ব্যবহার সন্দেহজনক বলেই মনে হচ্ছে। ওরকম বজরা কোথা থেকে এখানে এল, আর কেনই বা এই ঘাটে এসে লেগেছিল? কাল সারারাত বার বার ওরা ঘাটে নেমেছিল কি কারণে? মুকুন্দ নন্দীর গদি এখান থেকে বেশি দূরে নয়, কাল সেখানে চুরি হয়ে গেছে!
জয়ন্ত ভাবতে-ভাবতে বললে, হু, আর বজরায় একজন হাবসি আছে।
যদিও বাঙালির সঙ্গে হাবসি-জাতের লোক বড় একটা দেখা যায় না, তবু তার নামেই একটু আগে তুমি এতটা উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলে কেন?
তোমার মনে আছে মানিক, মুকুন্দ নন্দীর গদির জানালায় গরাদের উপরে কয়েকগাছা চুল আমি পেয়েছি? সে চুল আমি অণুবীক্ষণে পরীক্ষা করে দেখেছি। চুলগুলো এমন কোকড়ানো আর পুরু যে, কাফ্রি-জাতের লোকের মাথার চুল না হয়ে যায় না।
